গাজায় যুদ্ধবিরতির পরও হামাসের বিরুদ্ধে ইসরায়েলি সামরিক অভিযান চালিয়ে যাওয়া নিয়ে প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু ও মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের বিশেষ দূত জ্যারেড কুশনারের মধ্যে মতবিরোধ দেখা দিয়েছে। সোমবারের বৈঠকে নেতানিয়াহু ২০২৩ সালের ৭ অক্টোবরের হামলায় জড়িত হামাস সদস্যদের বিরুদ্ধে ইসরায়েলি হামলা অব্যাহত রাখার অবস্থানে অনড় ছিলেন বলে বৈঠকের বিষয়ে অবগত এক কর্মকর্তার বরাতে জানিয়েছে দ্য […]
ছবি: সংগৃহীত
গাজায় যুদ্ধবিরতির পরও হামাসের বিরুদ্ধে ইসরায়েলি সামরিক অভিযান চালিয়ে যাওয়া নিয়ে প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু ও মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের বিশেষ দূত জ্যারেড কুশনারের মধ্যে মতবিরোধ দেখা দিয়েছে। সোমবারের বৈঠকে নেতানিয়াহু ২০২৩ সালের ৭ অক্টোবরের হামলায় জড়িত হামাস সদস্যদের বিরুদ্ধে ইসরায়েলি হামলা অব্যাহত রাখার অবস্থানে অনড় ছিলেন বলে বৈঠকের বিষয়ে অবগত এক কর্মকর্তার বরাতে জানিয়েছে দ্য টাইমস অব ইসরায়েল।
চলতি আগস্টের শুরুতে ইসরায়েল জানিয়েছিল, ২০২৩ সালের ৭ অক্টোবরের হামলায় জড়িত ফিলিস্তিনি যোদ্ধাদের খুঁজে বের করে হত্যা করার জন্য তারা বিশেষ অভিযান চালাচ্ছে। যুদ্ধবিরতি চলাকালে এসব অভিযান ইসরায়েল ও হামাসের মধ্যে স্বাক্ষরিত সমঝোতার সঙ্গে নতুন করে সংঘাত তৈরি করেছে।
তবে ইসরায়েলের অবস্থান হলো, যেসব হামাস সদস্য ইসরায়েলি বাহিনীর জন্য তাৎক্ষণিক হুমকি তৈরি করছেন, তাদের বিরুদ্ধে সামরিক ব্যবস্থা নেওয়ার অধিকার তাদের রয়েছে। কুশনারও এই যুক্তি পুরোপুরি প্রত্যাখ্যান করেননি। তিনি নেতানিয়াহুকে জানান, সত্যিকার অর্থে তাৎক্ষণিক হুমকি তৈরি করা ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে অভিযান নিয়ে আপত্তি নেই। তবে এমন যুক্তি যেন ব্যাপকভাবে ব্যবহার করে নিয়মিত সামরিক অভিযান চালানো না হয়, সে বিষয়ে সতর্ক করেন তিনি।
গাজায় দীর্ঘস্থায়ী শান্তি প্রতিষ্ঠার জন্য ট্রাম্প প্রশাসনের উদ্যোগে হামাসকে নিরস্ত্রীকরণের পরিকল্পনা সামনে এসেছে। ৩০ জুলাই ট্রাম্পের ‘বোর্ড অব পিস’ হামাস ও অন্যান্য সশস্ত্র গোষ্ঠীর নিরস্ত্রীকরণ নিয়ে একটি সমঝোতায় পৌঁছানোর ঘোষণা দেয়। পরিকল্পনা অনুযায়ী, নিরস্ত্রীকরণ ধাপে ধাপে এগোনোর সঙ্গে ইসরায়েলি বাহিনীরও পর্যায়ক্রমে গাজা থেকে সরে যাওয়ার কথা রয়েছে।
তবে ইসরায়েল এখনো এই পরিকল্পনা পুরোপুরি মেনে নেয়নি। নেতানিয়াহুর অবস্থান হলো, হামাসের সম্পূর্ণ নিরস্ত্রীকরণ নিশ্চিত না হওয়া পর্যন্ত ইসরায়েলি সেনা প্রত্যাহার বা গাজার পুনর্গঠন প্রক্রিয়া এগোনো উচিত নয়। অন্যদিকে হামাসের অবস্থান, ইসরায়েলকে আগে হামলা বন্ধ করে নির্ধারিত এলাকা থেকে সেনা সরাতে হবে। এই ‘কে আগে পদক্ষেপ নেবে’—তা নিয়েই আলোচনায় বড় অচলাবস্থা তৈরি হয়েছে।
কুশনারের সঙ্গে বৈঠকে এই বিষয়টি নিয়েই নেতানিয়াহু নিজের অবস্থান স্পষ্ট করেন বলে সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে। বৈঠক থেকে কোনো সমঝোতা বের হয়নি।
কুশনার ইসরায়েল ছাড়ার পরদিন গাজায় ইসরায়েলি হামলায় অন্তত ছয়জন নিহত ও ১৪ জন আহত হন বলে রয়টার্স জানিয়েছে। ইসরায়েলি বাহিনী দাবি করেছে, হামলার লক্ষ্য ছিল ২০২৩ সালের ৭ অক্টোবরের হামলায় জড়িত হামাসের কয়েকজন কমান্ডার। হামলাটি একটি ক্যাফেকে লক্ষ্য করে চালানো হয়, যেখানে বাস্তুচ্যুত ফিলিস্তিনিরা অবস্থান করছিলেন।
এর আগে ও পরেও গাজায় ইসরায়েলি হামলায় বেসামরিক হতাহতের ঘটনা অব্যাহত রয়েছে। বুধবারের হামলাগুলোতেও অন্তত ১০ জন নিহত হওয়ার খবর পাওয়া গেছে, যাদের মধ্যে একটি কিশোরী ও কয়েকজন পুলিশ সদস্য ছিলেন। ইসরায়েল বলেছে, তাদের লক্ষ্য ছিল হামাসের কমান্ডাররা।
এই পরিস্থিতিতে যুদ্ধবিরতির কার্যকারিতা নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন উঠেছে। হামাস অভিযোগ করেছে, ইসরায়েল হামলা চালিয়ে শান্তি উদ্যোগ দুর্বল করছে।
ট্রাম্প প্রশাসন গাজায় যুদ্ধবিরতি কার্যকর করা এবং হামাসকে নিরস্ত্রীকরণের মাধ্যমে সংঘাতের অবসান ঘটাতে চাইছে। কিন্তু নেতানিয়াহু পুরো নিরস্ত্রীকরণকে ইসরায়েলি সেনা প্রত্যাহারের পূর্বশর্ত হিসেবে দেখছেন। ফলে দুই পক্ষের মধ্যে আলোচনার মূল বাধা এখনো কাটেনি।
এদিকে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পও প্রকাশ্যে ইসরায়েলকে গাজায় হামলা কমানোর আহ্বান জানিয়েছেন। তার বক্তব্য অনুযায়ী, হামাস নিরস্ত্রীকরণে সম্মত হওয়ার পর শান্তি পরিকল্পনা বাস্তবায়নে সামরিক অভিযান বন্ধ করা প্রয়োজন।
সব মিলিয়ে, হামাসের নিরস্ত্রীকরণ, ইসরায়েলি সেনা প্রত্যাহার এবং গাজায় হামলা বন্ধ—এই তিনটি বিষয় নিয়ে যুক্তরাষ্ট্র, ইসরায়েল ও হামাসের অবস্থানের পার্থক্য এখনো স্পষ্ট। কুশনারের সাম্প্রতিক বৈঠকেও সেই মতবিরোধ দূর হয়নি। ফলে যুদ্ধবিরতির মধ্যেও গাজায় নতুন করে সহিংসতা বাড়ার আশঙ্কা থেকেই যাচ্ছে।
তথ্যসূত্র: রয়টার্স, এপি, দ্য গার্ডিয়ান ও দ্য টাইমস অব ইসরায়েল