সম্পূর্ণ নিউজ বাংলা-ভয়েজ

বাংলাদেশ
৪:৩৫ অপরাহ্ন, ২৮ আগস্ট ২০২৬

মক্কা প্রতিরক্ষা জোটে যোগ দিলে বাংলাদেশের কী লাভ, কী ঝুঁকি

সৌদি আরব, তুরস্ক ও পাকিস্তানের মধ্যে স্বাক্ষরিত মক্কা যৌথ প্রতিরক্ষা চুক্তি ঘিরে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে আলোচনা চলছে। আনুষ্ঠানিকভাবে মক্কা যৌথ প্রতিরক্ষা চুক্তি নামে পরিচিত এই জোটকে অনেকে ‘মুসলিম ন্যাটো’ হিসেবেও অভিহিত করছেন। প্রাথমিকভাবে তিন দেশ এতে যুক্ত থাকলেও ভবিষ্যতে সদস্যসংখ্যা বাড়তে পারে বলে আলোচনা রয়েছে। সম্ভাব্য নতুন সদস্য হিসেবে বাংলাদেশের নামও সামনে এসেছে। বাংলাদেশের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় […]

মক্কা প্রতিরক্ষা জোটে যোগ দিলে বাংলাদেশের কী লাভ, কী ঝুঁকি

ছবি: সংগৃহীত

নিজস্ব প্রতিবেদক
৪ মিনিটে পড়ুন |

সৌদি আরব, তুরস্ক ও পাকিস্তানের মধ্যে স্বাক্ষরিত মক্কা যৌথ প্রতিরক্ষা চুক্তি ঘিরে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে আলোচনা চলছে। আনুষ্ঠানিকভাবে মক্কা যৌথ প্রতিরক্ষা চুক্তি নামে পরিচিত এই জোটকে অনেকে ‘মুসলিম ন্যাটো’ হিসেবেও অভিহিত করছেন। প্রাথমিকভাবে তিন দেশ এতে যুক্ত থাকলেও ভবিষ্যতে সদস্যসংখ্যা বাড়তে পারে বলে আলোচনা রয়েছে। সম্ভাব্য নতুন সদস্য হিসেবে বাংলাদেশের নামও সামনে এসেছে।

বাংলাদেশের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, মক্কা প্রতিরক্ষা চুক্তির বিষয়ে ঢাকা ইতিবাচক। তবে বাংলাদেশ এই জোটে যোগ দেবে কি না, সে বিষয়ে এখনো চূড়ান্ত কোনো সিদ্ধান্ত হয়নি।

গতকাল জাতীয় সংসদে পররাষ্ট্রমন্ত্রী ড. খলিলুর রহমান বলেন, জোটে যোগদানের বিষয়টি বর্তমান সদস্য দেশগুলোর আগ্রহ ও আমন্ত্রণের ওপর নির্ভর করবে। আমন্ত্রণ জানানো হলে বাংলাদেশ বিষয়টি ইতিবাচকভাবে বিবেচনা করবে। তিনি এটিকে মুসলিম দেশগুলোর অভ্যন্তরীণ বিষয় হিসেবেও উল্লেখ করেন।

মক্কা প্রতিরক্ষা জোট কী

আন্তর্জাতিক ভূরাজনীতি বিশ্লেষক ও তুরস্কের হাসান কালিয়ানকু বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক মুরাত আসলামের মতে, মক্কা চুক্তিকে আক্রমণাত্মক সামরিক জোট হিসেবে দেখা ঠিক হবে না। এটি মূলত একটি প্রতিরক্ষামূলক কাঠামো, যার উদ্দেশ্য সদস্য দেশগুলোর পারস্পরিক সংঘাত এড়ানো এবং সম্মিলিত প্রতিরক্ষা সক্ষমতা বাড়ানো।

তার মতে, চুক্তিটির সামরিক দিকের পাশাপাশি বাণিজ্যিক ও ভূরাজনৈতিক গুরুত্বও রয়েছে। ভবিষ্যতে এতে আরও দেশ যুক্ত হওয়ার সম্ভাবনাও রয়েছে।

বাংলাদেশের কী লাভ হতে পারে

নিরাপত্তা বিশ্লেষক হাসিব আজিজের মতে, মক্কা জোটে যোগ দিলে বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় সুবিধা হতে পারে যৌথ সামরিক সক্ষমতা বাড়ানোর সুযোগ। বিশেষ করে তুরস্ক ও পাকিস্তানের সঙ্গে প্রতিরক্ষা সহযোগিতা বাংলাদেশের জন্য নতুন প্রযুক্তি ও প্রশিক্ষণের সুযোগ তৈরি করতে পারে।

এ ছাড়া প্রযুক্তিগত অংশীদারত্ব, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআইভিত্তিক প্রতিরক্ষা সহযোগিতা এবং গোয়েন্দা তথ্য বিনিময়ের মতো ক্ষেত্রেও বাংলাদেশের অংশগ্রহণ বাড়তে পারে।

বাংলাদেশ ইতোমধ্যে তুরস্ক থেকে বায়রাক্তার ড্রোন ও অটোকার কোবরা সামরিক যান আমদানি করছে। মক্কা জোটের মাধ্যমে দুই দেশের প্রতিরক্ষা সহযোগিতা আরও বিস্তৃত হওয়ার সুযোগ তৈরি হতে পারে।

সৌদি আরবও বাংলাদেশের দীর্ঘদিনের উন্নয়ন সহযোগী। দেশটিতে বিপুলসংখ্যক বাংলাদেশি কর্মরত থাকায় সৌদি আরব বাংলাদেশের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ রেমিট্যান্স উৎস। বাংলাদেশ ইতোমধ্যে সৌদি আরবের সঙ্গে একটি নৌ প্রতিরক্ষা জোটেও যুক্ত রয়েছে।

হাসিব আজিজের মতে, মক্কা প্রতিরক্ষা চুক্তিতে যোগ দিলে ভারত মহাসাগর ও আরব সাগরকেন্দ্রিক নৌ যোগাযোগ ও সরবরাহ ব্যবস্থার ক্ষেত্রেও বাংলাদেশের জন্য নতুন সম্ভাবনা তৈরি হতে পারে। একই সঙ্গে জাতিসংঘ শান্তিরক্ষা মিশনে বাংলাদেশের দীর্ঘ অভিজ্ঞতা রয়েছে। এই অভিজ্ঞতা কাজে লাগিয়ে প্রশিক্ষণ ও সামরিক মানদণ্ড বা কমপ্লায়েন্সের ক্ষেত্রেও বাংলাদেশ ভূমিকা রাখতে পারে।

বড় ঝুঁকি কোথায়

তবে জোটে যোগ দেওয়ার ক্ষেত্রে ঝুঁকিও রয়েছে। এর অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো যৌথ প্রতিরক্ষার নীতি। অর্থাৎ কোনো একটি সদস্য রাষ্ট্র আক্রান্ত হলে সেটিকে জোটের অন্য সদস্যদের ওপর হামলা হিসেবে বিবেচনা করার নীতি কার্যকর হতে পারে।

ন্যাটো-ধরনের এমন একটি ব্যবস্থায় বাংলাদেশ যুক্ত হলে ভবিষ্যতে অন্য কোনো সদস্য দেশের সঙ্গে সংঘাতের কারণে বাংলাদেশও পরোক্ষভাবে যুদ্ধে জড়িয়ে পড়ার পরিস্থিতিতে পড়তে পারে।

তবে অধ্যাপক মুরাত আসলাম মনে করেন, মক্কা চুক্তিকে ন্যাটোর সঙ্গে পুরোপুরি তুলনা করা ঠিক হবে না। কারণ এর ন্যাটোর মতো কোনো স্থায়ী কমান্ড কাঠামো বা নিজস্ব সেনাবাহিনী নেই। অতীতে সৌদি আরব ইরানের হামলার মুখে পড়লেও পাকিস্তানকে সরাসরি কোনো যুদ্ধে অংশ নিতে হয়নি—এমন উদাহরণও তিনি তুলে ধরেন।

ভারত-পাকিস্তান সমীকরণও বড় বিষয়

বাংলাদেশের জন্য আরেকটি বড় প্রশ্ন হলো দক্ষিণ এশিয়ার ভূরাজনীতি। মক্কা জোটের অন্যতম সদস্য পাকিস্তান ভারতের দীর্ঘদিনের কৌশলগত প্রতিদ্বন্দ্বী। ফলে বাংলাদেশ এই জোটে যোগ দিলে দিল্লি বিষয়টিকে কীভাবে দেখবে, তা গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে।

ভবিষ্যতে ভারত ও পাকিস্তানের মধ্যে কোনো সামরিক উত্তেজনা বা সংঘাত তৈরি হলে মক্কা জোটের অবস্থান কী হবে এবং সেখানে বাংলাদেশের ভূমিকা কী দাঁড়াবে—এখনো তার স্পষ্ট উত্তর নেই। এ ধরনের পরিস্থিতিতে বাংলাদেশের নিজস্ব পররাষ্ট্রনীতি ও নিরাপত্তা স্বার্থের ওপর চাপ তৈরি হওয়ার আশঙ্কাও রয়েছে।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগের অধ্যাপক লাইলুফার ইয়াসমিন মনে করেন, বাংলাদেশকে এ ধরনের সিদ্ধান্ত নেওয়ার আগে দেশের দীর্ঘমেয়াদি অগ্রাধিকারগুলো বিবেচনা করতে হবে। বিশেষ করে বাণিজ্য, বিনিয়োগ ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার সঙ্গে বাংলাদেশের সম্পর্কের গুরুত্বের সঙ্গে একটি সামরিক জোটে যোগদানের প্রয়োজনীয়তার তুলনা করা জরুরি।

তিনি উল্লেখ করেন, স্বাধীনতার পর বাংলাদেশ এখন পর্যন্ত কোনো সামরিক জোটে যোগ দেয়নি। ফলে মক্কা চুক্তিতে যোগ দেওয়া হলে সেটি দেশের পররাষ্ট্রনীতিতে একটি গুরুত্বপূর্ণ নতুন পদক্ষেপ হবে। এ কারণে বিষয়টি জাতীয় পর্যায়ে ব্যাপক আলোচনা ও পর্যালোচনার মাধ্যমে বিবেচনা করা প্রয়োজন।

অর্থনৈতিক স্বার্থও বিবেচনায়

বাংলাদেশের পররাষ্ট্রনীতিতে ঐতিহাসিকভাবে অসামরিক ও ভারসাম্যপূর্ণ অবস্থান গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছে। কিন্তু মধ্যপ্রাচ্যে ইরান-আমেরিকা যুদ্ধ এবং এর পরবর্তী পরিস্থিতিতে আঞ্চলিক নিরাপত্তা, বিশেষ করে বাণিজ্যিক নৌপথের নিরাপত্তা নিয়ে নতুন বাস্তবতা তৈরি হয়েছে।

আঞ্চলিক দেশগুলো নিজেদের নিরাপত্তা কাঠামো আরও শক্তিশালী করার চেষ্টা করছে। এ পরিস্থিতিতে বাংলাদেশ কোনো সামরিক জোটের অংশ না হয়েও নিজের অর্থনৈতিক ও বাণিজ্যিক স্বার্থ সুরক্ষিত রাখতে পারবে কি না, সেটিও এখন গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন।

সব মিলিয়ে, মক্কা প্রতিরক্ষা জোটে যোগ দিলে বাংলাদেশের জন্য প্রতিরক্ষা প্রযুক্তি, যৌথ প্রশিক্ষণ, গোয়েন্দা সহযোগিতা এবং কৌশলগত অংশীদারত্বের নতুন সুযোগ তৈরি হতে পারে। একই সঙ্গে জোটের যৌথ প্রতিরক্ষা নীতি, ভারত-পাকিস্তান সম্পর্ক এবং বাংলাদেশের ঐতিহ্যগত ভারসাম্যপূর্ণ পররাষ্ট্রনীতির ওপর সম্ভাব্য প্রভাবও বিবেচনায় নিতে হবে।

বাংলাদেশ এখনো এই জোটে যোগ দেওয়ার সিদ্ধান্ত নেয়নি। ফলে শেষ পর্যন্ত সদস্য হওয়ার আগে নিরাপত্তা, অর্থনীতি, বাণিজ্য, কূটনৈতিক স্বাধীনতা এবং দীর্ঘমেয়াদি জাতীয় স্বার্থ—সব দিক বিবেচনা করেই সিদ্ধান্ত নিতে হবে।

Facebook Comments Box
Advertise with us
এ বিভাগের আরও খবর


আর্কাইভ ক্যালেণ্ডার
Su Mo Tu We Th Fr Sa
Advertise with us
আরও বাংলা-ভয়েজ সংবাদ