যুক্তরাষ্ট্রের টেনেসি অঙ্গরাজ্যে ক্রিস্টা পাইকের মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের চেষ্টা ব্যর্থ হওয়ার এক সপ্তাহ পর টেক্সাসে আরেক মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত বন্দির প্রাণঘাতী ইনজেকশনে মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করা হয়েছে। ৪৬ বছর বয়সী জামাল হাওয়ার্ডকে বুধবার রাতে টেক্সাসের হান্টসভিল স্টেট কারাগারে পেন্টোবার্বিটাল নামের ওষুধ প্রয়োগের মাধ্যমে মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হয়। ২০২৬ সালে যুক্তরাষ্ট্রে কার্যকর হওয়া এটি ৩০তম মৃত্যুদণ্ড এবং ক্রিস্টা পাইকের ঘটনায় ব্যর্থতার […]
ছবি: সংগৃহীত
যুক্তরাষ্ট্রের টেনেসি অঙ্গরাজ্যে ক্রিস্টা পাইকের মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের চেষ্টা ব্যর্থ হওয়ার এক সপ্তাহ পর টেক্সাসে আরেক মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত বন্দির প্রাণঘাতী ইনজেকশনে মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করা হয়েছে। ৪৬ বছর বয়সী জামাল হাওয়ার্ডকে বুধবার রাতে টেক্সাসের হান্টসভিল স্টেট কারাগারে পেন্টোবার্বিটাল নামের ওষুধ প্রয়োগের মাধ্যমে মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হয়। ২০২৬ সালে যুক্তরাষ্ট্রে কার্যকর হওয়া এটি ৩০তম মৃত্যুদণ্ড এবং ক্রিস্টা পাইকের ঘটনায় ব্যর্থতার পর দেশটিতে প্রথম মৃত্যুদণ্ড কার্যকর।
২০০০ সালে টেক্সাসের সিলসবি শহরে একটি দোকানে ডাকাতির সময় ৪২ বছর বয়সী কর্মী ভিকি সোয়ারআউটকে গুলি করে হত্যার দায়ে হাওয়ার্ডকে মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হয়েছিল। মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের আগে তিনি ভুক্তভোগীর পরিবারের সদস্যদের কাছে বারবার ক্ষমা চান। অন্যদিকে, তাঁর আইনজীবীরা শেষ মুহূর্ত পর্যন্ত মৃত্যুদণ্ড স্থগিত রাখার চেষ্টা করলেও আদালত তাঁদের আবেদন প্রত্যাখ্যান করে।
মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের আগে ক্ষমা চান হাওয়ার্ড
বুধবার রাতে হান্টসভিল স্টেট কারাগারে হাওয়ার্ডের মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করা হয়। মৃত্যুদণ্ডকক্ষের কয়েক ফুট দূরে পর্যবেক্ষক কক্ষে ভুক্তভোগী ভিকি সোয়ারআউটের পরিবারের সদস্যরা উপস্থিত ছিলেন। মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের আগে তাঁদের উদ্দেশে ক্ষমা প্রার্থনা করেন হাওয়ার্ড।
তিনি বলেন, সোয়ারআউটের পরিবারের সদস্যরা যেন তাঁর ক্ষমা গ্রহণ করেন। সেদিনের ঘটনার জন্য তিনি গভীরভাবে দুঃখিত এবং কোনো একদিন তাঁরা তাঁকে ক্ষমা করতে পারবেন বলে আশা করেন। নিজের পরিবার ও বন্ধুদের প্রতিও কৃতজ্ঞতা জানান তিনি। একই সঙ্গে বলেন, ঈশ্বরের সান্নিধ্যে শান্তিতে যেতে তিনি প্রস্তুত।
টেক্সাসের কারা কর্তৃপক্ষের তথ্য অনুযায়ী, স্থানীয় সময় রাত ৮টা ৩ মিনিটে হাওয়ার্ডকে মৃত ঘোষণা করা হয়।
প্রতিবেদন অনুযায়ী, পেন্টোবার্বিটাল প্রয়োগের পর হাওয়ার্ডের শ্বাস-প্রশ্বাসে অস্বাভাবিকতা দেখা দেয়। তিনি কাশতে থাকেন এবং ভারী শ্বাস নেওয়ার পর একপর্যায়ে তাঁর শরীর নিস্তেজ হয়ে পড়ে। প্রায় ১৯ মিনিট পর তাঁকে মৃত ঘোষণা করা হয়। এ সময় মৃত্যুদণ্ডকক্ষে উপস্থিত তাঁর বোন তীব্র মানসিক যন্ত্রণায় চিৎকার করে কাঁদতে শুরু করলে কারারক্ষীরা তাঁকে কক্ষ থেকে বের করে নিয়ে যান।
মাত্র ১১৪ ডলার ও এক কার্টন সিগারেটের জন্য হত্যা
২০০০ সালে টেক্সাসের হিউস্টনের কাছাকাছি সিলসবি শহরের একটি দোকানে ডাকাতি করতে গিয়ে ভিকি সোয়ারআউটকে হত্যা করেন হাওয়ার্ড। সে সময় তাঁর বয়স ছিল ২০ বছর। দোকানে কর্মরত ৪২ বছর বয়সী সোয়ারআউটকে বুকের মধ্যে গুলি করেন তিনি। এরপর নগদ ১১৪ ডলার ও এক কার্টন সিগারেট নিয়ে চলে যান।
ঘটনার পর হাওয়ার্ডকে গ্রেপ্তার করা হয়। পরে হত্যা ও ডাকাতির ঘটনায় তাঁকে দোষী সাব্যস্ত করে মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হয়।
আইনি আবেদন খারিজ, কার্যকর হয় মৃত্যুদণ্ড
মৃত্যুদণ্ড কার্যকর ঠেকাতে শেষ মুহূর্ত পর্যন্ত আইনি লড়াই চালান হাওয়ার্ডের আইনজীবীরা। তাঁদের দাবি ছিল, হাওয়ার্ডের বুদ্ধিবৃত্তিক প্রতিবন্ধকতা রয়েছে। এ ছাড়া টেক্সাসে প্রাণঘাতী ইনজেকশনে ব্যবহৃত পেন্টোবার্বিটাল ওষুধের কার্যকারিতা ও প্রয়োগপদ্ধতি নিয়েও তাঁরা উদ্বেগ প্রকাশ করেন।
বিশেষ করে টেনেসিতে ক্রিস্টা পাইকের মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের চেষ্টা ব্যর্থ হওয়ার ঘটনা তুলে ধরে হাওয়ার্ডের আইনজীবীরা যুক্তি দেন, একই ধরনের ওষুধ ব্যবহারের কারণে তাঁর ক্ষেত্রেও ঝুঁকি থাকতে পারে। তবে টেক্সাসের ফৌজদারি আপিল আদালত এবং পরে যুক্তরাষ্ট্রের সুপ্রিম কোর্ট মৃত্যুদণ্ড স্থগিত করার আবেদন প্রত্যাখ্যান করে। এরপরই মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের পথ পরিষ্কার হয়।
ক্রিস্টা পাইকের শারীরিক অবস্থা নিয়ে উদ্বেগ
এদিকে, গত ৩০ সেপ্টেম্বর টেনেসি অঙ্গরাজ্যে প্রাণঘাতী ইনজেকশন প্রয়োগের পরও বেঁচে যান ৫০ বছর বয়সী মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত বন্দি ক্রিস্টা পাইক। তাঁর মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের সময় দুই দফায় পেন্টোবার্বিটাল প্রয়োগ করা হলেও তিনি মারা যাননি। পরে তাঁকে হাসপাতালে নেওয়া হয়। এ ঘটনা যুক্তরাষ্ট্রে মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের পদ্ধতি নিয়ে নতুন করে বিতর্ক সৃষ্টি করেছে।
পাইকের আইনজীবীদের ভাষ্য অনুযায়ী, চিকিৎসকেরা প্রথমে তাঁকে মস্তিষ্কের মৃত্যু হয়েছে বলে মনে করেছিলেন। তবে ৬ অক্টোবর তিনি জ্ঞান ফিরে পান এবং কথা বলতে শুরু করেন। জ্ঞান ফেরার পর তাঁর প্রথম কথাগুলো ছিল, ‘আমি কোথায়? আপনারা কারা?’ আইনজীবী র্যান্ডি স্পাইভি জানিয়েছেন, পাইকের শারীরিক অবস্থা এখনো গুরুতর। তিনি নিউমোনিয়া ও রক্ত জমাট বাঁধার সমস্যায় ভুগছেন। তাঁর হাত মারাত্মকভাবে ফুলে গেছে এবং স্বাভাবিকভাবে চলাফেরা করতেও সমস্যা হচ্ছে।
পাইকের আইনজীবীরা অভিযোগ করেছেন, ইনজেকশন প্রয়োগের সময় তাঁর শরীরে শিরা খুঁজে পেতে কারা কর্তৃপক্ষকে সমস্যায় পড়তে হয়। তাঁদের দাবি, অন্তত সাতবার সুচ ফোটানো হয়েছিল এবং একটি সুচ দুমড়ে-মুচড়ে যায়। ইনজেকশন দেওয়ার সময় পাইক তীব্র জ্বালাপোড়া ও যন্ত্রণা অনুভব করেছিলেন বলেও আইনজীবীরা জানিয়েছেন।
আলামত সংরক্ষণের নির্দেশ আদালতের
ক্রিস্টা পাইকের মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের ব্যর্থ চেষ্টা নিয়ে টেনেসির আদালতে নতুন করে আইনি লড়াই শুরু হয়েছে। তাঁর আইনজীবীরা ঘটনার পূর্ণাঙ্গ তদন্ত এবং মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের সময় ব্যবহৃত উপকরণ ও নথিপত্র সংরক্ষণের দাবি জানিয়েছেন।
৭ অক্টোবর বিচারক আই’আশিয়া মাইলস কারা কর্তৃপক্ষকে মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট সব আলামত সংরক্ষণের নির্দেশ দেন। এর মধ্যে রয়েছে ব্যবহৃত ওষুধ, সিরিঞ্জ, শিরায় ওষুধ দেওয়ার নল, চিকিৎসাসংক্রান্ত সরঞ্জাম, ছবি, ভিডিও, অডিও রেকর্ডিং, সাক্ষীদের বিবরণ এবং সংশ্লিষ্ট যোগাযোগ ও নথিপত্র।
পাইকের আইনজীবীরা আশঙ্কা করছেন, তিনি সুস্থ হয়ে উঠলে রাজ্য কর্তৃপক্ষ আবারও তাঁর মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের চেষ্টা করতে পারে। এ কারণে তাঁরা ঘটনার সব প্রমাণ সংরক্ষণ এবং মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের প্রক্রিয়া নিয়ে জবাবদিহি নিশ্চিত করার দাবি তুলেছেন।
ক্রিস্টা পাইকের ঘটনায় টেনেসিতে মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের পদ্ধতি নিয়ে উদ্বেগ বাড়ার মধ্যেই টেক্সাসে হাওয়ার্ডের মৃত্যুদণ্ড কার্যকর হলো। একই ওষুধ ব্যবহার করে দুই অঙ্গরাজ্যে ঘটে যাওয়া এই দুই ঘটনা প্রাণঘাতী ইনজেকশনের নির্ভরযোগ্যতা, বন্দিদের অধিকার এবং মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের পদ্ধতি নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রে নতুন করে আইনি ও নৈতিক বিতর্কের জন্ম দিয়েছে।