যুক্তরাষ্ট্রে ২০০১ সালের ১১ সেপ্টেম্বরের ভয়াবহ সন্ত্রাসী হামলার মূল পরিকল্পনাকারী হিসেবে অভিযুক্ত খালিদ শেখ মোহাম্মদের গুরুত্বপূর্ণ একটি স্বীকারোক্তি বাতিল করেছেন মার্কিন সামরিক আদালতের বিচারক। শুক্রবার (২৮ আগস্ট) দেওয়া এ রায় দীর্ঘদিন ধরে চলা মামলায় মার্কিন সরকারের জন্য বড় ধরনের ধাক্কা হিসেবে দেখা হচ্ছে। মার্কিন সংবাদমাধ্যম নিউইয়র্ক পোস্টের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ২০০৭ সালে ফেডারেল তদন্তকারীদের কাছে […]
ছবি: সংগৃহীত
যুক্তরাষ্ট্রে ২০০১ সালের ১১ সেপ্টেম্বরের ভয়াবহ সন্ত্রাসী হামলার মূল পরিকল্পনাকারী হিসেবে অভিযুক্ত খালিদ শেখ মোহাম্মদের গুরুত্বপূর্ণ একটি স্বীকারোক্তি বাতিল করেছেন মার্কিন সামরিক আদালতের বিচারক। শুক্রবার (২৮ আগস্ট) দেওয়া এ রায় দীর্ঘদিন ধরে চলা মামলায় মার্কিন সরকারের জন্য বড় ধরনের ধাক্কা হিসেবে দেখা হচ্ছে।
মার্কিন সংবাদমাধ্যম নিউইয়র্ক পোস্টের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ২০০৭ সালে ফেডারেল তদন্তকারীদের কাছে খালিদ শেখ মোহাম্মদ যে বক্তব্য দিয়েছিলেন, তা তিনি স্বেচ্ছায় দেননি বলে রায় দিয়েছেন মামলার বিচারক লেফটেন্যান্ট কর্নেল মাইকেল শ্রামা।
বিচারকের সিদ্ধান্ত অনুযায়ী, ওই স্বীকারোক্তি মামলার প্রমাণ হিসেবে ব্যবহার করা যাবে না। রায়ে বলা হয়েছে, এফবিআই কর্মকর্তাদের কাছে বক্তব্য দেওয়ার সময় খালিদ শেখ মোহাম্মদ ‘চরম জবরদস্তির’ শিকার হয়েছিলেন। ফলে তার বক্তব্য স্বেচ্ছায় দেওয়া হয়েছিল—এমনটি প্রমাণ করতে প্রসিকিউশন ব্যর্থ হয়েছে।
এই সিদ্ধান্ত মামলাটির জন্য গুরুত্বপূর্ণ, কারণ ২০০৭ সালে তদন্তকারীদের কাছে দেওয়া ওই বক্তব্যকে বিচারে গুরুত্বপূর্ণ প্রমাণ হিসেবে ব্যবহারের পরিকল্পনা ছিল মার্কিন সরকারের।
রায়ের কয়েক দিন আগেই বিচারক খালিদ শেখ মোহাম্মদ ও তার সহঅভিযুক্তদের বিচার শুরুর জন্য ২০২৮ সালের জুন মাস নির্ধারণ করেছিলেন। নতুন সময়সূচি অনুযায়ী, ২০২৮ সালের ৫ জুন থেকে বিচার শুরু হওয়ার কথা রয়েছে। এতে ২০০১ সালের ৯/১১ হামলার প্রায় ২৭ বছর পর মামলাটির পূর্ণাঙ্গ বিচার শুরুর সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে।
৯/১১ হামলায় চারটি যাত্রীবাহী বিমান ছিনতাই করা হয়। এর মধ্যে দুটি বিমান নিউইয়র্কের ওয়ার্ল্ড ট্রেড সেন্টারের টুইন টাওয়ার এবং একটি পেন্টাগনে আঘাত হানে। অপর বিমানটি যাত্রীদের প্রতিরোধের মুখে পেনসিলভানিয়ায় বিধ্বস্ত হয়। ওই হামলায় প্রায় ৩ হাজার মানুষ নিহত হন।
মামলার প্রধান সামরিক কৌঁসুলি রিয়ার অ্যাডমিরাল অ্যারন সি. রাগ জানিয়েছেন, তারা বিচারকের রায় পর্যালোচনা করবেন। একই সঙ্গে সিদ্ধান্তটির বিরুদ্ধে আপিল করা হবে কি না, সে বিষয়েও শিগগির সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে।
তবে প্রসিকিউশন আপিল করলে মামলাটি আরও দীর্ঘায়িত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। অতীতে একই ধরনের আইনি সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে করা আপিল নিষ্পত্তিতে কয়েক বছর পর্যন্ত সময় লেগেছে।
খালিদ শেখ মোহাম্মদ ছাড়াও ৯/১১ হামলার ষড়যন্ত্রে জড়িত থাকার অভিযোগে ওয়ালিদ বিন আত্তাশ, মুস্তাফা আল-হাওসাউই এবং আম্মার আল-বালুচি আটক রয়েছেন। তাদের বিরুদ্ধে মামলাটি প্রায় দুই দশক ধরে বিভিন্ন আইনি জটিলতায় আটকে আছে।
মামলাটির অন্যতম বড় জটিলতা হলো অভিযুক্তদের কাছ থেকে পাওয়া তথ্য ও স্বীকারোক্তির গ্রহণযোগ্যতা। ২০০৩ সালে গ্রেপ্তারের পর খালিদ শেখ মোহাম্মদসহ অভিযুক্তদের গোপন সিআইএ কারাগারে জিজ্ঞাসাবাদের সময় বিভিন্ন ধরনের নির্যাতনের শিকার হওয়ার বিষয়টি দীর্ঘদিন ধরে আদালতে আলোচিত হয়ে আসছে।
পরবর্তীতে মার্কিন কৌঁসুলিরা ওই নির্যাতনের মাধ্যমে পাওয়া তথ্য আদালতে ব্যবহার না করার বিষয়ে সম্মত হন। তবে ২০০৭ সালে ফেডারেল তদন্তকারীদের কাছে খালিদ শেখ মোহাম্মদের দেওয়া বক্তব্য তুলনামূলকভাবে গুরুত্বপূর্ণ প্রমাণ হিসেবে ব্যবহারের পরিকল্পনা করা হয়েছিল। সর্বশেষ রায়ে সেই বক্তব্যও বাদ দেওয়ায় প্রসিকিউশনের মামলায় নতুন জটিলতা তৈরি হয়েছে।
অন্যদিকে, ওয়ালিদ বিন আত্তাশ ও মুস্তাফা আল-হাওসাউইয়ের দেওয়া একই ধরনের স্বীকারোক্তি আদালতে গ্রহণযোগ্য কি না, সে বিষয়ে বিচারক এখনো কোনো সিদ্ধান্ত দেননি।
২০২৪ সালের শেষ দিকে মামলাটি সমঝোতার মাধ্যমে নিষ্পত্তির কাছাকাছি পৌঁছেছিল। খালিদ শেখ মোহাম্মদসহ তিন অভিযুক্ত মৃত্যুদণ্ড এড়ানোর বিনিময়ে দোষ স্বীকার করতে রাজি হয়েছিলেন। তবে ৯/১১ হামলায় নিহতদের কয়েকটি পরিবারের তীব্র আপত্তির পর তৎকালীন মার্কিন প্রেসিডেন্ট জো বাইডেনের প্রশাসন ওই সমঝোতা বাতিলের উদ্যোগ নেয়। এরপর মামলাটি আবার দীর্ঘ আইনি লড়াইয়ে ফিরে যায়।
এদিকে ৯/১১ হামলায় নিহতদের স্বজনেরা দীর্ঘদিন ধরে অভিযুক্তদের বিচার শুরুর দাবি জানিয়ে আসছেন। তাদের মধ্যে অনেকে আশঙ্কা করছেন, চূড়ান্ত রায় হওয়ার আগেই অভিযুক্তরা কিউবার গুয়ানতানামো বে কারাগারে মারা যেতে পারেন।
সর্বশেষ রায়ে খালিদ শেখ মোহাম্মদের ২০০৭ সালের স্বীকারোক্তি বাদ পড়লেও মামলার বিচারপ্রক্রিয়া পুরোপুরি বাতিল হয়নি। তবে প্রমাণের গ্রহণযোগ্যতা নিয়ে চলমান আইনি লড়াই এবং সম্ভাব্য আপিলের কারণে ২০২৮ সালের নির্ধারিত বিচার শুরুর সময়সূচিও আবার পরিবর্তিত হতে পারে।