সম্পূর্ণ নিউজ বাংলা-ভয়েজ

আন্তর্জাতিক
৭:১২ অপরাহ্ন, ১৪ অক্টোবর ২০২৬

হুথিদের দাপটে কোণঠাসা সৌদি আরব, মার্কিন অস্ত্রেও মিলছে না পূর্ণ নিরাপত্তা

প্রতিরক্ষা খাতে প্রতিবছর বিপুল অর্থ ব্যয় করে সৌদি আরব। যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপ থেকে অত্যাধুনিক যুদ্ধবিমান, ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিরোধব্যবস্থা এবং বিভিন্ন ধরনের সামরিক সরঞ্জাম কিনেছে দেশটি। কিন্তু এত আয়োজনের পরও ইয়েমেনের ইরান-সমর্থিত হুথি বিদ্রোহীদের ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলা পুরোপুরি ঠেকাতে পারছে না রিয়াদ। গত সপ্তাহে দেশটির রাজধানীর প্রধান বিমানবন্দরেও প্রাণঘাতী হামলার ঘটনা ঘটেছে। স্টকহোম আন্তর্জাতিক শান্তি গবেষণা […]

হুথিদের দাপটে কোণঠাসা সৌদি আরব, মার্কিন অস্ত্রেও মিলছে না পূর্ণ নিরাপত্তা

ছবি: সংগৃহীত

নিজস্ব প্রতিবেদক
৫ মিনিটে পড়ুন |

প্রতিরক্ষা খাতে প্রতিবছর বিপুল অর্থ ব্যয় করে সৌদি আরব। যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপ থেকে অত্যাধুনিক যুদ্ধবিমান, ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিরোধব্যবস্থা এবং বিভিন্ন ধরনের সামরিক সরঞ্জাম কিনেছে দেশটি। কিন্তু এত আয়োজনের পরও ইয়েমেনের ইরান-সমর্থিত হুথি বিদ্রোহীদের ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলা পুরোপুরি ঠেকাতে পারছে না রিয়াদ। গত সপ্তাহে দেশটির রাজধানীর প্রধান বিমানবন্দরেও প্রাণঘাতী হামলার ঘটনা ঘটেছে।

স্টকহোম আন্তর্জাতিক শান্তি গবেষণা প্রতিষ্ঠানের (এসআইপিআরআই) তথ্য অনুযায়ী, গত বছর সৌদি আরব প্রতিরক্ষা খাতে ৮ হাজার ৩০০ কোটি ডলার ব্যয় করেছে। সামরিক ব্যয়ের দিক থেকে বিশ্বের শীর্ষ ১০ দেশের মধ্যে রয়েছে দেশটি। সৌদি সামরিক বাহিনীর হাতে যুক্তরাষ্ট্রের তৈরি যুদ্ধবিমান, প্যাট্রিয়ট ও থাড ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিরোধব্যবস্থা এবং যুক্তরাজ্য ও ফ্রান্সের উন্নত অস্ত্র রয়েছে।

তারপরও গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনাগুলো পুরোপুরি সুরক্ষিত রাখা যাচ্ছে না। এর অন্যতম কারণ, সৌদি আরবের বিশাল ভূখণ্ডজুড়ে ছড়িয়ে থাকা সামরিক ও বেসামরিক স্থাপনা এবং বিভিন্ন দিক থেকে আসা হামলার হুমকি।

তিন দিক থেকে হামলার ঝুঁকি

সৌদি আরবের পূর্ব দিকে ইরান, দক্ষিণে ইয়েমেনের হুথি বিদ্রোহী এবং উত্তরে ইরান-সমর্থিত ইরাকি সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলোর কাছ থেকে হামলার আশঙ্কা রয়েছে। চলতি বছরের সংঘাতের সবচেয়ে তীব্র পর্যায়ে ইরান সৌদি আরবের বিভিন্ন লক্ষ্যবস্তুতে প্রায় এক হাজার ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন ছুড়েছে। অন্যদিকে, ইরান-সমর্থিত ইরাকি সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলো দেশটির গুরুত্বপূর্ণ ইস্ট-ওয়েস্ট পাইপলাইন লক্ষ্য করে ড্রোন হামলার চেষ্টা করেছে।

দক্ষিণে ইয়েমেনের পাহাড়ি এলাকা ও ভ্রাম্যমাণ উৎক্ষেপণব্যবস্থা ব্যবহার করে সৌদি ভূখণ্ডে ক্ষেপণাস্ত্র ছুড়ছে হুথিরা।

সৌদি আরবের প্রতিরক্ষাব্যবস্থাকে শুধু রাজধানী রিয়াদ কিংবা একটি তেল শোধনাগার রক্ষা করলেই চলে না। বিমানবন্দর, তেল স্থাপনা, পাইপলাইনসহ বিস্তীর্ণ এলাকার অসংখ্য গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনা সুরক্ষিত রাখতে হয়। আকাশপথে আসা হামলা শনাক্ত করা, কোন ক্ষেপণাস্ত্র বা ড্রোন প্রতিহত করা হবে তা নির্ধারণ এবং সাধারণ মানুষকে সতর্ক করার জন্য হাতে থাকে খুব অল্প সময়।

সৌদি সংশ্লিষ্ট একটি সূত্রের ভাষ্য অনুযায়ী, দেশটির প্রতিরক্ষা বাহিনী হুথিদের ছোড়া অনেক ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন প্রতিহত করতে পারছে। তবে কিছু হামলা প্রতিরক্ষাব্যবস্থা ভেদ করে লক্ষ্যবস্তুতে পৌঁছে যাচ্ছে। বিপুলসংখ্যক স্থাপনা ঝুঁকিতে থাকায় কোথায় কীভাবে প্রতিরক্ষাব্যবস্থা মোতায়েন করা হবে, তা নিয়ে কঠিন সিদ্ধান্ত নিতে হচ্ছে সৌদি কর্তৃপক্ষকে।

কৌশল বদলেছে হুথিরা

সৌদি আরবের আকাশ প্রতিরক্ষাব্যবস্থাকে চাপে ফেলতে হুথিরা একই সঙ্গে ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র, ক্রুজ ক্ষেপণাস্ত্র ও দূরপাল্লার ড্রোন ব্যবহার করছে। একযোগে বিভিন্ন ধরনের অস্ত্র দিয়ে হামলার এই কৌশলের সঙ্গে ইউক্রেনে রাশিয়ার ব্যবহৃত হামলার ধরনের মিল রয়েছে।

ক্রুজ ক্ষেপণাস্ত্র তুলনামূলক নিচু দিয়ে উড়ে যায়। ফলে রাডারে সেগুলো শনাক্ত করা এবং গতিপথ অনুসরণ করা কঠিন হতে পারে। এ ছাড়া হুথিরা নতুন প্রজন্মের কিছু ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র ব্যবহারের দাবি করেছে, যেগুলো উড্ডয়নের সময় গতিপথ পরিবর্তন করতে পারে।

বিশেষজ্ঞদের মতে, হুথিদের হাটেম-২ ও প্যালেস্টাইন-২ ক্ষেপণাস্ত্রের নকশার সঙ্গে ইরানের তৈরি অস্ত্রের উল্লেখযোগ্য মিল রয়েছে। এসব ক্ষেপণাস্ত্র দ্রুতগতির এবং নির্ভুলভাবে লক্ষ্যবস্তুতে আঘাত হানতে সক্ষম বলে দাবি করা হয়।

গত বছর ইসরায়েলের আকাশ প্রতিরক্ষাব্যবস্থা ভেদ করে একটি হুথি ক্ষেপণাস্ত্র বেন গুরিয়ন বিমানবন্দরের কাছে আঘাত হেনেছিল। সে সময় বিশ্লেষক আমির বার শালোম বলেছিলেন, প্রায় দুই হাজার কিলোমিটার দূর থেকে ছোড়া ক্ষেপণাস্ত্রের এমন নির্ভুলতা উল্লেখযোগ্য।

ইয়েমেনের সরকারি বাহিনীর মুখপাত্র ব্রিগেডিয়ার জেনারেল মাজেদ আল-নাজিলির দাবি, হুথিরা ইরানের তৈরি আকাশ প্রতিরক্ষাব্যবস্থার কিছু অস্ত্র পরিবর্তন করে ব্যবহার করছে। এসব ক্ষেপণাস্ত্র যুদ্ধবিমান ও ক্রুজ ক্ষেপণাস্ত্রকে লক্ষ্যবস্তু করতে পারে বলে তিনি জানিয়েছেন।

তেহরানের নির্দেশেই চলে হুথিরা?

দীর্ঘদিন ধরে ইরানের নেতৃত্বাধীন কথিত ‘প্রতিরোধ অক্ষের’ অংশ হিসেবে পরিচিত হুথিরা। তবে হিজবুল্লাহ, হামাস ও ইরান-সমর্থিত ইরাকি কয়েকটি সশস্ত্র গোষ্ঠী সাম্প্রতিক সংঘাতে দুর্বল হয়ে পড়লেও হুথিরা নিজেদের অবস্থান আরও শক্ত করেছে।

তেহরানের সঙ্গে হুথিদের ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক রয়েছে। ইরানের সাবেক সর্বোচ্চ নেতা আলি খামেনির শেষকৃত্যেও একটি প্রতিনিধিদল পাঠিয়েছিল গোষ্ঠীটি। তবে ইরানের সঙ্গে ঘনিষ্ঠতা থাকলেও হুথিদের নিজস্ব রাজনৈতিক ও সামরিক লক্ষ্য রয়েছে।

২০১৫ থেকে ২০২২ সাল পর্যন্ত সৌদি আরব ও হুথিদের মধ্যে দীর্ঘ সংঘাতে ইয়েমেনের হুথিনিয়ন্ত্রিত এলাকাগুলোতে ব্যাপক দুর্ভোগ তৈরি হয়। অর্থনৈতিক ও পরিবহন অবরোধের প্রভাবও অব্যাহত রয়েছে।

এরই পরিপ্রেক্ষিতে গত জুলাইয়ে হুথিরা লোহিত সাগরে সৌদি জাহাজে হামলার হুমকি দেয়। কিছুদিন পরই ক্ষেপণাস্ত্র হামলা শুরু হয়। প্রথম দিকে লোহিত সাগর উপকূলের কাছে সৌদি আরামকোর একটি তেল শোধনাগার এবং কয়েকটি বিমানঘাঁটি লক্ষ্যবস্তু করা হয়।

হুথিদের দাবি, ইয়েমেনের সরকারি বাহিনীকে সমর্থন দিয়ে সৌদি আরব যে বিমান হামলা চালাচ্ছে, তা বন্ধ করতে হবে। পাশাপাশি ক্ষতিপূরণ হিসেবে সৌদি আরবের কাছ থেকে কয়েক শ কোটি ডলারও দাবি করছে তারা।

যুদ্ধ নাকি সমঝোতা, কঠিন সিদ্ধান্তে রিয়াদ

হুথিদের সঙ্গে সংঘাত বাড়লেও সৌদি আরব স্বাভাবিক পরিস্থিতির ভাবমূর্তি ধরে রাখার চেষ্টা করেছে। গত সপ্তাহে দেশটির নাগরিক প্রতিরক্ষা কর্তৃপক্ষ ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলার বিষয়ে মোবাইল ফোনে স্বয়ংক্রিয় সতর্কবার্তা পাঠানো বন্ধ করে দিয়েছিল। এর পরই রিয়াদের প্রধান বিমানবন্দরে প্রাণঘাতী হামলার ঘটনা ঘটে।

রিয়াদের কয়েকজন বাসিন্দা জানিয়েছেন, পরে আবার সতর্কবার্তা পাঠানো শুরু হয়। তাঁদের ভাষ্য অনুযায়ী, সোমবার মোবাইল ফোনে কার্যকরভাবে সতর্কবার্তা পাওয়া যাচ্ছিল। একই দিন সৌদি কর্তৃপক্ষ জানায়, তিনটি ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিহত করা হয়েছে।

আন্তর্জাতিক সহায়তা চাইছে সৌদি আরব

হুথিদের মোকাবিলায় আন্তর্জাতিক জোট গড়ে তোলার চেষ্টা করছে সৌদি আরব। আঞ্চলিক মিত্ররা প্রতিরক্ষাব্যবস্থা দিয়ে সহায়তার প্রস্তাব দিয়েছে। পাকিস্তান সৌদি আরবের প্রতিরক্ষায় কয়েক হাজার সেনা পাঠিয়েছে। মিসরও প্রয়োজন অনুযায়ী সহায়তার আশ্বাস দিয়েছে।

ইরানের সঙ্গে সংঘাতের শুরুতে ব্যবহৃত ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিরোধব্যবস্থার মজুত কমে যাওয়ায় সৌদি আরব যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপ থেকে নতুন সরঞ্জাম সংগ্রহের চেষ্টা করতে পারে।

তবে যুক্তরাষ্ট্রের নিজস্ব অস্ত্রভান্ডারেও ঘাটতি রয়েছে। মার্কিন প্রতিরক্ষা দপ্তরের মহাপরিদর্শকের এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ইরানের বিরুদ্ধে সামরিক অভিযান কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ অস্ত্রের মজুত কমিয়ে দিয়েছে। একই সঙ্গে নতুন অস্ত্র উৎপাদন ও সরবরাহের ক্ষেত্রে সামরিক শিল্পের সক্ষমতার সীমাবদ্ধতাও সামনে এসেছে।

এদিকে যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যবর্তী নির্বাচন সামনে থাকায় প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প মধ্যপ্রাচ্যে আরেকটি সংঘাতে জড়িয়ে পড়ার বিষয়ে সতর্ক অবস্থানে রয়েছেন। হুথিদের বিরুদ্ধে সরাসরি মার্কিন হামলার বিষয়ে তিনি স্পষ্ট প্রতিশ্রুতি দেননি, যদিও এমন সম্ভাবনা নাকচও করেননি।

ওয়াশিংটনের সেন্টার ফর স্ট্র্যাটেজিক অ্যান্ড ইন্টারন্যাশনাল স্টাডিজের মাইকেল কাটনির মতে, যুক্তরাষ্ট্রের এই অনীহা থেকে এমন ধারণা তৈরি হতে পারে যে সবচেয়ে কঠিন সময়ে দেশটি তার মিত্র সৌদি আরবকে পরিত্যাগ করেছে।

Facebook Comments Box
Advertise with us
এ বিভাগের আরও খবর


আর্কাইভ ক্যালেণ্ডার
Su Mo Tu We Th Fr Sa
Advertise with us
আরও বাংলা-ভয়েজ সংবাদ