সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে মহানবী হযরত মুহাম্মদ (সা.)-কে অবমাননার অভিযোগে ইরানের ২৩ বছর বয়সী এক তরুণীকে মৃত্যুদণ্ড দিয়েছেন দেশটির আদালত। নাজমেহ আমিনি নামের ওই তরুণী চলতি বছরের সরকারবিরোধী বিক্ষোভের সময় গ্রেপ্তার হন। মৃত্যুদণ্ডের পাশাপাশি পৃথক একটি মামলায় তাঁকে ১২ বছর ছয় মাস এক দিনের কারাদণ্ডও দেওয়া হয়েছে। তবে মৃত্যুদণ্ডের রায় এখনো চূড়ান্ত নয়; ইরানের সুপ্রিম কোর্টে আপিলের […]
ছবি: সংগৃহীত
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে মহানবী হযরত মুহাম্মদ (সা.)-কে অবমাননার অভিযোগে ইরানের ২৩ বছর বয়সী এক তরুণীকে মৃত্যুদণ্ড দিয়েছেন দেশটির আদালত। নাজমেহ আমিনি নামের ওই তরুণী চলতি বছরের সরকারবিরোধী বিক্ষোভের সময় গ্রেপ্তার হন। মৃত্যুদণ্ডের পাশাপাশি পৃথক একটি মামলায় তাঁকে ১২ বছর ছয় মাস এক দিনের কারাদণ্ডও দেওয়া হয়েছে। তবে মৃত্যুদণ্ডের রায় এখনো চূড়ান্ত নয়; ইরানের সুপ্রিম কোর্টে আপিলের সুযোগ রয়েছে।
ব্রিটিশ সংবাদমাধ্যম দ্য গার্ডিয়ানের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, নাজমেহ বর্তমানে ইরানের উত্তর-পূর্বাঞ্চলীয় শহর মাশহাদের ভাকিলাবাদ কারাগারে বন্দি রয়েছেন। তিনি হিসাববিজ্ঞান বিষয়ে পড়াশোনা করছিলেন।
নাজমেহ আমিনিকে চলতি বছরের জানুয়ারিতে ইরানে সরকারবিরোধী বিক্ষোভের সময় গ্রেপ্তার করা হয়। মানবাধিকার সংস্থা ইরান হিউম্যান রাইটসের তথ্য অনুযায়ী, ৩ ফেব্রুয়ারি মাশহাদের ফেরদৌসি শপিং সেন্টার থেকে তাঁকে আটক করা হয়। তবে তাঁর গ্রেপ্তারের সুনির্দিষ্ট তারিখ নিয়ে বিভিন্ন প্রতিবেদনে ভিন্ন তথ্য পাওয়া গেছে।
পরিবারের সদস্যরা প্রথমে ধারণা করেছিলেন, সরকারবিরোধী আন্দোলন নিয়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে পোস্ট দেওয়ার কারণে তাঁকে আটক করা হয়েছে। পরে তাঁর বিরুদ্ধে পৃথক দুটি মামলা হয়। এর একটিতে মহানবীকে অবমাননার অভিযোগ আনা হয়। অন্য মামলায় জাতীয় নিরাপত্তার বিরুদ্ধে কর্মকাণ্ড এবং সরকারের বিরুদ্ধে প্রচারণা চালানোর অভিযোগে তাঁকে কারাদণ্ড দেওয়া হয়।
মানবাধিকার সংস্থা ইরান হিউম্যান রাইটস জানিয়েছে, খোরাসান রাজাভি প্রদেশের অপরাধ আদালতের ষষ্ঠ শাখায় মহানবীকে অবমাননার অভিযোগে তাঁর বিচার হয়। আদালত তাঁকে মৃত্যুদণ্ড দেন। পৃথক মামলায় বিপ্লবী আদালত তাঁকে ১২ বছর ছয় মাস এক দিনের কারাদণ্ড দেন।
ইরানি সংবাদমাধ্যম খোরাসানের প্রতিবেদন অনুযায়ী, আদালতে নাজমেহ দাবি করেন, বন্ধুদের সঙ্গে হ্যালুসিনেশন সৃষ্টিকারী মাশরুমজাতীয় মাদক গ্রহণের পর তিনি অস্বাভাবিক মানসিক অবস্থায় সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে আপত্তিকর মন্তব্য প্রকাশ করেছিলেন।
তাঁর আইনজীবীর যুক্তি ছিল, মন্তব্যগুলো ইচ্ছাকৃতভাবে করা হয়নি; বরং ভুলবশত তাঁর মুখ থেকে বেরিয়ে গিয়েছিল। কিন্তু আদালত তাঁর ও আইনজীবীর বক্তব্য গ্রহণ করেননি।
ইরানের ইসলামি দণ্ডবিধির ২৬২ নম্বর ধারায় মহানবী হযরত মুহাম্মদ (সা.)-কে অবমাননার অপরাধে মৃত্যুদণ্ডের বিধান রয়েছে। তবে ২৬৩ নম্বর ধারায় অনিচ্ছাকৃত বক্তব্য, ভুলবশত বলা কথা কিংবা নেশাগ্রস্ত অবস্থায় করা মন্তব্যের ক্ষেত্রে কিছু ব্যতিক্রমের সুযোগ রাখা হয়েছে।
মানবাধিকার সংস্থাগুলোর অভিযোগ, এ ধরনের মামলায় অভিযুক্ত ব্যক্তির আত্মপক্ষ সমর্থনের সুযোগ যথাযথভাবে বিবেচনা করা হচ্ছে না।
কারাগার থেকে প্রকাশিত একটি অডিও বার্তায় নাজমেহ আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের হস্তক্ষেপ কামনা করেছেন। তাঁর মামলার তদন্ত ও বিচারপ্রক্রিয়া পর্যালোচনার জন্য জাতিসংঘ, আইনজীবী এবং মানবাধিকার সংস্থাগুলোর প্রতি আহ্বান জানিয়েছেন তিনি।
ইরান হিউম্যান রাইটসের পরিচালক মাহমুদ আমিরি-মোগাদ্দাম এ রায়কে উদ্বেগজনক হিসেবে বর্ণনা করেছেন। তাঁর মতে, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রকাশিত বক্তব্যের জন্য একজন তরুণীকে মৃত্যুদণ্ড দেওয়ার ঘটনা মতপ্রকাশের স্বাধীনতার বিরুদ্ধে মৃত্যুদণ্ডের প্রয়োগ আরও বিস্তৃত হওয়ার আশঙ্কা তৈরি করছে।
সংস্থাটি আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়কে এ বিষয়ে কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়ার আহ্বান জানিয়েছে।
নাজমেহ আমিনির মৃত্যুদণ্ডের রায় এখনো ইরানের সুপ্রিম কোর্টে চূড়ান্ত অনুমোদন পায়নি। ফলে রায়টি কার্যকর হয়েছে—এমন নয়; এটি আপিলের অধীন রয়েছে।
মানবাধিকার সংস্থাগুলোর হিসাবে, ২০২৬ সালে ইরানে এ পর্যন্ত ছয় শতাধিক মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করা হয়েছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে বক্তব্য প্রকাশের মতো ঘটনায় মৃত্যুদণ্ডের রায় দেওয়ার প্রবণতা নিয়ে আন্তর্জাতিক মহলে উদ্বেগ বাড়ছে।
ইরানে ধর্ম অবমাননার অভিযোগে মৃত্যুদণ্ডের ঘটনা তুলনামূলকভাবে বিরল। এর আগে ২০২৩ সালের মে মাসে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ধর্ম অবমাননাসংক্রান্ত অভিযোগে ইউসেফ মেহরদাদ ও সদরুল্লাহ ফাজেলি-জারেকে মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হয়েছিল এবং তা কার্যকর করা হয়।
নাজমেহ আমিনির মামলাটি এখন আপিলের অপেক্ষায় রয়েছে। তাঁর মৃত্যুদণ্ড বহাল থাকবে, নাকি উচ্চ আদালত রায় পরিবর্তন করবেন, তা নির্ধারিত হবে পরবর্তী বিচারিক প্রক্রিয়ায়।