বাংলাদেশে হামে মৃত্যুর সংখ্যা ১ হাজার ১০০ ছাড়িয়েছে। সর্বশেষ ২৪ ঘণ্টায় আরও পাঁচজনের মৃত্যু হওয়ায় মোট মৃতের সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ১ হাজার ১০৪। জনস্বাস্থ্যবিদেরা বলছেন, টিকাদানে ঘাটতি, চিকিৎসায় অবহেলা ও গণটিকাদান কর্মসূচিতে বিপুলসংখ্যক শিশু বাদ পড়ার মতো বিষয়গুলো খতিয়ে দেখে দায়ীদের চিহ্নিত করা জরুরি। সর্বশেষ মৃত্যুর ঘটনাগুলোর মধ্যে বান্দরবানের রুমা উপজেলার একটি পরিবারের দুই শিশুও রয়েছে। […]
ছবি: সংগৃহীত
বাংলাদেশে হামে মৃত্যুর সংখ্যা ১ হাজার ১০০ ছাড়িয়েছে। সর্বশেষ ২৪ ঘণ্টায় আরও পাঁচজনের মৃত্যু হওয়ায় মোট মৃতের সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ১ হাজার ১০৪। জনস্বাস্থ্যবিদেরা বলছেন, টিকাদানে ঘাটতি, চিকিৎসায় অবহেলা ও গণটিকাদান কর্মসূচিতে বিপুলসংখ্যক শিশু বাদ পড়ার মতো বিষয়গুলো খতিয়ে দেখে দায়ীদের চিহ্নিত করা জরুরি।
সর্বশেষ মৃত্যুর ঘটনাগুলোর মধ্যে বান্দরবানের রুমা উপজেলার একটি পরিবারের দুই শিশুও রয়েছে। খুমি জাতিগোষ্ঠীর তৈসাং ও নাংয়ো খুমি দম্পতির চার সন্তান ছিল। তাদের সাত বছর বয়সী ছেলে খ্রেতং খুমি ২৫ জুলাই এবং চার বছর বয়সী ছেলে প্রেলং খুমি ২৭ জুলাই হামের উপসর্গ নিয়ে মারা যায়। পরে আক্রান্ত আরও দুই সন্তানকে নিয়ে তারা বান্দরবান জেলা সদর হাসপাতালে ভর্তি হন। ১১ বছর বয়সী পথাং এউং ও সাত মাস বয়সী লিংথং এ খুমি সেখানে চিকিৎসাধীন রয়েছে।
হামে আক্রান্ত হয়ে মারা যাওয়া শিশুদের মধ্যে ফারজানা ইসলাম-হেলাল ভূঁইয়া দম্পতির ছেলে ফাইয়াজ হাসান তাজিমও ছিল। দীর্ঘ ১১ বছর পর আইভিএফ পদ্ধতিতে জন্ম নেওয়া আট মাস ১৮ দিনের শিশুটির মৃত্যু হয় গত ২২ এপ্রিল। তার জন্মদিন ছিল ৪ আগস্ট।
চিকিৎসক, জনস্বাস্থ্যবিদ ও গবেষকেরা বলছেন, বাংলাদেশে এর আগে হামে এত মৃত্যু ও সংক্রমণের ঘটনা ঘটেনি। বিশেষ করে গণটিকাদান কর্মসূচির পরও এত ব্যাপক সংক্রমণকে বিরল ঘটনা হিসেবে দেখছেন তারা।
জনস্বাস্থ্যবিদ ডা. মুশতাক হোসেন এটিকে রাষ্ট্রীয় অবহেলার চূড়ান্ত বহিঃপ্রকাশ হিসেবে উল্লেখ করে দায়ীদের চিহ্নিত করে বিচারের মুখোমুখি করার দাবি জানিয়েছেন। তার মতে, অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে টিকাদানে অবহেলা হয়েছে এবং বর্তমান সরকারের সময়ে চিকিৎসা ও টিকাদান—দুই ক্ষেত্রেই ঘাটতি ছিল।
আরেক জনস্বাস্থ্যবিদ বে-নজির আহমেদ মনে করেন, হাম প্রতিরোধে সরকার কার্যত ব্যর্থ হয়েছে। পরিস্থিতির দায় নিয়ে স্বাস্থ্যমন্ত্রীর পদত্যাগের বিষয়টি বিবেচনা করা উচিত বলেও মত দিয়েছেন তিনি।
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার (ডব্লিউএইচও) তথ্য অনুযায়ী, গত বছরের ডিসেম্বর থেকে চলতি বছরের মে পর্যন্ত ছয় মাসে বাংলাদেশে হাম বা হামের উপসর্গ নিয়ে ৪২ হাজার ১৭৪ জন রোগী শনাক্ত হয়েছে। ওই সময়ে বিশ্বের কোনো দেশেই বাংলাদেশের চেয়ে বেশি রোগী শনাক্ত হয়নি।
এই তালিকায় দ্বিতীয় অবস্থানে ছিল ভারত, যেখানে একই সময়ে ২৬ হাজার ৬০৭ জনের হামের উপসর্গ পাওয়া যায়। তৃতীয় অবস্থানে থাকা ইয়েমেনে রোগীর সংখ্যা ছিল ১৪ হাজার ৫২১। এরপর মেক্সিকোতে ১২ হাজার ৪৯৫, পাকিস্তানে ১১ হাজার ৩৭, ক্যামেরুনে ৯ হাজার ৬৫৩, কাজাখস্তানে ৭ হাজার ৭৩০, গুয়াতেমালায় ৬ হাজার ৮৩২, অ্যাঙ্গোলায় ৬ হাজার ৮১৫ এবং সুদানে ৫ হাজার ৭৬৬ জনের হামের উপসর্গ শনাক্ত হয়।
জুলাইয়ের পরও দেশে সংক্রমণ কমেনি। স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের সর্বশেষ হিসাবে, এখন পর্যন্ত হামের উপসর্গে আক্রান্ত হয়েছেন ১ লাখ ৯০ হাজার ৫১০ জন। আর হাম রোগী শনাক্ত হয়েছে ২১ হাজার ৩৯২ জন। সব মিলিয়ে আক্রান্তের সংখ্যা ২ লাখ ১১ হাজার ৯০২।
অন্যদিকে ২০২৫ সালে দেশে হাম রোগী ছিল ১৩২ জন। ২০২৪ সালে ২৪৭, ২০২৩ সালে ২৮২ এবং ২০২২ সালে ৩১১ জন রোগী শনাক্ত হয়েছিল।
বিশিষ্ট জনস্বাস্থ্যবিদ ও সরকারের রোগতত্ত্ব, রোগনিয়ন্ত্রণ ও গবেষণা ইনস্টিটিউটের সাবেক প্রধান মাহমুদুর রহমান বলেন, বাংলাদেশের ইতিহাসে এত বেশি হামের সংক্রমণের রেকর্ড নেই।
একসময় নিয়মিত টিকাদান ও জাতীয় পর্যায়ের বিভিন্ন কর্মসূচির কারণে হাম নিয়ন্ত্রণে বাংলাদেশের সাফল্য আন্তর্জাতিকভাবে প্রশংসিত হয়েছিল। কিন্তু সাম্প্রতিক বছরগুলোতে নিয়মিত টিকাদানের হার কমে যাওয়াকে বর্তমান সংকটের অন্যতম কারণ হিসেবে দেখছেন বিশেষজ্ঞরা।
২০১০ সালের ফলোআপ ক্যাম্পেইনে ৯ মাস থেকে ৫ বছর বয়সী ১ কোটি ৮১ লাখ শিশুকে টিকা দেওয়ার লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছিল এবং শতভাগ কাভারেজ অর্জিত হয়। ২০১৪ সালে ৯ মাস থেকে ১৫ বছর বয়সী ৫ কোটি ২৭ লাখ শিশুকে হাম-রুবেলার টিকা দেওয়ার লক্ষ্য নির্ধারণ করা হলেও তখনও কাভারেজ ১০০ শতাংশের বেশি ছিল।
তবে ২০২০-২১ সালের পর বিশেষ ক্যাম্পেইন আর হয়নি। এর মধ্যে নিয়মিত টিকাদানের হারও কমতে থাকে। ২০২৫ সালে এই হার ৫৯ শতাংশে নেমে আসে। দেশের বিভিন্ন এলাকায় টিকার স্বল্পতার কথাও সামনে আসে।
ইউনিসেফের বাংলাদেশে ভারপ্রাপ্ত প্রতিনিধি স্ট্যানলি গুয়াভুইয়া জানিয়েছিলেন, ২০২৫ সালে তৎকালীন অন্তর্বর্তী সরকার টিকা সংগ্রহের প্রচলিত পদ্ধতি পরিবর্তনের সিদ্ধান্ত নেওয়ার পর ইউনিসেফ একাধিকবার উদ্বেগ জানিয়েছিল। তাদের আশঙ্কা ছিল, এতে টিকা সরবরাহে বিলম্ব হয়ে রোগের প্রাদুর্ভাব তৈরি হতে পারে।
হামের সংক্রমণ বেড়ে যাওয়ার পর চলতি বছরের এপ্রিলের মাঝামাঝি বর্তমান সরকার ৬ মাস থেকে ৫ বছর বয়সী শিশুদের জন্য বিশেষ টিকাদান কর্মসূচি শুরু করে। তবে এই কর্মসূচিতেও প্রায় ৪৬ লাখ শিশু বাদ পড়ে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
হামের টিকার জন্য এই বয়সী ১ কোটি ৮০ লাখ ১৫ হাজার ৬৪ শিশুর হিসাব করা হলেও গত জুনে ভিটামিন ‘এ’ ক্যাম্পেইনে একই বয়সী প্রায় ২ কোটি ২৬ লাখ শিশুকে অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছিল। ফলে বিপুলসংখ্যক শিশু হামের টিকার বাইরে থেকে যায় বলে জনস্বাস্থ্যবিদেরা উদ্বেগ জানান।
গণটিকাদানের চার মাস পরও সংক্রমণ ও মৃত্যু কমেনি। জনস্বাস্থ্যবিদ মুশতাক হোসেন বলেন, গণটিকা দেওয়ার পরও এত মৃত্যু ও সংক্রমণের ঘটনা অত্যন্ত বিরল।
হামের ব্যাপক সংক্রমণ ও মৃত্যুর কারণ অনুসন্ধানের দাবি জানিয়েছেন জনস্বাস্থ্যবিদেরা। তাদের মতে, রোগটি নিয়ন্ত্রণে ব্যর্থতার পেছনে কী ধরনের প্রশাসনিক ও ব্যবস্থাপনাগত ঘাটতি ছিল, তা নিরপেক্ষভাবে খতিয়ে দেখা প্রয়োজন।
বে-নজির আহমেদ বলেন, হামের পরিস্থিতির নেপথ্যের কারণ অনুসন্ধানের কথা সরকারের পক্ষ থেকে বলা হলেও এখন পর্যন্ত কার্যকর তদন্তের উদ্যোগ দেখা যায়নি। তার মতে, এ ধরনের তদন্ত হলে ভবিষ্যতে একই ধরনের পরিস্থিতি মোকাবিলায় প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নির্ধারণ করা সম্ভব হবে।
তিনি বলেন, হামের বর্তমান পরিস্থিতির নেপথ্যের কারণ বিশ্লেষণের পাশাপাশি দায়ীদের চিহ্নিত করাও জরুরি।