গত দুই বছরে মধ্যপ্রাচ্যের গুরুত্বপূর্ণ অঞ্চলগুলো—গাজা, লেবানন ও ইরান—এ ইসরাইলের যে ধারাবাহিক সামরিক অভিযান চালানো হয়েছে, তা মূলত যুক্তরাষ্ট্রের বিশাল আর্থিক ও সামরিক সহায়তার ওপর নির্ভরশীল। ব্রাউন বিশ্ববিদ্যালয়ের ‘কস্ট অব ওয়ার প্রজেক্ট’ সম্প্রতি প্রকাশ করা দুটি বিশ্লেষণাত্মক প্রতিবেদনে এ তথ্য উঠে এসেছে। ২০২৩ সালের অক্টোবরে শুরু হওয়া গাজা সংঘাতের পর থেকে যুক্তরাষ্ট্র ইসরাইলকে প্রায় ২১ […]
গত দুই বছরে মধ্যপ্রাচ্যের গুরুত্বপূর্ণ অঞ্চলগুলো—গাজা, লেবানন ও ইরান—এ ইসরাইলের যে ধারাবাহিক সামরিক অভিযান চালানো হয়েছে, তা মূলত যুক্তরাষ্ট্রের বিশাল আর্থিক ও সামরিক সহায়তার ওপর নির্ভরশীল। ব্রাউন বিশ্ববিদ্যালয়ের ‘কস্ট অব ওয়ার প্রজেক্ট’ সম্প্রতি প্রকাশ করা দুটি বিশ্লেষণাত্মক প্রতিবেদনে এ তথ্য উঠে এসেছে।
২০২৩ সালের অক্টোবরে শুরু হওয়া গাজা সংঘাতের পর থেকে যুক্তরাষ্ট্র ইসরাইলকে প্রায় ২১ বিলিয়ন মার্কিন ডলারের সামরিক ও আর্থিক সহায়তা প্রদান করেছে। এই সহায়তা না থাকলে গাজায় ভয়াবহ গণহত্যা চালানো, ইরানের বিরুদ্ধে সামরিক অভিযান পরিচালনা এবং ইয়েমেনসহ অন্যান্য এলাকায় বোমাবর্ষণ অব্যাহত রাখা সম্ভব হতো না।
মিডল ইস্ট কাউন্সিল অন গ্লোবাল অ্যাফেয়ার্সের বিশেষজ্ঞ ওমর এইচ রহমান বলেন, “যুক্তরাষ্ট্রের সহায়তা ছাড়া গাজা এবং আশেপাশের সংঘাতগুলোতে ইসরাইলের সামরিক কার্যক্রমের ধারাবাহিকতা বজায় রাখা অসম্ভব।”
গাজায় ইসরাইলি হামলায় এখন পর্যন্ত নিহতের সংখ্যা ৬৭ হাজার ছাড়িয়েছে, আহতের সংখ্যা প্রায় ১ লাখ ৭০ হাজার। এখনও অনেক নিরীহ মানুষ ধ্বংসস্তূপের নিচে চাপা পড়ে আছেন। ইয়েমেনে এবং ইরানে ইসরাইলের হামলার ফলে বহু সাধারণ মানুষ প্রাণ হারিয়েছেন। বিশেষ করে ইরানে চলতি বছরের জুনে অসংখ্য নিহতের ঘটনা ঘটেছে।
ব্রাউন বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষক উইলিয়াম ডি হার্টাং উল্লেখ করেছেন যে, “যুক্তরাষ্ট্রের অর্থনৈতিক ও সামরিক সহায়তা ছাড়া ইসরাইল এমন ব্যাপক ধ্বংসযজ্ঞ চালাতে সক্ষম হতো না।” এই প্রতিবেদনের ভিত্তিতে বোঝা যায়, যুক্তরাষ্ট্রের অস্ত্র সরবরাহ এবং কূটনৈতিক সমর্থন ইসরাইলের সামরিক অভিযানে মূল চালিকা শক্তি।
অন্যদিকে, হার্ভার্ড কেনেডি স্কুলের বাজেট বিশ্লেষক লিন্ডা বিলমেস জানিয়েছেন, ২০২৩ সালের অক্টোবর থেকে ২০২৫ সালের সেপ্টেম্বর পর্যন্ত সময়ে মার্কিন সামরিক সহায়তা এবং অপারেশনে মোট ব্যয় হয়েছে প্রায় ৩১ থেকে ৩৩ বিলিয়ন ডলার, যা ইসরাইলের জন্য বরাদ্দ সবচেয়ে বড় সামরিক সহায়তা।
ইসরাইল দীর্ঘদিন ধরে মার্কিন পররাষ্ট্র নীতিতে সবচেয়ে বড় আর্থিক প্রাপকের অবস্থানে রয়েছে। বছরে প্রায় ৩.৩ বিলিয়ন ডলার সামরিক সহায়তা পায় দেশটি, আর ২০২২ সাল পর্যন্ত মোট সহায়তার পরিমাণ ছাড়িয়েছে ১৫০ বিলিয়ন ডলার।
উল্লেখযোগ্য হলো, দুই বিভিন্ন প্রশাসন—জো বাইডেন ও ডোনাল্ড ট্রাম্প—ই ইসরাইলকে বিপুল অস্ত্র বিক্রির চুক্তি করেছেন, যা আগামী বছরগুলোতেও বহাল থাকবে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এই দ্বিদলীয় সমর্থনের কারণে ইসরাইল আন্তর্জাতিক আইন লঙ্ঘনের সুযোগ পেয়ে যাচ্ছে, যা পশ্চিমা গণতন্ত্রগুলোও তেমন প্রশ্ন তুলছে না।
তবে সাম্প্রতিক সময় যুক্তরাষ্ট্রে ইসরাইলের প্রতি জনমতের ধারা বদলাচ্ছে। ওয়াশিংটন পোস্টের এক জরিপে দেখা গেছে, ৪০ শতাংশ ইহুদি নাগরিক মনে করেন গাজায় ইসরাইল গণহত্যা চালাচ্ছে, আর ৬০ শতাংশের বেশি মনে করেন দেশটি যুদ্ধাপরাধ করেছে। নির্বাচনী প্রেক্ষাপটে এটি গুরুত্বপূর্ণ কারণ ২০২৮ সালের নির্বাচনে ডেমোক্র্যাটদের পক্ষে বাইডেন প্রশাসনের অবস্থান থেকে পালানো কঠিন হবে।
বিশ্লেষকরা আরও উল্লেখ করেন, যুক্তরাষ্ট্রে সামাজিক সুরক্ষার জন্য অর্থের অভাব থাকলেও ইসরাইলকে দেওয়া সামরিক সহায়তা কখনো কমেনি। সামরিক শিল্প-কমপ্লেক্সও এই সহযোগিতার বড় অংশের উপকারভোগী, কারণ অধিকাংশ অর্থই মার্কিন অস্ত্র উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠানগুলোকে যায়।
যুক্তরাষ্ট্রের এই বিপুল সামরিক ও আর্থিক সহায়তা মধ্যপ্রাচ্যে ইসরাইলের সামরিক কর্মকাণ্ডকে শক্তিশালী করেছে, যা অঞ্চলটির স্থিতিশীলতার বড়ো বাধা হিসেবে কাজ করছে। এই পরিস্থিতি শুধু মধ্যপ্রাচ্যে নয়, বিশ্বব্যাপী শান্তি ও নিরাপত্তার জন্যও ঝুঁকিপূর্ণ। পাঠকদের জন্য এটা বোঝা গুরুত্বপূর্ণ যে, এই অর্থায়নের পেছনে কূটনৈতিক, অর্থনৈতিক ও মানবিক প্রভাবগুলো গভীর এবং দীর্ঘমেয়াদী।