কৃষ্ণসাগরে রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধের তীব্রতা বাড়ায় আবারও ঝুঁকিতে পড়েছে বৈশ্বিক খাদ্যশস্য সরবরাহ। এর প্রভাবে বিশ্ববাজারে খাদ্যপণ্যের দাম আরও বাড়তে পারে বলে সতর্ক করেছে জাতিসংঘের খাদ্য ও কৃষি সংস্থা (এফএও)। শুক্রবার (৪ সেপ্টেম্বর) এফএও জানায়, আগস্টে তাদের খাদ্য মূল্যসূচক ১৩৩ দশমিক ৩ পয়েন্টে উঠেছে। ২০২২ সালের নভেম্বরের পর এটিই সূচকটির সর্বোচ্চ অবস্থান। রাশিয়া ও ইউক্রেন সম্প্রতি কৃষ্ণসাগরে […]
ছবি: সংগৃহীত
কৃষ্ণসাগরে রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধের তীব্রতা বাড়ায় আবারও ঝুঁকিতে পড়েছে বৈশ্বিক খাদ্যশস্য সরবরাহ। এর প্রভাবে বিশ্ববাজারে খাদ্যপণ্যের দাম আরও বাড়তে পারে বলে সতর্ক করেছে জাতিসংঘের খাদ্য ও কৃষি সংস্থা (এফএও)।
শুক্রবার (৪ সেপ্টেম্বর) এফএও জানায়, আগস্টে তাদের খাদ্য মূল্যসূচক ১৩৩ দশমিক ৩ পয়েন্টে উঠেছে। ২০২২ সালের নভেম্বরের পর এটিই সূচকটির সর্বোচ্চ অবস্থান।
রাশিয়া ও ইউক্রেন সম্প্রতি কৃষ্ণসাগরে একে অপরের বাণিজ্যিক জাহাজ ও গুরুত্বপূর্ণ বন্দর অবকাঠামো লক্ষ্য করে হামলা জোরদার করেছে। এতে আন্তর্জাতিক বাণিজ্যপথের নিরাপত্তা নিয়ে নতুন করে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে।
দ্য গার্ডিয়ানের এক প্রতিবেদনের তথ্য অনুযায়ী, জুলাইয়ে কৃষ্ণসাগরে হামলায় ৩৫টি জাহাজ আক্রান্ত হয় এবং ২৩ জন নাবিক নিহত হন। যুদ্ধ শুরুর পর এক মাসে এটিই ওই অঞ্চলে নাবিক নিহতের সর্বোচ্চ সংখ্যা বলে উল্লেখ করা হয়েছে।
ইরানকে ঘিরে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে চলমান উত্তেজনার পাশাপাশি হরমুজ প্রণালি, লোহিত সাগর ও এডেন উপসাগরেও জাহাজ চলাচল ঝুঁকিতে পড়েছে। ফলে বিশ্বব্যাপী নিরাপদ সমুদ্রপথ নিয়ে উদ্বেগ আরও বাড়ছে।
২০২২ সালে রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধ শুরুর পর কৃষ্ণসাগর দিয়ে ইউক্রেনের শস্য রপ্তানি মারাত্মকভাবে ব্যাহত হয়েছিল। সাম্প্রতিক সময়ে আবারও ওদেসা ও চর্নোমর্স্কসহ ইউক্রেনের গুরুত্বপূর্ণ শস্য রপ্তানি বন্দরগুলোতে হামলা হয়েছে।
এর পাশাপাশি ইউক্রেনও রুশ জাহাজ ও বন্দর স্থাপনায় ড্রোন হামলা চালাচ্ছে। কিয়েভের দাবি, হামলার শিকার কিছু ট্যাংকার রাশিয়ার ‘ছায়া নৌবহরের’ অংশ, যেগুলোর মাধ্যমে আন্তর্জাতিক নিষেধাজ্ঞা এড়িয়ে তেল রপ্তানি করা হয়।
কৃষ্ণসাগরীয় রুশ বন্দর নভোরোসিস্কেও ইউক্রেনের হামলা হয়েছে। তেল ও শস্য রপ্তানির ক্ষেত্রে বন্দরটি রাশিয়ার জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
অস্থিতিশীলতার কারণে রাশিয়া ও ইউক্রেন—দুই দেশই সমুদ্রপথে শস্য রপ্তানিতে সমস্যায় পড়ছে। অক্সফোর্ড ইকোনমিকসের তথ্য অনুযায়ী, রাশিয়ার সমুদ্রপথে শস্য রপ্তানির ৭০ শতাংশের বেশি কৃষ্ণসাগরীয় বন্দর দিয়ে হয়ে থাকে। আরও প্রায় ২০ শতাংশ যায় আজভ সাগর দিয়ে।
সংস্থাটির উদীয়মান বাজারবিষয়ক প্রধান অর্থনীতিবিদ তাতিয়ানা অরলোভা জানিয়েছেন, আগস্টে রাশিয়ার শস্য রপ্তানি স্বাভাবিক সক্ষমতার মাত্র ৪০ শতাংশে নেমে এসেছে।
ইউক্রেন চলতি বছর তুলনামূলক ভালো শস্য উৎপাদন করলেও কৃষ্ণসাগরের বন্দর দিয়ে পর্যাপ্ত পরিমাণে রপ্তানি করতে পারছে না। দেশটির খাদ্যমন্ত্রীর সাম্প্রতিক বক্তব্য অনুযায়ী, সমুদ্র, রেল, নদী ও সড়কপথ মিলিয়ে সম্ভাব্য রপ্তানির মাত্র এক-তৃতীয়াংশ করতে পেরেছে ইউক্রেন।
সম্প্রতি আন্তর্জাতিক বাজারে গমের দামও বেড়েছে। যদিও ২০২২ সালে যুদ্ধ শুরুর সময়ের তুলনায় দাম এখনো কম রয়েছে।
বিশ্লেষকদের আশঙ্কা, সমুদ্রপথে শস্য পরিবহনে দীর্ঘস্থায়ী বাধা তৈরি হলে গম, যব ও ভুট্টার মতো প্রধান খাদ্যশস্যের সরবরাহ কমে গিয়ে দাম আরও বাড়তে পারে। বিশেষ করে খাদ্যশস্য আমদানিনির্ভর দেশগুলোতে এর প্রভাব বেশি পড়তে পারে।
অক্সফোর্ড ইকোনমিকসের পূর্বাভাস অনুযায়ী, চলতি বছর বিশ্ববাজারে খাদ্যের দাম প্রায় ১২ শতাংশ বাড়তে পারে। ২০২৭ সালে আরও ৪ দশমিক ৮ শতাংশ বৃদ্ধির সম্ভাবনা রয়েছে।
তবে এবার ২০২২ সালের মতো ভয়াবহ পরিস্থিতি নাও তৈরি হতে পারে বলে মনে করছেন কিছু বিশ্লেষক। তাতিয়ানা অরলোভার মতে, যুদ্ধ শুরুর সময় অনেক বড় খাদ্য আমদানিকারক দেশ প্রস্তুত ছিল না। বর্তমানে অনেক দেশই আগাম শস্য মজুত করে রেখেছে, ফলে সরবরাহে ধাক্কা এলে তা মোকাবিলার সক্ষমতা তুলনামূলকভাবে বেড়েছে।
তবে তিনি মনে করেন, খাদ্যপণ্যের দামে প্রভাব পড়বে—এ বিষয়ে খুব বেশি সন্দেহ নেই।
এর সঙ্গে ইরান যুদ্ধ, ইউরোপের তীব্র গরমে শস্য উৎপাদন কমে যাওয়ার আশঙ্কা এবং এল নিনোর মতো আবহাওয়াজনিত প্রভাব যুক্ত হলে বিশ্ব খাদ্যবাজারে চাপ আরও বাড়তে পারে।
ফলে আগামী কয়েক মাসে যুদ্ধ ও সমুদ্রপথের নিরাপত্তা পরিস্থিতি কীভাবে বদলায়, তার ওপরই অনেকটাই নির্ভর করবে বিশ্ববাজারে খাদ্যপণ্যের দাম কোন দিকে যায়।