বাংলাদেশে হাম পরিস্থিতি নিয়ে উদ্বেগ কাটছে না। চলতি বছর হাম ও হামের উপসর্গ নিয়ে মৃত্যুর সংখ্যা ১ হাজার ছাড়িয়েছে। স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, ১০ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত হামের উপসর্গ নিয়ে ৯০৯ জন এবং নিশ্চিত হামে ১০০ জনের মৃত্যু হয়েছে। সব মিলিয়ে মৃত্যুর সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ১ হাজার ৯। স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের হিসাবে, গত ২৪ ঘণ্টায় হামের উপসর্গ নিয়ে […]
ছবি: সংগৃহীত
বাংলাদেশে হাম পরিস্থিতি নিয়ে উদ্বেগ কাটছে না। চলতি বছর হাম ও হামের উপসর্গ নিয়ে মৃত্যুর সংখ্যা ১ হাজার ছাড়িয়েছে। স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, ১০ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত হামের উপসর্গ নিয়ে ৯০৯ জন এবং নিশ্চিত হামে ১০০ জনের মৃত্যু হয়েছে। সব মিলিয়ে মৃত্যুর সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ১ হাজার ৯।
স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের হিসাবে, গত ২৪ ঘণ্টায় হামের উপসর্গ নিয়ে আরও সাতজনের মৃত্যু হয়েছে। একই সময়ে নতুন করে ১ হাজার ১৬৫ জনের শরীরে হামের উপসর্গ দেখা গেছে। ১৫ মার্চ থেকে এ পর্যন্ত হামের উপসর্গ পাওয়া রোগীর সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ১ লাখ ৬৮ হাজার ৭৪৫। নিশ্চিতভাবে হাম শনাক্ত হয়েছে ১৯ হাজার ৯৩৩ জনের শরীরে।
এই সময়ে হামের উপসর্গ নিয়ে হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন ১ লাখ ৪৮ হাজার ৫০৫ জন। এর মধ্যে সুস্থ হয়ে হাসপাতাল ছেড়েছেন ১ লাখ ৪২ হাজার ৮৮৮ জন।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, বাংলাদেশে হামের এমন ব্যাপক সংক্রমণ ও মৃত্যুর ঘটনা নজিরবিহীন। শিশুদের মধ্যেই সংক্রমণ ও গুরুতর অসুস্থতার ঝুঁকি বেশি। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার তথ্য অনুযায়ী, চলতি বছরের এপ্রিলের মাঝামাঝি সময় পর্যন্ত দেশের ৬৪ জেলার মধ্যে ৫৮টিতে হামের বিস্তার পাওয়া গিয়েছিল এবং আক্রান্তদের বড় অংশই ছিল পাঁচ বছরের কম বয়সী শিশু।
জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ ডা. মুশতাক হোসেনের মতে, হাম প্রতিরোধে ৬ মাস থেকে ১৫ বছর বয়সী অন্তত ৯৫ শতাংশ মানুষকে টিকার আওতায় আনা জরুরি। বর্তমানে ছোট শিশুদের কেন্দ্র করে যে টিকাদান কার্যক্রম চলছে, সেটির পরিধি আরও বাড়ানো প্রয়োজন বলে মনে করেন তিনি।
তাঁর মতে, অনেক শিশুর অপুষ্টি ও অন্যান্য স্বাস্থ্য সমস্যার কারণে রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা দুর্বল থাকে। ফলে তারা হাম আক্রান্ত হলে জটিলতা ও মৃত্যুর ঝুঁকিতে পড়ে।
তবে শুধু টিকা দিলেই তাৎক্ষণিকভাবে মৃত্যু বন্ধ হবে না বলেও সতর্ক করেছেন এই বিশেষজ্ঞ। টিকা দেওয়ার পাশাপাশি রোগীকে দ্রুত শনাক্ত করে প্রাথমিক ও মাধ্যমিক স্বাস্থ্যসেবার আওতায় আনা জরুরি। রোগীকে গুরুতর অবস্থায় আইসিইউতে নেওয়ার অপেক্ষা করলে মৃত্যুর ঝুঁকি কমানো কঠিন হয়ে পড়ে।
তিনি বলেন, জ্বর ও উপসর্গ দেখা দেওয়ার শুরু থেকেই রোগীকে চিকিৎসার আওতায় আনতে হবে। উপজেলা ও জেলা পর্যায়ে চিকিৎসা ও পর্যবেক্ষণ জোরদার করা গেলে গুরুতর অবস্থায় পৌঁছানো রোগীর সংখ্যা কমানো সম্ভব।
হামের সংক্রমণ মোকাবিলায় আগামী ২৫ সেপ্টেম্বর থেকে নতুন করে বিশেষ টিকাদান কর্মসূচি শুরু করার কথা জানিয়েছেন স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণমন্ত্রী সরদার মো. সাখাওয়াত হোসেন।
স্বাস্থ্যমন্ত্রী জানিয়েছেন, প্রয়োজনীয় টিকার বড় অংশ ইতোমধ্যে ইউনিসেফের মাধ্যমে দেশে পৌঁছেছে। বাকি টিকাও ১৭ সেপ্টেম্বরের মধ্যে দেশে আসার কথা রয়েছে।
স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, প্রান্তিক পর্যায়ের হাসপাতালগুলোতেও চিকিৎসা সক্ষমতা বাড়ানোর উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। বিভিন্ন হাসপাতালে আইসোলেশন বেড প্রস্তুত রাখার পাশাপাশি মোবাইল হাসপাতালের ব্যবস্থাও করা হয়েছে।
উপজেলা পর্যায়েই প্রয়োজনীয় চিকিৎসা নিশ্চিত করার ওপর জোর দেওয়া হচ্ছে, যাতে গুরুতর রোগীর চাপ বড় হাসপাতালগুলোর ওপর অতিরিক্তভাবে না পড়ে।
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা জানিয়েছে, বাংলাদেশে সাম্প্রতিক হাম পরিস্থিতির পেছনে টিকাদানের ঘাটতি ও নিয়মিত টিকাদান কার্যক্রমে ছন্দপতনের ভূমিকা রয়েছে। ২০২৪-২৫ সময়ে হাম-রুবেলা টিকার সরবরাহ ঘাটতি এবং নিয়মিত টিকাদানে ফাঁক তৈরি হওয়ায় ঝুঁকিপূর্ণ শিশুদের সংখ্যা বেড়েছে বলে সংস্থাটি উল্লেখ করেছে।
এখন টিকাদানের পরিধি বাড়ানোর পাশাপাশি আক্রান্তদের দ্রুত শনাক্ত করা, হাসপাতালে সময়মতো চিকিৎসা নিশ্চিত করা এবং শিশুদের পুষ্টি ও রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতার দিকে নজর দেওয়াকেই বড় চ্যালেঞ্জ হিসেবে দেখা হচ্ছে।
হামের সংক্রমণ নিয়ন্ত্রণে আনা সম্ভব হলেও এর জন্য ব্যাপক টিকাদান, দ্রুত চিকিৎসা এবং মাঠপর্যায়ে কার্যকর নজরদারি একসঙ্গে নিশ্চিত করতে হবে বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা।