যুক্তরাষ্ট্রে বছরে দুবার ঘড়ির কাঁটা পরিবর্তনের প্রচলিত নিয়ম বাতিল করে বছরজুড়ে স্থায়ী ডেলাইট সেভিং টাইম (Daylight Saving Time-DST) চালুর উদ্যোগ নতুন করে গতি পেয়েছে। প্রতিনিধি পরিষদে সানশাইন প্রোটেকশন অ্যাক্ট (Sunshine Protection Act) পাস হওয়ার পর বিলটি এখন সিনেটে বিবেচনাধীন। সিনেটে অনুমোদন পেলে তা প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের স্বাক্ষরের জন্য পাঠানো হবে। প্রস্তাবিত আইন কার্যকর হলে যুক্তরাষ্ট্রে […]
ছবি: সংগৃহীত
যুক্তরাষ্ট্রে বছরে দুবার ঘড়ির কাঁটা পরিবর্তনের প্রচলিত নিয়ম বাতিল করে বছরজুড়ে স্থায়ী ডেলাইট সেভিং টাইম (Daylight Saving Time-DST) চালুর উদ্যোগ নতুন করে গতি পেয়েছে। প্রতিনিধি পরিষদে সানশাইন প্রোটেকশন অ্যাক্ট (Sunshine Protection Act) পাস হওয়ার পর বিলটি এখন সিনেটে বিবেচনাধীন। সিনেটে অনুমোদন পেলে তা প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের স্বাক্ষরের জন্য পাঠানো হবে।
প্রস্তাবিত আইন কার্যকর হলে যুক্তরাষ্ট্রে আর বছরে দুইবার ঘড়ির কাঁটা এক ঘণ্টা সামনে বা পেছনে সরাতে হবে না। এর ফলে সারা বছর একই সময় বহাল থাকবে, যা দীর্ঘদিন ধরে বহু নাগরিক ও ব্যবসায়িক প্রতিষ্ঠানের দাবি ছিল।
তবে বিষয়টি যতটা সহজ মনে হয়, বাস্তবে তা ততটা নয়। যুক্তরাষ্ট্রের ইতিহাস বলছে, বছরজুড়ে স্থায়ী ডেলাইট সেভিং টাইম চালুর একটি প্রচেষ্টা আগেও হয়েছিল, কিন্তু জনঅসন্তোষ ও নিরাপত্তা উদ্বেগের কারণে তা এক বছরেরও কম সময়ের মধ্যে বাতিল করতে হয়।
জ্বালানি সাশ্রয়ের উদ্দেশ্যে প্রথম বিশ্বযুদ্ধ চলাকালে ১৯১৮ সালে যুক্তরাষ্ট্রে প্রথম ডেলাইট সেভিং টাইম চালু করা হয়। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় ১৯৪২ সালে এটি পুনরায় কার্যকর করা হলেও বিভিন্ন অঙ্গরাজ্যে সময় ব্যবস্থাপনায় অসামঞ্জস্য দেখা দেয়। পরে ১৯৬৬ সালের ইউনিফর্ম টাইম অ্যাক্ট-এর মাধ্যমে বছরে দুবার ঘড়ির কাঁটা পরিবর্তনের একটি জাতীয় কাঠামো নির্ধারণ করা হয়।
এরপর ১৯৭৩ সালের জ্বালানি সংকটের সময় তৎকালীন প্রেসিডেন্ট রিচার্ড নিক্সন বছরজুড়ে স্থায়ী ডেলাইট সেভিং টাইম চালুর একটি আইনে স্বাক্ষর করেন। শুরুতে জনমত জরিপে প্রায় ৮০ শতাংশ নাগরিক এ সিদ্ধান্তকে সমর্থন করলেও কয়েক মাসের মধ্যেই সেই সমর্থন উল্লেখযোগ্যভাবে কমে যায়।
শীতকালে ডেলাইট সেভিং টাইম বহাল রাখার সবচেয়ে বড় সমস্যা ছিল সকালে সূর্য অনেক দেরিতে ওঠা। যুক্তরাষ্ট্রের বিভিন্ন অঞ্চলে সকাল প্রায় ৯টা পর্যন্ত অন্ধকার থাকত। ফলে স্কুলগামী শিশুদের অনেককে টর্চলাইট হাতে অন্ধকারে বের হতে হতো।
এই পরিস্থিতিতে কয়েকটি অঙ্গরাজ্যে শিশুদের সড়ক দুর্ঘটনায় প্রাণহানির ঘটনা ঘটে। সে সময় প্রকাশিত প্রতিবেদনে ফ্লোরিডাসহ কয়েকটি অঙ্গরাজ্যে স্কুলগামী শিশুদের মৃত্যুর ঘটনা ব্যাপক উদ্বেগের সৃষ্টি করে এবং স্থায়ী ডিএসটির বিরুদ্ধে জনমত দ্রুত বদলে যায়।
এদিকে মার্কিন পরিবহন দপ্তরের মূল্যায়নে দেখা যায়, স্থায়ী ডেলাইট সেভিং টাইম চালুর ফলে জ্বালানি সাশ্রয় হয়েছিল মাত্র ০.৪ থেকে ১.৫ শতাংশ, যা প্রত্যাশার তুলনায় অনেক কম। নিরাপত্তা ঝুঁকি ও সীমিত সুফল বিবেচনায় ১৯৭৪ সালের অক্টোবরে প্রেসিডেন্ট জেরাল্ড ফোর্ড আইনটি বাতিল করে আগের সময় ব্যবস্থায় ফিরে যান।
বর্তমানে কংগ্রেসে শুধু স্থায়ী ডেলাইট সেভিং টাইম নয়, স্থায়ী স্ট্যান্ডার্ড টাইম চালুর প্রস্তাবও আলোচনা হচ্ছে।
অনেক ঘুম ও স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞের মতে, স্থায়ী স্ট্যান্ডার্ড টাইম মানবদেহের সারকাডিয়ান রিদম (Circadian Rhythm) বা জৈবিক ঘড়ির সঙ্গে বেশি সামঞ্জস্যপূর্ণ। সকালে প্রাকৃতিক সূর্যালোক মানুষের ঘুম, মানসিক স্বাস্থ্য, রক্তচাপ, হরমোনের ভারসাম্য এবং কর্মক্ষমতার ওপর ইতিবাচক প্রভাব ফেলে।
অন্যদিকে কিছু ব্যবসায়ী সংগঠন এবং সাধারণ নাগরিকের একটি অংশ স্থায়ী ডেলাইট সেভিং টাইমের পক্ষে। তাদের যুক্তি, সন্ধ্যায় বেশি সময় আলো থাকলে কেনাকাটা, খেলাধুলা, ভ্রমণ এবং অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড বাড়ে।
এছাড়া কিছু ধর্মীয় সংগঠনও এ বিষয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছে। বিশেষ করে অর্থোডক্স ইহুদি সম্প্রদায়ের মতে, শীতকালে সূর্য অনেক দেরিতে উঠলে নির্ধারিত সকালের ধর্মীয় প্রার্থনা শেষ করে সময়মতো কর্মস্থলে পৌঁছানো কঠিন হয়ে পড়বে।
সানশাইন প্রোটেকশন অ্যাক্ট প্রতিনিধি পরিষদে পাস হলেও আইনটি কার্যকর হতে হলে সিনেটের অনুমোদন এবং প্রেসিডেন্টের স্বাক্ষর প্রয়োজন। তবে অতীতের অভিজ্ঞতা, জনস্বাস্থ্য, সড়ক নিরাপত্তা এবং বিভিন্ন স্বার্থসংশ্লিষ্ট পক্ষের ভিন্নমতের কারণে সিনেটে বিলটির ভবিষ্যৎ এখনো অনিশ্চিত বলে মনে করছেন রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা।
যদি আইনটি চূড়ান্তভাবে পাস হয়, তাহলে যুক্তরাষ্ট্রে সময় পরিবর্তনের শত বছরেরও বেশি পুরোনো একটি প্রথার অবসান ঘটবে। তবে সেটি হবে স্থায়ী ডেলাইট সেভিং টাইম, নাকি স্থায়ী স্ট্যান্ডার্ড টাইম—সে সিদ্ধান্ত এখনো চূড়ান্ত হয়নি।