গত চার দশকের পর্যবেক্ষণে দেখা সবচেয়ে শক্তিশালী এল নিনোর একটি এবার তৈরি হতে পারে বলে সতর্ক করেছে জাতিসংঘের বিশ্ব আবহাওয়া সংস্থা (ডব্লিউএমও)। সংস্থাটি বলছে, এর প্রভাবে বিশ্বের বিভিন্ন অঞ্চলে তাপমাত্রা, বৃষ্টিপাত ও চরম আবহাওয়ার পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ হয়ে উঠতে পারে। ডব্লিউএমও জানিয়েছে, প্রশান্ত মহাসাগরে স্বাভাবিকের চেয়ে বেশি উষ্ণ পানির কারণে এল নিনো ইতোমধ্যে শক্তিশালী হয়েছে। […]
ছবি: সংগৃহীত
গত চার দশকের পর্যবেক্ষণে দেখা সবচেয়ে শক্তিশালী এল নিনোর একটি এবার তৈরি হতে পারে বলে সতর্ক করেছে জাতিসংঘের বিশ্ব আবহাওয়া সংস্থা (ডব্লিউএমও)। সংস্থাটি বলছে, এর প্রভাবে বিশ্বের বিভিন্ন অঞ্চলে তাপমাত্রা, বৃষ্টিপাত ও চরম আবহাওয়ার পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ হয়ে উঠতে পারে।
ডব্লিউএমও জানিয়েছে, প্রশান্ত মহাসাগরে স্বাভাবিকের চেয়ে বেশি উষ্ণ পানির কারণে এল নিনো ইতোমধ্যে শক্তিশালী হয়েছে। আগামী কয়েক মাসে এটি আরও তীব্র হয়ে বছরের শেষদিকে সর্বোচ্চ পর্যায়ে পৌঁছাতে পারে। ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত এল নিনো সক্রিয় থাকার সম্ভাবনাও প্রায় ১০০ শতাংশ বলে জানিয়েছে সংস্থাটি। তবে এর জলবায়ুগত প্রভাব ২০২৭ সাল পর্যন্ত অব্যাহত থাকতে পারে।
এল নিনোর ফলে মধ্য ও পূর্ব বিষুবীয় প্রশান্ত মহাসাগরের সমুদ্রপৃষ্ঠের তাপমাত্রা বেড়ে যায়। এর প্রভাব পড়ে বায়ুপ্রবাহ, বায়ুচাপ ও বিশ্বজুড়ে বৃষ্টিপাতের স্বাভাবিক ধরনে। বিভিন্ন অঞ্চলে একই সময়ে বন্যা, খরা ও তীব্র দাবদাহের ঝুঁকি তৈরি হতে পারে।
জেনেভায় সাংবাদিকদের সঙ্গে কথা বলার সময় ডব্লিউএমওর মহাসচিব সেলেস্টে সাউলো বলেন, বর্তমান প্রবণতা অব্যাহত থাকলে এবারের এল নিনো সংস্থাটির কয়েক দশকের পর্যবেক্ষণে দেখা মাত্রার চেয়েও শক্তিশালী হতে পারে।
২০২৩-২৪ সালের শক্তিশালী এল নিনোর সময়ও বিশ্বজুড়ে তাপমাত্রা উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছিল। ২০২৪ সাল ইতিহাসের সবচেয়ে উষ্ণ বছর হিসেবে রেকর্ড হওয়ার পেছনে ওই এল নিনোর গুরুত্বপূর্ণ প্রভাব ছিল। সাউলোর আশঙ্কা, নতুন করে বৈশ্বিক তাপমাত্রার রেকর্ড ভাঙলেও তা অস্বাভাবিক হবে না।
ডব্লিউএমও বলছে, এই শক্তিশালী এল নিনো বিভিন্ন দেশের মানুষের জীবন ও অর্থনীতিতে বড় ধরনের প্রভাব ফেলতে পারে। কৃষি, স্বাস্থ্য, জ্বালানি ও পানি ব্যবস্থার মতো জলবায়ু-নির্ভর খাতগুলো সবচেয়ে বেশি ঝুঁকিতে থাকবে।
সাউলো দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা সংস্থাগুলোকে আগেভাগেই প্রস্তুতি নেওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন। তার মতে, সম্ভাব্য ক্ষয়ক্ষতি কমাতে এখন থেকেই সতর্কতামূলক ব্যবস্থা নেওয়া জরুরি।
জাতিসংঘের মহাসচিব আন্তোনিও গুতেরেসও পরিস্থিতি নিয়ে উদ্বেগ জানিয়েছেন। তিনি বলেছেন, এল নিনো ক্রমেই বড় আকার ধারণ করছে। একই সময়ে সমুদ্রের তাপমাত্রা ও বৈশ্বিক গড় তাপমাত্রা বাড়তে থাকায় বিশ্ব আরও বিপজ্জনক চরম আবহাওয়ার দিকে এগোচ্ছে।
গুতেরেসের ভাষ্য, জলবায়ু ঝুঁকি বাড়ার সঙ্গে মানুষের জীবন ও পরিবেশ রক্ষার অঙ্গীকারের মধ্যে যে প্রতিযোগিতা তৈরি হয়েছে, সেখানে বিশ্বকে অবশ্যই টিকে থাকতে হবে।
এল নিনো সাধারণত প্রতি দুই থেকে সাত বছর পরপর দেখা দেয় এবং একটি পর্ব প্রায় ৯ থেকে ১২ মাস স্থায়ী হতে পারে। এটি ‘লা নিনা’র বিপরীত একটি জলবায়ু প্রক্রিয়া। এল নিনো ও লা নিনার মধ্যবর্তী সময়ে প্রশান্ত মহাসাগরের পরিস্থিতি তুলনামূলকভাবে স্বাভাবিক থাকে।
ডব্লিউএমওর তথ্য অনুযায়ী, মে থেকে জুলাইয়ের মধ্যে মধ্য ও পূর্ব বিষুবীয় প্রশান্ত মহাসাগরে সমুদ্রপৃষ্ঠের তাপমাত্রা স্বাভাবিকের তুলনায় গড়ে ১ দশমিক ৫ ডিগ্রি সেলসিয়াস বেশি ছিল।
জুলাইয়ের শেষ থেকে আগস্টের মাঝামাঝি সময়ে সাপ্তাহিক পরিমাপেও তাপমাত্রা স্বাভাবিকের চেয়ে প্রায় ২ দশমিক ২ থেকে ২ দশমিক ৬ ডিগ্রি সেলসিয়াস বেশি পাওয়া গেছে। কয়েকটি এলাকায় জুলাই ও আগস্টের শুরুর দিকে সমুদ্রের নিচের পানির তাপমাত্রাও স্বাভাবিকের তুলনায় ৮ ডিগ্রি সেলসিয়াসের বেশি ছিল।
এ অবস্থায় সেপ্টেম্বর থেকে নভেম্বর পর্যন্ত বিশ্বের প্রায় সব স্থলভাগেই স্বাভাবিকের চেয়ে বেশি তাপমাত্রা থাকার সম্ভাবনা রয়েছে বলে পূর্বাভাস দিয়েছে ডব্লিউএমও।
এল নিনোর প্রভাব প্রশান্ত মহাসাগরের আশপাশেই সীমাবদ্ধ থাকে না। হাজার হাজার কিলোমিটার দূরের অঞ্চলেও এর কারণে বৃষ্টিপাত ও তাপমাত্রার স্বাভাবিক ধরন বদলে যেতে পারে।
বড় ধরনের এল নিনোর সময় আমাজন, ইন্দোনেশিয়া ও অস্ট্রেলিয়ার কিছু এলাকায় খরা দেখা দিতে পারে। ভারতের মৌসুমি বায়ুপ্রবাহও ব্যাহত হতে পারে। একই সঙ্গে বিশ্বের বিভিন্ন ক্রান্তীয় অঞ্চলে বৃষ্টিপাতের ধরনে বড় পরিবর্তন আসার সম্ভাবনা থাকে।
বিজ্ঞানীদের মতে, এল নিনো নিজে জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে সৃষ্টি হয় না। তবে জীবাশ্ম জ্বালানি পোড়ানোর ফলে যে বৈশ্বিক উষ্ণতা ইতোমধ্যে তৈরি হয়েছে, তার ওপর এল নিনোর অতিরিক্ত তাপ যোগ হওয়ায় চরম আবহাওয়ার ঝুঁকি আরও বেড়ে যেতে পারে।