আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালতের (আইসিসি) ওপর যুক্তরাষ্ট্রের আরোপ করা নিষেধাজ্ঞার কঠোর সমালোচনা করেছেন ২০২৬ সালের নোবেল শান্তি পুরস্কারজয়ী নাভানেথেম ‘নাভি’ পিল্লাই। তাঁর মতে, আন্তর্জাতিক বিচারব্যবস্থার ওপর এ ধরনের পদক্ষেপ নজিরবিহীন ও অগ্রহণযোগ্য। বিশেষ করে, বিচারিক আদেশ বা রায় দেওয়ার কারণে বিচারকদের ওপর নিষেধাজ্ঞা আরোপের বিষয়টি আন্তর্জাতিক আইনের জন্য উদ্বেগজনক। দক্ষিণ আফ্রিকায় জন্ম নেওয়া নাভি পিল্লাই জাতিসংঘের […]
ছবি: সংগৃহীত
আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালতের (আইসিসি) ওপর যুক্তরাষ্ট্রের আরোপ করা নিষেধাজ্ঞার কঠোর সমালোচনা করেছেন ২০২৬ সালের নোবেল শান্তি পুরস্কারজয়ী নাভানেথেম ‘নাভি’ পিল্লাই। তাঁর মতে, আন্তর্জাতিক বিচারব্যবস্থার ওপর এ ধরনের পদক্ষেপ নজিরবিহীন ও অগ্রহণযোগ্য। বিশেষ করে, বিচারিক আদেশ বা রায় দেওয়ার কারণে বিচারকদের ওপর নিষেধাজ্ঞা আরোপের বিষয়টি আন্তর্জাতিক আইনের জন্য উদ্বেগজনক।
দক্ষিণ আফ্রিকায় জন্ম নেওয়া নাভি পিল্লাই জাতিসংঘের সাবেক মানবাধিকারবিষয়ক হাইকমিশনার এবং আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালতের সাবেক বিচারক। আন্তর্জাতিক আইন ও মানবাধিকার রক্ষায় দীর্ঘদিনের অবদানের স্বীকৃতি হিসেবে শুক্রবার (৯ অক্টোবর) তাঁকে ২০২৬ সালের নোবেল শান্তি পুরস্কার দেওয়ার ঘোষণা দেয় নরওয়ের নোবেল কমিটি।
এর কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের প্রশাসন আইসিসির বিরুদ্ধে নতুন নিষেধাজ্ঞা ঘোষণা করে। এতে আন্তর্জাতিক বিচারব্যবস্থা ও মার্কিন প্রশাসনের মধ্যে বিরোধ আরও গভীর হয়েছে।
শনিবার নরওয়ের অসলোর নোবেল পিস সেন্টারে আয়োজিত এক অনুষ্ঠানে ভার্চুয়ালি যুক্ত হয়ে ৮৫ বছর বয়সী নাভি পিল্লাই আইসিসির ওপর নিষেধাজ্ঞা নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেন।
তিনি বলেন, আন্তর্জাতিক বিচারালয়গুলোর, বিশেষ করে নেদারল্যান্ডসের দ্য হেগে অবস্থিত আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালতের অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখা নিয়ে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। তাঁর মতে, বিচারিক আদেশ বা রায় দেওয়ার কারণে কোনো দেশের বিচারকদের ওপর নিষেধাজ্ঞা আরোপের ঘটনা নজিরবিহীন এবং সম্পূর্ণ অগ্রহণযোগ্য।
পিল্লাইয়ের বক্তব্যের মূল বিষয় হলো, আন্তর্জাতিক আদালতগুলো যেন রাজনৈতিক চাপের বাইরে থেকে কাজ করতে পারে। বিচারকদের সিদ্ধান্তের কারণে তাঁদের বা সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের ওপর অর্থনৈতিক চাপ সৃষ্টি করা হলে আন্তর্জাতিক বিচারব্যবস্থার স্বাধীনতা ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে বলে উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন তিনি।
মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিও বলেছেন, যুক্তরাষ্ট্রের সার্বভৌমত্ব রক্ষার উদ্দেশ্যেই আইসিসির বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে। ওয়াশিংটনের অভিযোগ, আদালতটি এমন দেশগুলোর নাগরিকদের বিচার করার চেষ্টা করছে, যেগুলো আইসিসির সদস্য নয়; এর মধ্যে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল রয়েছে।
এর আগে ট্রাম্প প্রশাসন আইসিসির কয়েকজন বিচারক ও কর্মকর্তার ওপর ব্যক্তিগত নিষেধাজ্ঞা আরোপ করেছিল। তবে এবার আদালত প্রতিষ্ঠান হিসেবেই নিষেধাজ্ঞার আওতায় এসেছে। নতুন ব্যবস্থায় আদালতের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক প্রতিষ্ঠানের আর্থিক লেনদেন, মার্কিন আর্থিক পরিষেবা ব্যবহার এবং ডলারে লেনদেনের ক্ষেত্রে বিধিনিষেধ আরোপের কথা বলা হয়েছে।
মার্কিন প্রশাসনের দাবি, আইসিসির কার্যক্রম যুক্তরাষ্ট্রের স্বার্থ ও সার্বভৌমত্বের জন্য হুমকি তৈরি করছে। অন্যদিকে আদালত ও এর সমর্থকেরা বলছেন, এ ধরনের পদক্ষেপ আন্তর্জাতিক আইনের শাসন এবং গুরুতর অপরাধের জবাবদিহি নিশ্চিত করার প্রচেষ্টাকে বাধাগ্রস্ত করতে পারে।
নতুন নিষেধাজ্ঞার সব শর্ত কার্যকর হওয়ার আগে ছয় মাসের একটি সময়সীমা দেওয়া হয়েছে। এ সময়ের মধ্যে যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলোকে আইসিসির সঙ্গে তাদের ব্যবসায়িক সম্পর্কের বিষয়ে ব্যবস্থা নিতে হবে।
মার্কিন প্রশাসনের বক্তব্য, এই সময় দেওয়ার উদ্দেশ্য হলো আইসিসি ও এর সদস্য দেশগুলোকে ওয়াশিংটনের উদ্বেগ সমাধানের সুযোগ দেওয়া। তবে নিষেধাজ্ঞা কার্যকর হলে আদালতের আর্থিক লেনদেন, প্রযুক্তিগত পরিষেবা এবং আন্তর্জাতিক কার্যক্রম পরিচালনায় জটিলতা তৈরি হতে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।
আইসিসি জানিয়েছে, এ ধরনের চাপ সত্ত্বেও আদালত তার দায়িত্ব পালন অব্যাহত রাখবে। আদালতের সমর্থকেরা মনে করছেন, নিষেধাজ্ঞার প্রভাব মোকাবিলায় সদস্য রাষ্ট্রগুলোর আর্থিক ও প্রাতিষ্ঠানিক সহযোগিতা গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠবে।
আইসিসির সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের বিরোধের পেছনে রয়েছে কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ তদন্ত ও বিচারিক পদক্ষেপ। এর মধ্যে আফগানিস্তানে মার্কিন সেনাদের বিরুদ্ধে কথিত যুদ্ধাপরাধের তদন্ত এবং ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুসহ দেশটির শীর্ষ কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারির বিষয় রয়েছে।
যুক্তরাষ্ট্র এসব পদক্ষেপের বিরোধিতা করে আসছে। ট্রাম্প প্রশাসনের অভিযোগ, আইসিসি এমনভাবে ক্ষমতা প্রয়োগ করছে, যা মার্কিন নাগরিকদের আইনি সুরক্ষা ও জাতীয় সার্বভৌমত্বের সঙ্গে সাংঘর্ষিক।
তবে নতুন নিষেধাজ্ঞার ঘোষণায় নেতানিয়াহুর বিরুদ্ধে জারি করা গ্রেপ্তারি পরোয়ানা প্রত্যাহারের শর্ত দেওয়া হয়েছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ নেই। নিষেধাজ্ঞার মূল লক্ষ্য হিসেবে আদালতের কার্যক্রম ও এর সঙ্গে সংশ্লিষ্ট আর্থিক-প্রাতিষ্ঠানিক সম্পর্ককে চিহ্নিত করা হয়েছে।
আইসিসির ওপর মার্কিন নিষেধাজ্ঞার সমালোচনা করেছে জাতিসংঘসহ বিভিন্ন আন্তর্জাতিক পক্ষ। জাতিসংঘের মহাসচিব আন্তোনিও গুতেরেসের মতে, এ ধরনের পদক্ষেপ আন্তর্জাতিক বিচারব্যবস্থার সম্মিলিত প্রচেষ্টার ওপর গুরুতর আঘাত।
যুক্তরাজ্য, কানাডা, ডেনমার্ক, জার্মানি, ফ্রান্স, ইতালি, জাপান ও নেদারল্যান্ডসসহ যুক্তরাষ্ট্রের কয়েকটি মিত্র দেশও নিষেধাজ্ঞার বিরোধিতা করেছে। এসব দেশের উদ্বেগের কেন্দ্র হলো আন্তর্জাতিক বিচারব্যবস্থার স্বাধীনতা এবং গুরুতর আন্তর্জাতিক অপরাধের বিচার নিশ্চিত করার সক্ষমতা।
নেদারল্যান্ডসসহ ইউরোপের কয়েকটি দেশ নিষেধাজ্ঞার প্রভাব কমাতে বিকল্প ব্যবস্থা বিবেচনা করছে। আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংগঠনগুলোরও আশঙ্কা, আর্থিক ও প্রযুক্তিগত পরিষেবায় বাধা সৃষ্টি হলে আদালতের চলমান তদন্ত ও বিচারকাজ ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে।
নাভি পিল্লাইকে শান্তি ও আন্তর্জাতিক আইন প্রসারে অবদানের স্বীকৃতি হিসেবে নোবেল শান্তি পুরস্কার দেওয়ার ঘোষণা দিয়েছে নরওয়ের নোবেল কমিটি। তাঁর দীর্ঘ কর্মজীবনে রুয়ান্ডার গণহত্যা-সংক্রান্ত বিচার, আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালতের কার্যক্রম এবং জাতিসংঘের মানবাধিকার উদ্যোগে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রয়েছে।
২০২১ থেকে ২০২৫ সাল পর্যন্ত তিনি অধিকৃত ফিলিস্তিনি ভূখণ্ড, পূর্ব জেরুজালেম ও ইসরায়েলবিষয়ক জাতিসংঘের স্বাধীন তদন্ত কমিশনের নেতৃত্ব দেন। ওই কমিশনের প্রতিবেদনে গাজায় গণহত্যা সংঘটিত হয়েছে বলে সিদ্ধান্ত দেওয়া হয়েছিল। ইসরায়েল এ মূল্যায়নের বিরোধিতা করেছে।
নাভি পিল্লাইয়ের নোবেল পুরস্কার ঘোষণার পর ট্রাম্প ক্ষোভ প্রকাশ করেন। তিনি পুরস্কার দেওয়ার সিদ্ধান্তকে ‘লজ্জাজনক ও অপমানজনক’ বলে মন্তব্য করেন এবং নরওয়ের বিরুদ্ধে ‘চিরস্থায়ী দাগ’ তৈরি হওয়ার কথা বলেন। ট্রাম্প দীর্ঘদিন ধরেই দাবি করে আসছেন, নোবেল শান্তি পুরস্কার তাঁর প্রাপ্য।
পুরস্কার ঘোষণা এবং আইসিসির বিরুদ্ধে নিষেধাজ্ঞার সময়গত নৈকট্য আন্তর্জাতিক অঙ্গনে নতুন আলোচনা তৈরি করেছে। তবে নিষেধাজ্ঞার আনুষ্ঠানিক যুক্তি হিসেবে মার্কিন প্রশাসন আদালতের কার্যক্রম ও যুক্তরাষ্ট্রের সার্বভৌমত্ব-সংক্রান্ত উদ্বেগের কথা জানিয়েছে।
আইসিসির ওপর নিষেধাজ্ঞা নিয়ে বিরোধ এখন আন্তর্জাতিক আইনের শাসন, রাষ্ট্রীয় সার্বভৌমত্ব এবং আন্তর্জাতিক অপরাধের জবাবদিহি নিশ্চিত করার প্রশ্নকে সামনে এনেছে। নাভি পিল্লাইয়ের বক্তব্যে আন্তর্জাতিক বিচারব্যবস্থার স্বাধীনতা রক্ষার বিষয়টি গুরুত্ব পেয়েছে। নিষেধাজ্ঞার বাস্তব প্রভাব কতটা বিস্তৃত হবে, তা নির্ভর করবে এর প্রয়োগ এবং আদালতের সদস্য রাষ্ট্রগুলোর প্রতিক্রিয়ার ওপর।