বর্তমান যুগে আমরা জ্ঞানের সন্ধানে ও মানসিক চাপের মুহূর্তে প্রযুক্তির আশ্রয় নিচ্ছি। এর মধ্যে চ্যাটজিপিটি, একটি কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাভিত্তিক চ্যাটবট, মানুষের দৈনন্দিন জীবনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছে। তবে সম্প্রতি ওপেনএআই, এই চ্যাটবটটির নির্মাতা প্রতিষ্ঠান, জানিয়েছে যে প্রতিদিন লাখো ব্যবহারকারী তাদের কাছে আত্মহত্যার ইচ্ছা প্রকাশ করছেন। এই তথ্য প্রযুক্তির অগ্রগতি ও মানব জীবনের জটিলতার নতুন দিক উন্মোচন […]
বর্তমান যুগে আমরা জ্ঞানের সন্ধানে ও মানসিক চাপের মুহূর্তে প্রযুক্তির আশ্রয় নিচ্ছি। এর মধ্যে চ্যাটজিপিটি, একটি কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাভিত্তিক চ্যাটবট, মানুষের দৈনন্দিন জীবনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছে। তবে সম্প্রতি ওপেনএআই, এই চ্যাটবটটির নির্মাতা প্রতিষ্ঠান, জানিয়েছে যে প্রতিদিন লাখো ব্যবহারকারী তাদের কাছে আত্মহত্যার ইচ্ছা প্রকাশ করছেন। এই তথ্য প্রযুক্তির অগ্রগতি ও মানব জীবনের জটিলতার নতুন দিক উন্মোচন করেছে।
সোমবার (২৭ অক্টোবর) ওপেনএআই তাদের ব্লগপোস্টে জানিয়েছে, প্রতি সপ্তাহে এক মিলিয়নেরও বেশি ব্যবহারকারী চ্যাটজিপিটিকে এমন বার্তা পাঠাচ্ছেন যা আত্মহত্যার পরিকল্পনা বা ইচ্ছার স্পষ্ট ইঙ্গিত বহন করে। এ ছাড়াও, প্রায় ০.০৭ শতাংশ সক্রিয় ব্যবহারকারী, অর্থাৎ প্রায় ৫ লাখ ৬০ হাজার ব্যক্তি, তাদের কথোপকথনে মানসিক স্বাস্থ্যের গুরুতর সমস্যার সম্ভাব্য লক্ষণ যেমন মনোরোগজনিত বিভ্রম (psychosis) বা মানিয়াজনিত (mania) চিহ্নিত করেছেন।
এই তথ্য প্রকাশের মাধ্যমে ওপেনএআই একটি গুরুতর সামাজিক ও স্বাস্থ্যগত সমস্যার প্রতি দৃষ্টি আকর্ষণ করেছে। মানসিক স্বাস্থ্যের সংকট এখন শুধু ব্যক্তিগত বা চিকিৎসা ক্ষেত্রের বিষয় নয়; এটি প্রযুক্তির মাধ্যমে মানুষের সঙ্গে সরাসরি সংযুক্ত হয়ে উঠেছে। চ্যাটজিপিটির মতো এআই প্ল্যাটফর্ম মানসিক স্বাস্থ্যের সমস্যার সঙ্গে লড়াইয়ে সহায়ক হতে পারলেও, একই সঙ্গে এসব প্ল্যাটফর্মের ওপর নির্ভরতা বাড়ার ফলে নতুন চ্যালেঞ্জও সৃষ্টি হচ্ছে।
সম্প্রতি, এক কিশোরের আত্মহত্যার ঘটনায় চ্যাটজিপিটির ভূমিকা নিয়ে তীব্র সমালোচনা ও তদন্ত শুরু হয়েছে। ওই কিশোরের পরিবার অভিযোগ করেছে, আত্মহত্যার আগে সে দীর্ঘ সময় চ্যাটজিপিটির সঙ্গে কথোপকথন করেছিল। এই ঘটনা প্রযুক্তি কোম্পানির ওপর নজরদারি বাড়িয়েছে। যুক্তরাষ্ট্রের ফেডারেল ট্রেড কমিশন (এফটিসি) এখন ওপেনএআইসহ অন্যান্য এআই চ্যাটবট নির্মাতা প্রতিষ্ঠানগুলোর বিরুদ্ধে একটি বিস্তৃত তদন্ত চালাচ্ছে, বিশেষ করে শিশু ও কিশোরদের ওপর এর প্রভাব জানার জন্য।
এই পরিস্থিতিতে, ওপেনএআই তাদের সাম্প্রতিক GPT-৫ আপডেটের মাধ্যমে চ্যাটজিপিটির ‘অবাঞ্ছিত আচরণ’ কমানোর দাবি করেছে। প্রতিষ্ঠানটির এক মূল্যায়নে দেখা গেছে, নিজের ক্ষতি করা বা আত্মহত্যা সংক্রান্ত ১ হাজারেরও বেশি কথোপকথনে ব্যবহারকারীদের নিরাপত্তা উন্নত হয়েছে। নতুন মডেলটি আগের তুলনায় ৯১ শতাংশ ‘কাঙ্ক্ষিত আচরণের’ সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ, যেখানে পুরোনো মডেলের হার ছিল ৭৭ শতাংশ।
GPT-৫ মডেলে সঙ্কটকালীন সহায়তা হটলাইনগুলোর অ্যাক্সেস বৃদ্ধি করা হয়েছে এবং দীর্ঘ কথোপকথনের মাঝে ব্যবহারকারীদের বিরতি নেওয়ার পরামর্শ দেওয়ার ব্যবস্থা যোগ করা হয়েছে। মানসিক স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ ও মনোবিজ্ঞানীদের সহযোগিতায় গত কয়েক মাসে গ্লোবাল ফিজিশিয়ান নেটওয়ার্কের ১৭০ জন চিকিৎসক মডেলের নিরাপত্তা মূল্যায়নে অংশ নিয়েছেন। তারা ১,৮০০টিরও বেশি মডেল প্রতিক্রিয়া পর্যালোচনা করে নতুন সংস্করণের মান নিশ্চিত করেছেন।
এই তথ্য ও উদ্যোগগুলি প্রযুক্তি ও মানবিক সহানুভূতির যুগপৎ প্রয়াসের নিদর্শন। তবে, চ্যাটজিপিটির ওপর নির্ভরতার পাশাপাশি মানসিক স্বাস্থ্য সেবার প্রয়োজনীয়তা ও সামাজিক সচেতনতা বাড়ানো অত্যন্ত জরুরি। আত্মহত্যা প্রতিরোধ ও মানসিক স্বাস্থ্য সুরক্ষা শুধুমাত্র প্রযুক্তির মাধ্যমে সম্ভব নয়, বরং এটি একটি সম্মিলিত প্রচেষ্টা যেখানে পরিবার, সমাজ, চিকিৎসা ও প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠান একত্রে কাজ করবে।
পাঠকদের জন্য গুরুত্ব: চ্যাটজিপিটির মতো এআই প্ল্যাটফর্ম মানসিক সমস্যায় আক্রান্তদের জন্য প্রথম পর্যায়ের সহায়ক হতে পারে, তবে এটি পেশাদার চিকিৎসার বিকল্প নয়। আত্মহত্যার চিন্তা বা মানসিক অসুস্থতা অনুভব করলে অবিলম্বে চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া উচিত। প্রযুক্তির উন্নতির সঙ্গে সঙ্গে আমাদের মানসিক স্বাস্থ্য সচেতনতা ও সেবার মান উন্নয়ন করাও সমান জরুরি।