স্বজন হারানোর শোক নিয়েই নতুন করে জীবন শুরু করার চেষ্টা করছেন নেপালের বন্যাকবলিত পরিবারগুলো। কিন্তু যাদের মরদেহও মেলেনি, তাদের মৃত্যু যেন আইনের চোখেও এখনো নিশ্চিত নয়। চীন সীমান্তবর্তী ভয়াবহ বন্যার পর উদ্ধার অভিযান শেষ হলেও পাঁচ হাজারের বেশি মানুষ এখনো নিখোঁজ। মরদেহ না পাওয়ায় এসব পরিবারের সামনে তৈরি হয়েছে মৃত্যু সনদ, ক্ষতিপূরণ, সম্পত্তি হস্তান্তর ও […]
ছবি: সংগৃহীত
স্বজন হারানোর শোক নিয়েই নতুন করে জীবন শুরু করার চেষ্টা করছেন নেপালের বন্যাকবলিত পরিবারগুলো। কিন্তু যাদের মরদেহও মেলেনি, তাদের মৃত্যু যেন আইনের চোখেও এখনো নিশ্চিত নয়। চীন সীমান্তবর্তী ভয়াবহ বন্যার পর উদ্ধার অভিযান শেষ হলেও পাঁচ হাজারের বেশি মানুষ এখনো নিখোঁজ। মরদেহ না পাওয়ায় এসব পরিবারের সামনে তৈরি হয়েছে মৃত্যু সনদ, ক্ষতিপূরণ, সম্পত্তি হস্তান্তর ও উত্তরাধিকার নির্ধারণের জটিলতা।
গত মাসে কাঠমান্ডুর পশুপতিনাথ মন্দিরে নিখোঁজ স্বজনদের স্মরণসভায় যোগ দিয়েছিলেন বেত্রাবতী গ্রামের মদন লাল লাওয়াত। বন্যার স্রোতে তাঁর ভাই মঙ্গলসহ পাঁচ আত্মীয় ভেসে যান। গ্রামের বাইরে থাকায় তিনি বেঁচে যান। লাওয়াতের ভাষ্য, বাড়ি বাড়ি গিয়ে মানুষকে সতর্ক করতে গিয়ে প্রাণ হারিয়েছিলেন তাঁর ভাই মঙ্গল।
লাওয়াত বলেন, কীভাবে আবার জীবন শুরু করবেন, তা তিনি জানেন না। পুলিশ এখনো নিখোঁজদের মরদেহ খুঁজছে। তবে তাঁর আশঙ্কা, শেষ পর্যন্ত হয়তো ভাইয়ের মরদেহ আর পাওয়া যাবে না।
নেপালের আইনে কোনো ব্যক্তি নিখোঁজ হওয়ার ১২ বছর পর তাকে মৃত হিসেবে ধরে নেওয়ার বিধান রয়েছে। তবে বড় ধরনের প্রাকৃতিক দুর্যোগে নিখোঁজদের ক্ষেত্রে কীভাবে দ্রুত আইনি স্বীকৃতি দেওয়া হবে, সে বিষয়ে স্পষ্ট বিধান নেই। ফলে সাম্প্রতিক বন্যায় নিখোঁজ হাজারো মানুষের পরিবার অনিশ্চয়তার মধ্যে পড়েছে।
আইন অনুযায়ী, শেষকৃত্যের জন্য সর্বোচ্চ ২৫ হাজার রুপি এবং মৃত্যুর ঘটনায় প্রথমবার প্রায় দুই লাখ রুপি ও পরবর্তী ক্ষেত্রে এক লাখ রুপি ক্ষতিপূরণ পাওয়ার সুযোগ রয়েছে। কিন্তু মৃত্যু সনদ ছাড়া এসব সুবিধা পাওয়াও সম্ভব নয়।
আইন বিশেষজ্ঞ বিপিন অধিকারী বলেন, বর্তমান দুর্যোগ পরিস্থিতির বাস্তবতায় নিখোঁজ ব্যক্তিদের বিষয়ে বিদ্যমান আইন সেকেলে হয়ে গেছে।
এখন পর্যন্ত বন্যা থেকে ১ হাজার ৪০০-এর বেশি মরদেহ উদ্ধার করা হয়েছে। তবে উদ্ধার করা মরদেহ শনাক্ত করতে ডিএনএ পরীক্ষা প্রয়োজন হওয়ায় প্রক্রিয়াটি ধীরগতিতে এগোচ্ছে। ফলে অনেক পরিবার এখনো নিশ্চিত হতে পারছে না উদ্ধার হওয়া মরদেহগুলোর মধ্যে তাদের স্বজন রয়েছেন কি না।
সরকারের হিসাবে, বন্যায় নেপালে ৭ হাজার ৫৭০টি ভবন ক্ষতিগ্রস্ত বা ধ্বংস হয়েছে। সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত বেত্রাবতী এলাকায় ৩ হাজারের বেশি ভবন নষ্ট হয়েছে।
বিদুরের মেয়র রাজন শ্রেষ্ঠ বলেন, নিখোঁজ ব্যক্তিদের পরিবারকে বর্তমান আইনের কারণে ১২ বছর পর্যন্ত অপেক্ষা করতে হতে পারে। সরকার এই আইনি জটিলতা সমাধানে কাজ করছে এবং প্রয়োজন হলে আইন সংশোধনেরও প্রস্তুতি রয়েছে।
বন্যায় ক্ষয়ক্ষতির পর নেপালের পুনর্গঠনে সর্বোচ্চ ৪৮০ কোটি ডলার প্রয়োজন হতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে। জাতিসংঘে নেপালের প্রধানমন্ত্রী বালেন শাহ জানিয়েছেন, এই পুনর্গঠনে দেশের মোট দেশজ উৎপাদনের (জিডিপি) ১০ শতাংশের বেশি অর্থ প্রয়োজন হতে পারে। তিনি ঋণের পরিবর্তে অনুদানভিত্তিক আন্তর্জাতিক সহায়তার আহ্বান জানিয়েছেন।
বন্যায় সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্তদের একজন তিসুম ঘাল। ২০১৫ সালের ভয়াবহ ভূমিকম্পে বাড়ি হারিয়ে তিনি বেত্রাবতীতে এসেছিলেন। এবারকার বন্যায় তিনি হারিয়েছেন ১৯ স্বজনকে, যাদের মধ্যে রয়েছেন তাঁর পাঁচ বোন।
এখনো কোনো ক্ষতিপূরণ পাননি তিসুম ঘাল। স্বজনদের মরদেহ না পেলেও তিনি শেষকৃত্যের প্রস্তুতি নিচ্ছেন। তাঁর মতো আরও বহু পরিবার এখন একই অনিশ্চয়তার মধ্যে দিন কাটাচ্ছে।