১৯৪৭ সালের ১৫ জানুয়ারি। লস অ্যাঞ্জেলেসের সকাল ছিল কুয়াশাচ্ছন্ন। ছোট সন্তানকে নিয়ে হাঁটতে বেরিয়েছিলেন এক মা। হঠাৎ রাস্তার পাশের ঘাসের দিকে চোখ পড়তেই তিনি থমকে যান। কয়েক ফুট দূরে পড়ে ছিল এক তরুণীর নগ্ন দেহ। প্রথম দেখায় দৃশ্যটি এতটাই অবাস্তব মনে হয়েছিল যে, তিনি সেটিকে কোনো পোশাকের দোকানের ম্যানিকুইন বলে ভেবেছিলেন। কিন্তু একটু কাছে যেতেই […]
ছবি: সংগৃহীত
১৯৪৭ সালের ১৫ জানুয়ারি। লস অ্যাঞ্জেলেসের সকাল ছিল কুয়াশাচ্ছন্ন। ছোট সন্তানকে নিয়ে হাঁটতে বেরিয়েছিলেন এক মা। হঠাৎ রাস্তার পাশের ঘাসের দিকে চোখ পড়তেই তিনি থমকে যান। কয়েক ফুট দূরে পড়ে ছিল এক তরুণীর নগ্ন দেহ।
প্রথম দেখায় দৃশ্যটি এতটাই অবাস্তব মনে হয়েছিল যে, তিনি সেটিকে কোনো পোশাকের দোকানের ম্যানিকুইন বলে ভেবেছিলেন। কিন্তু একটু কাছে যেতেই ভয়াবহ সত্যটি স্পষ্ট হয়ে ওঠে। সেটি কোনো পুতুল নয়, একজন মানুষ। নির্মমভাবে হত্যার শিকার হয়েছেন তরুণীটি।
আরও ভয়ংকর ছিল মরদেহের অবস্থা। তরুণীর শরীর কোমর থেকে নিখুঁতভাবে দুই খণ্ড করা হয়েছিল। শরীরজুড়ে ছিল আঘাত ও কাটার চিহ্ন। অথচ ঘটনাস্থলে প্রায় এক ফোঁটা রক্তও পাওয়া যায়নি।
সেখান থেকেই শুরু হয় যুক্তরাষ্ট্রের ইতিহাসের অন্যতম আলোচিত অমীমাংসিত হত্যাকাণ্ডের তদন্ত। নিহত তরুণীর নাম এলিজাবেথ শর্ট। পরবর্তী সময়ে সংবাদমাধ্যম তাকে ‘ব্ল্যাক ডালিয়া’ নামে পরিচিত করে তোলে।
লস অ্যাঞ্জেলেস পুলিশ বিভাগ বা এলএপিডি তদন্ত শুরু করার পর দ্রুতই ফেডারেল ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশন বা এফবিআইয়ের সহায়তা নেয়।
ঘটনাস্থল থেকে তদন্তকারীরা নিহত তরুণীর আঙুলের ছাপ সংগ্রহ করতে সক্ষম হন। সেই সময়ের একটি প্রাথমিক যোগাযোগপ্রযুক্তি ‘সাউন্ডফটো’র মাধ্যমে ছাপের তথ্য এফবিআইয়ের কাছে পাঠানো হয়।
এরপর ঘটে তদন্তের একটি গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা।
ছাপ পাওয়ার মাত্র ৫৬ মিনিটের মধ্যে এফবিআই নিহত তরুণীর পরিচয় শনাক্ত করে। তিনি ২২ বছর বয়সী এলিজাবেথ শর্ট। হলিউডে অভিনেত্রী হওয়ার স্বপ্ন নিয়ে লস অ্যাঞ্জেলেসে এসেছিলেন তিনি।
কালো পোশাকের প্রতি তার আগ্রহ এবং সে সময় প্রেক্ষাগৃহে চলা ‘দ্য ব্লু ডালিয়া’ চলচ্চিত্রের নামের সঙ্গে মিলিয়ে সংবাদমাধ্যম পরে তাকে ‘ব্ল্যাক ডালিয়া’ নামে অভিহিত করে। নামটি দ্রুতই মানুষের মধ্যে পরিচিত হয়ে ওঠে।
কিন্তু পরিচয় শনাক্ত হওয়ার পরই তদন্তের সামনে আরও বড় প্রশ্ন দাঁড়ায়—এলিজাবেথ শর্টকে কে হত্যা করেছিল এবং কেন?
নিহত তরুণীর পরিচয় দ্রুত শনাক্ত করতে পারার পেছনে এফবিআইয়ের বিশাল আঙুলের ছাপের নথি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। সংস্থাটির সংরক্ষিত কোটি কোটি আঙুলের ছাপের মধ্যে এলিজাবেথ শর্টের ছাপ আগেই ছিল।
১৯৪৩ সালের জানুয়ারিতে ক্যালিফোর্নিয়ার ক্যাম্প কুকের একটি কমিসারিতে কেরানি পদে আবেদন করার সময় তার আঙুলের ছাপ নেওয়া হয়েছিল। একই বছরের কয়েক মাস পর আবারও তার ছাপ এফবিআইয়ের নথিতে যুক্ত হয়।
এর মধ্যে সান্তা বারবারা পুলিশ তাকে অপ্রাপ্তবয়স্ক অবস্থায় মদ্যপানের অভিযোগে আটকও করেছিল। সেই সময় তার মগ শট বা পুলিশি ছবি তোলা হয়। পরে সেই ছবিও সংবাদমাধ্যমে প্রকাশিত হয়েছিল।
ফলে হত্যাকাণ্ডের পর অল্প সময়ের মধ্যেই তদন্তকারীরা জানতে পারেন, রহস্যময় ওই তরুণী আসলে কে ছিলেন এবং তার অতীতের কিছু তথ্যও তাদের হাতে ছিল।
তবে পরিচয় জানা গেলেও হত্যাকারীর পরিচয় বের করা সম্ভব হয়নি।
হত্যাকাণ্ডের নির্মম ধরন তদন্তকারীদের নতুন একটি ধারণার দিকে নিয়ে যায়। শরীরকে যেভাবে নিখুঁতভাবে দুই খণ্ড করা হয়েছিল, তা দেখে তদন্তকারীদের মনে হয়, হত্যাকারী হয়তো শারীরিক গঠন ও দেহব্যবচ্ছেদ সম্পর্কে বিশেষ জ্ঞান রাখত।
সেই সূত্র ধরে তদন্তের আওতায় আসে ইউনিভার্সিটি অব সাদার্ন ক্যালিফোর্নিয়ার মেডিক্যাল স্কুলের একদল শিক্ষার্থী। তদন্তকারীরা সম্ভাব্য সন্দেহভাজনদের তালিকা তৈরি করে দেশজুড়ে তথ্য যাচাই ও জিজ্ঞাসাবাদ শুরু করেন।
কিন্তু কোনো তদন্তই শেষ পর্যন্ত হত্যাকারীর দিকে নিশ্চিতভাবে পৌঁছাতে পারেনি।
তদন্ত যখন ধীরে ধীরে অনিশ্চয়তার দিকে এগোচ্ছিল, তখন কর্তৃপক্ষের কাছে আসে একটি বেনামী চিঠি। তদন্তকারীদের ধারণা ছিল, চিঠিটি হয়তো হত্যাকারী নিজেই পাঠিয়েছে।
চিঠির সঙ্গে পাওয়া যায় একটি আঙুলের ছাপ।
এটি তদন্তকারীদের মধ্যে নতুন আশার সৃষ্টি করে। এতদিন পর হয়তো পাওয়া গেছে হত্যাকারীর পরিচয় শনাক্ত করার মতো গুরুত্বপূর্ণ সূত্র।
এফবিআইয়ের বিশাল নথির সঙ্গে সেই আঙুলের ছাপ মিলিয়ে দেখা হয়। কিন্তু ফলাফল আসে হতাশাজনক। সংস্থাটির সংরক্ষিত বিপুল সংখ্যক আঙুলের ছাপের সঙ্গে মিলিয়েও ওই ছাপের মালিককে শনাক্ত করা যায়নি।
এরপর কেটে যায় বছরের পর বছর। তদন্ত এগোয়, সম্ভাব্য সন্দেহভাজনদের নিয়ে নানা তত্ত্ব সামনে আসে, কিন্তু এলিজাবেথ শর্টের হত্যাকাণ্ডের নিশ্চিত সমাধান আর পাওয়া যায়নি।
এলিজাবেথ শর্টের মৃত্যুর পর কয়েক দশক পেরিয়ে গেছে। কিন্তু ‘ব্ল্যাক ডালিয়া’ হত্যাকাণ্ডের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন দুটি আজও উত্তরহীন—কে তাকে হত্যা করেছিল এবং হত্যার পেছনে উদ্দেশ্যই বা কী ছিল?
সময় যত গড়িয়েছে, হত্যাকাণ্ডটি শুধু একটি পুরোনো অপরাধের তদন্ত হিসেবে সীমাবদ্ধ থাকেনি। বরং এটি যুক্তরাষ্ট্রের অন্যতম আলোচিত অমীমাংসিত হত্যার ঘটনায় পরিণত হয়েছে।
তদন্তে পাওয়া সূত্র, সন্দেহভাজনদের তালিকা, বেনামী চিঠি এবং হত্যাকাণ্ডের অস্বাভাবিক ধরন নিয়ে বছরের পর বছর ধরে নানা আলোচনা হয়েছে। কিন্তু কোনো ব্যক্তিকে নিশ্চিতভাবে হত্যাকারী হিসেবে শনাক্ত করা সম্ভব হয়নি।
এলিজাবেথ শর্ট হলিউডে অভিনেত্রী হওয়ার স্বপ্ন নিয়ে লস অ্যাঞ্জেলেসে এসেছিলেন। কিন্তু তার সেই স্বপ্নের পরিণতি হয়েছিল এক নির্মম হত্যাকাণ্ডে। আর ১৯৪৭ সালের সেই কুয়াশাচ্ছন্ন সকালের পর প্রায় আট দশক পেরিয়ে গেলেও ‘ব্ল্যাক ডালিয়া’ রহস্যের চূড়ান্ত উত্তর এখনো অধরা।
সূত্র: এফবিআই