যুক্তরাষ্ট্রের নতুন অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞার চাপের মধ্যেও নিজেদের অভ্যন্তরীণ সক্ষমতার ওপর জোর দিচ্ছে ইরান। দেশটির কর্তৃপক্ষের দাবি, দীর্ঘদিনের নিষেধাজ্ঞা মোকাবিলার অভিজ্ঞতা এবং নিজস্ব সম্পদের ওপর নির্ভর করে অর্থনীতিকে সচল রাখার প্রস্তুতি তাদের রয়েছে। আলজাজিরার এক বিশ্লেষণে বলা হয়েছে, ইরানকে বশ্যতা স্বীকারে বাধ্য করার উদ্দেশ্যে যুক্তরাষ্ট্র নতুন অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞা আরোপ করেছে। তবে তেহরান জানিয়েছে, তারা পরিস্থিতি মোকাবিলায় […]
ছবি: সংগৃহীত
যুক্তরাষ্ট্রের নতুন অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞার চাপের মধ্যেও নিজেদের অভ্যন্তরীণ সক্ষমতার ওপর জোর দিচ্ছে ইরান। দেশটির কর্তৃপক্ষের দাবি, দীর্ঘদিনের নিষেধাজ্ঞা মোকাবিলার অভিজ্ঞতা এবং নিজস্ব সম্পদের ওপর নির্ভর করে অর্থনীতিকে সচল রাখার প্রস্তুতি তাদের রয়েছে।
আলজাজিরার এক বিশ্লেষণে বলা হয়েছে, ইরানকে বশ্যতা স্বীকারে বাধ্য করার উদ্দেশ্যে যুক্তরাষ্ট্র নতুন অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞা আরোপ করেছে। তবে তেহরান জানিয়েছে, তারা পরিস্থিতি মোকাবিলায় প্রস্তুত। দেশটির অর্থনীতি বিষয়ক মন্ত্রী আলী মাদানিজাদে সোমবার রাতে রাষ্ট্রীয় টেলিভিশনে দুই বছরের একটি পরিকল্পনার কথা তুলে ধরেন।
নিষেধাজ্ঞা মোকাবিলায় ইরানের দীর্ঘ অভিজ্ঞতার কথা উল্লেখ করে মাদানিজাদে বলেন, তাদের নিজস্ব প্রয়োজনীয় উপায় রয়েছে এবং নিষেধাজ্ঞার পরিস্থিতি মোকাবিলার কৌশলও তারা জানে। একই সঙ্গে তিনি বলেন, বিশ্ব এখন আর একক কোনো শক্তির নিয়ন্ত্রণে নেই। যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সব ধরনের সম্পর্ক ছিন্ন করার আহ্বান অনেক দেশ প্রত্যাখ্যান করবে বলেও তিনি আশা প্রকাশ করেন।
বর্তমানে ইরানের অন্যতম প্রধান কৌশল হচ্ছে নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্য, বৈদেশিক মুদ্রা ও সোনার মজুত ধরে রাখা। যদিও প্রাকৃতিক সম্পদে সমৃদ্ধ দেশটি জ্বালানি ব্যবহারে রেশনিংয়ের মতো পদক্ষেপ নিতে বাধ্য হয়েছে।
ইরানের কেন্দ্রীয় ব্যাংকের গভর্নর আবদোলনাসের হেমমাতি চলতি সপ্তাহের শুরুতে ব্যবসায়ী প্রতিনিধিদের সঙ্গে এক বৈঠকে বলেন, দেশটির বৈদেশিক মুদ্রা আয়ের প্রধান উৎস অপরিশোধিত তেল রপ্তানি প্রায় পুরোপুরি বন্ধ হয়ে গেছে। তবে নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের জন্য বৈদেশিক মুদ্রার ঘাটতি হবে না বলে ব্যবসায়ীদের আশ্বস্ত করেন তিনি। তার দাবি, কেন্দ্রীয় ব্যাংকের নগদ অর্থের মজুত এমন কিছু স্থানে রয়েছে যেখানে যুক্তরাষ্ট্রের প্রবেশাধিকার নেই।
হেমমাতি অনিয়ন্ত্রিত মূল্যস্ফীতি ও সাধারণ মানুষের ক্রয়ক্ষমতা কমে যাওয়ার বিষয়টিও স্বীকার করেন। তবে তিনি বলেন, কষ্ট সহ্য করা এবং অর্থনৈতিকভাবে ভেঙে পড়া এক বিষয় নয়।
অন্যদিকে, সরকারের মুখপাত্র ফাতেমেহ মহাজেরানি মঙ্গলবার রাষ্ট্রীয় গণমাধ্যমকে বলেন, ইরানিদের আগামী এক বছরে পরিস্থিতির বড় ধরনের উন্নতি আশা করা উচিত নয়। দেশের দারিদ্র্যের মাত্রা নিয়ে বিস্তারিত তথ্য প্রকাশের ক্ষেত্রেও জাতীয় নিরাপত্তা পরিষদের অনুমতির প্রয়োজন বলে জানান তিনি।
চলতি সপ্তাহে খোলা বাজারে মার্কিন ডলারের বিপরীতে ইরানি রিয়ালের দর ইতিহাসের সর্বনিম্ন পর্যায়ে নেমে ২০ লাখ ৫০ হাজার রিয়ালে পৌঁছায়। পরে বুধবার মুদ্রাটির মান কিছুটা ঘুরে দাঁড়ায়।
অর্থনৈতিক চাপের মধ্যেও ইরানের নতুন নিরাপত্তা প্রধান মহসেন রেজাই তরুণদের দেশের অর্থনীতিতে সক্রিয়ভাবে যুক্ত হওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন। চলতি সপ্তাহের শুরুতে রাষ্ট্রীয় টেলিভিশনে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে তিনি পরিবার ও সমাজের প্রয়োজনীয় পণ্য ঘরেই উৎপাদন বা তৈরি করার ওপর জোর দেন।
ইরানের জাতীয় উন্নয়ন পরিকল্পনায় কয়েক দশক ধরে স্বাবলম্বিতার ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়ে আসছে। নিষেধাজ্ঞার মধ্যেও নিজস্ব উৎপাদন সক্ষমতা বাড়ানোর এই নীতি দেশটির অর্থনৈতিক কৌশলের গুরুত্বপূর্ণ অংশ।
প্রায় ৯ কোটি মানুষের দেশটি খাদ্য আমদানির ওপর নির্ভরতা কমাতে অভ্যন্তরীণ উৎপাদন বাড়ানোর চেষ্টা করছে। সরকারের দাবি, তাদের কৃষিপণ্যের প্রায় ৮৫ শতাংশ দেশের ভেতরেই উৎপাদিত হয়। তবে কৃষি উৎপাদন বাড়ানোর সঙ্গে দেশটির তীব্র পানি সংকটের বিষয়টি নিয়ে উদ্বেগও রয়েছে।
কৃষিমন্ত্রী গোলাম-রেজা নুরী মঙ্গলবার রাষ্ট্রীয় টেলিভিশনে জানান, স্বল্পমেয়াদে অভ্যন্তরীণ খাদ্য স্বাবলম্বিতা ৯০ শতাংশে উন্নীত করার লক্ষ্য নিয়েছে তেহরান। দীর্ঘমেয়াদে প্রয়োজনীয় সব খাদ্যপণ্য দেশের অভ্যন্তরে উৎপাদনের লক্ষ্যও রয়েছে।
তিনি জানান, ইরান বছরে প্রায় ১৬ বিলিয়ন ডলারের কৃষিপণ্য আমদানি করে এবং প্রায় ৮ বিলিয়ন ডলারের কৃষিপণ্য রপ্তানি করে। তবে যুদ্ধ শুরুর পর মার্চে কিছু পণ্যের রপ্তানি সাময়িকভাবে বন্ধ করা হয়েছিল।
গম, ভুট্টা, চাল ও ভোজ্য তেলসহ কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ খাদ্যপণ্য এবং পশুখাদ্যের ক্ষেত্রে এখনো আমদানিনির্ভর ইরান। সংযুক্ত আরব আমিরাত ও সৌদি আরবের রপ্তানি কেন্দ্রগুলোর মাধ্যমে ইরানে পরিশোধিত চিনি ও গমের আটা সরবরাহ করা হয়। রাশিয়া ও মধ্য এশিয়া থেকেও কাস্পিয়ান সাগর হয়ে উত্তর ইরানে কিছু শস্য পৌঁছায়।
জাতিসংঘের খাদ্য ও কৃষি সংস্থা গত মার্চে সতর্ক করে বলেছিল, আমদানির ব্যয় বৃদ্ধি, সরবরাহ ব্যবস্থায় বিঘ্ন এবং অভ্যন্তরীণ সরবরাহ সুরক্ষায় নেওয়া বিভিন্ন পদক্ষেপের কারণে ইরানে খাদ্য মূল্যস্ফীতি বাড়ছে। এতে পরিবারগুলোর ক্রয়ক্ষমতাও কমছে।
সংস্থাটি আরও বলেছিল, স্থলবাণিজ্যপথের সক্ষমতা এতটা নয় যে সমুদ্রপথে পরিবহন করা বিপুল পরিমাণ পণ্যের ঘাটতি পূরণ করা সম্ভব হবে।
স্ট্যাটিস্টিকাল সেন্টার অব ইরানের সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, জুলাইয়ে দেশটিতে খাদ্যের দাম আগের বছরের একই সময়ের তুলনায় ১২৮ শতাংশের বেশি ছিল। ফলে আগের তুলনায় একই অর্থ দিয়ে মানুষ অনেক কম পরিমাণ খাদ্য কিনতে পারছে।
ইরান সরকারের দাবি, দেশটি প্রয়োজনীয় ওষুধের প্রায় ৯৭ শতাংশ নিজ দেশে উৎপাদন করে। যদিও মোট ওষুধ ব্যয়ের বড় একটি অংশ এখনো আমদানিকৃত ওষুধের পেছনে ব্যয় হয়। ইরানের সংসদের স্বাস্থ্য কমিটির মুখপাত্র সালমান এশাকি মে মাসে জানিয়েছিলেন, প্রায় এক হাজার ধরনের ওষুধের ক্ষেত্রে দেশটি কোনো না কোনো মাত্রায় ঘাটতির মুখে পড়েছিল।
সরকার সস্তা বৈদেশিক মুদ্রা বরাদ্দ ধীরে ধীরে কমিয়ে দেওয়ার বিষয়টি নিশ্চিত করার পর সাম্প্রতিক মাসগুলোতে বিভিন্ন ওষুধের দামও কয়েক গুণ বেড়েছে।
ইরানের কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, যুদ্ধের সময় ক্ষতিগ্রস্ত বিভিন্ন অবকাঠামো দ্রুত মেরামতের কাজ চলছে। এর মধ্যে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইলের ব্যাপক বোমাবর্ষণে ক্ষতিগ্রস্ত তেল, গ্যাস ও বিভিন্ন ইউটিলিটি স্থাপনাও রয়েছে।
তবে যুদ্ধের কারণে আগে থেকেই থাকা জ্বালানি সংকট ও অবকাঠামোগত সমস্যাগুলো আরও গভীর হয়েছে। তেহরানসহ দেশের বিভিন্ন এলাকায় নিয়মিত বিদ্যুৎ বিভ্রাটে পরিবার ও শিল্পপ্রতিষ্ঠানগুলো সমস্যায় পড়ছে। সামনে আবহাওয়া ঠান্ডা হলে এবং জ্বালানির চাহিদা বাড়লে প্রাকৃতিক গ্যাসের সংকট আরও তীব্র হতে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।
বুধবার ও বৃহস্পতিবার তেহরান, মাশহাদ, কারাজসহ কয়েকটি শহরের উল্লেখযোগ্যসংখ্যক পেট্রোল পাম্পে সরকারি বরাদ্দের জ্বালানি শেষ হয়ে যায়। এতে স্টেশনগুলোর সামনে দীর্ঘ যানজট তৈরি হয়।
সরকারের মুখপাত্র ফাতেমেহ মহাজেরানি জানিয়েছেন, ২২ সেপ্টেম্বর চলতি ইরানি ক্যালেন্ডার মাস শেষ হওয়া পর্যন্ত বিদ্যমান জ্বালানির দাম ও কোটায় কোনো পরিবর্তন করা হবে না। তবে এরই মধ্যে ব্যক্তিগত যানবাহনের জন্য জ্বালানি কোটা কমানো হয়েছে।
এদিকে ন্যাশনাল ইরানিয়ান অয়েল রিফাইনিং অ্যান্ড ডিস্ট্রিবিউশন কোম্পানি জানিয়েছে, দক্ষিণ ইরানে দুটি নতুন শোধনাগার চালু হলে আগামী মার্চের শেষ নাগাদ দেশের জ্বালানি উৎপাদন সক্ষমতা দৈনিক প্রায় ১ কোটি ২০ লাখ লিটার বাড়বে। এর মাধ্যমে কিছুটা হলেও ঘাটতি পূরণ করা সম্ভব হবে বলে আশা করা হচ্ছে।
তবে অর্থনীতিবিদ সাদেক আলহোসিনী সতর্ক করেছেন, সামাজিক অসন্তোষের মধ্যে জ্বালানির দাম বাড়ানো সরকারের জন্য বড় ঝুঁকি তৈরি করতে পারে। তার মতে, পরিস্থিতি যদি বড় ধরনের বিশৃঙ্খলার দিকে যায় এবং দীর্ঘ জ্বালানি লাইনের কারণে ভেনেজুয়েলার মতো পরিস্থিতি সৃষ্টি হয়, তাহলে সংকট নিয়ন্ত্রণ করা আরও কঠিন হয়ে পড়বে।
জ্বালানির দাম বাড়লে পরিবহন ব্যয়ও বাড়বে, যা মূল্যস্ফীতিকে আরও তীব্র করতে পারে। এমন পরিস্থিতিতে ইরান হয়তো বড় ধরনের চাপ সামলে যেতে পারবে, তবে দীর্ঘমেয়াদে দেশটির সম্পদ ও সক্ষমতার ওপর চাপ ক্রমেই বাড়তে পারে।
সূত্র: আলজাজিরা