ব্রাজিলের ৪৯ বছর বয়সী এক রাজমিস্ত্রি অনলাইনে পরিচিত প্রেমিকার সঙ্গে দেখা করতে নিজের সব জিনিসপত্র বিক্রি করে পাড়ি দিয়েছেন ২ হাজার ১০০ কিলোমিটার পথ। বাসে ৩৬ ঘণ্টারও বেশি সময় ভ্রমণ করে গন্তব্যে পৌঁছানোর পর জানতে পারেন, যে নারীর সঙ্গে নতুন জীবন শুরুর স্বপ্ন দেখেছিলেন, তাঁর বাস্তবে কোনো অস্তিত্বই নেই। ওই নারীর ছবি ও ভিডিও তৈরি […]
ছবি: সংগৃহীত
ব্রাজিলের ৪৯ বছর বয়সী এক রাজমিস্ত্রি অনলাইনে পরিচিত প্রেমিকার সঙ্গে দেখা করতে নিজের সব জিনিসপত্র বিক্রি করে পাড়ি দিয়েছেন ২ হাজার ১০০ কিলোমিটার পথ। বাসে ৩৬ ঘণ্টারও বেশি সময় ভ্রমণ করে গন্তব্যে পৌঁছানোর পর জানতে পারেন, যে নারীর সঙ্গে নতুন জীবন শুরুর স্বপ্ন দেখেছিলেন, তাঁর বাস্তবে কোনো অস্তিত্বই নেই। ওই নারীর ছবি ও ভিডিও তৈরি করা হয়েছিল কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআই দিয়ে।
অনলাইনে প্রেম খুঁজে পাওয়া যেমন রোমাঞ্চকর হতে পারে, তেমনি তা বাস্তব জীবনে বড় ধরনের হতাশারও কারণ হতে পারে। ব্রাজিলের রাজমিস্ত্রি এদিমার রোচা মার্টিনসও বিশ্বাস করেছিলেন, অনলাইনে তিনি নিজের জীবনের উপযুক্ত সঙ্গী খুঁজে পেয়েছেন। কিন্তু সেই বিশ্বাসের পরিণতি হয়েছে এক বড় ধাক্কায়।
মা মারা যাওয়ার পর যে শহরে মায়ের সঙ্গে থাকতেন, সেখানে আর সুখী বোধ করছিলেন না মার্টিনস। তিনি চেয়েছিলেন একজন সঙ্গী, নতুন করে জীবন শুরু করার সুযোগ এবং এমন একজন মানুষ, যার সঙ্গে জীবনের সুখ-দুঃখ ভাগ করে নেওয়া যায়।
অনলাইনে সেই মানুষটিকে খুঁজে পেয়েছেন বলে বিশ্বাস করেছিলেন তিনি। সেই বিশ্বাস থেকেই নিজের জিনিসপত্র বিক্রি করে বাসে চড়ে দীর্ঘ যাত্রায় বেরিয়ে পড়েন। ব্রাজিলের মারানহাও রাজ্যের ইম্পেরাত্রিজ থেকে দক্ষিণ-পূর্বাঞ্চলীয় শহর বেলো ওরিজন্তির উদ্দেশে রওনা হন তিনি।
৩৬ ঘণ্টারও বেশি সময় পথে কাটিয়ে ২ হাজার ১০০ কিলোমিটার পাড়ি দিয়ে সেখানে পৌঁছান মার্টিনস। তাঁর উদ্দেশ্য ছিল জেসিকা নামে পরিচিত ওই নারীর সঙ্গে দেখা করা এবং একসঙ্গে নতুন জীবন শুরু করা।
কিন্তু গন্তব্যে পৌঁছে তাঁর সেই স্বপ্ন ভেঙে যায়। জেসিকার সঙ্গে দেখা করার আশায় শহরের বিভিন্ন লোকজনকে জিজ্ঞেস করে তাঁর অবস্থান খুঁজতে গিয়ে মার্টিনস জানতে পারেন, ওই নারীর বাস্তবে কোনো অস্তিত্ব নেই। অনলাইনে দেখা তাঁর ছবি ও ভিডিও কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা দিয়ে তৈরি।
মার্টিনস সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে জেসিকা অলিভেইরা নামে একটি অ্যাকাউন্ট অনুসরণ করছিলেন। ওই নারী জেসিকা ফাজেন্দেইরা নামেও পরিচিত ছিলেন।
ভিডিওগুলোতে জেসিকা নিজেকে একজন বিধবা হিসেবে পরিচয় দিতেন। তাঁর দাবি ছিল, মিনাস জেরাইস রাজ্যে তাঁর একটি খামার রয়েছে এবং তিনি এমন একজন পুরুষ খুঁজছেন, যার সঙ্গে বাকি জীবন কাটাতে পারবেন।
জেসিকার বার্তাগুলো ছিল আকর্ষণীয়। তিনি সঙ্গী খুঁজে পাওয়ার আকাঙ্ক্ষার কথা বলতেন এবং খামারে আরামদায়ক জীবনযাপনের প্রতিশ্রুতি দিতেন। একটি ভিডিওতে তিনি এমন কথাও বলেন, যে পুরুষ তাঁর সঙ্গে থাকতে আসবেন, তাঁকে তিনি সহায়তা করবেন।
সিএনএন ব্রাজিলের প্রতিবেদনে উঠে আসা একটি ভিডিওতে জেসিকাকে বলতে শোনা যায়, ‘আমি চাই তুমি আমার খামারে এসো এবং জীবনে আর কখনও কাজ না করো।’
এ ধরনের প্রতিশ্রুতি মার্টিনসের মতো মানুষকে আকৃষ্ট করেছিল। তিনি বিশ্বাস করেছিলেন, জেসিকার সঙ্গে দেখা হলে জীবনের নতুন অধ্যায় শুরু করতে পারবেন। কিন্তু বাস্তবে সেখানে পৌঁছে বুঝতে পারেন, অনলাইনে যে সম্পর্ককে সত্যি বলে মনে করেছিলেন, তা এআই দিয়ে তৈরি পরিচয়ের ওপর দাঁড়িয়ে ছিল।
ব্রাজিলে এ ধরনের ঘটনা মার্টিনসের ক্ষেত্রেই প্রথম নয়। এর আগে আরও দুই প্রবীণ ব্যক্তি একই ধরনের অনলাইন ভিডিও দেখে নারীর সঙ্গে দেখা করার আশায় বেলো ওরিজন্তিতে গিয়েছিলেন বলে প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়েছে।
গত জুনে ৭২ বছর বয়সী ওয়াল্টার দা সিলভা রোরাইমা থেকে বেলো ওরিজন্তিতে যান। টিকটকে দেখা এক নারী তাঁকে জীবনসঙ্গী হিসেবে চান এবং নিজের খামারে কাজ দেওয়ার প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন বলে তিনি বিশ্বাস করেছিলেন।
এরপর আগস্টে ৭১ বছর বয়সী আলবার্তো দা কস্তা মানাউস থেকে বেলো ওরিজন্তিতে যান। এ যাত্রায় তাঁর প্রায় ৩ হাজার ব্রাজিলীয় রেয়াল খরচ হয়েছিল বলে জানা গেছে। তিনিও অনলাইনে ভিডিওতে দেখা এক নারীর সঙ্গে দেখা করার আশায় সেখানে গিয়েছিলেন। পরে জানতে পারেন, ওই নারী বাস্তব কোনো রোমান্টিক সঙ্গী নন।
ব্রাজিলের সম্প্রচারমাধ্যম রাদিও ইতাতিয়ার তথ্য অনুযায়ী, ছয় মাসেরও কম সময়ের মধ্যে বেলো ওরিজন্তিতে এ ধরনের তৃতীয় ঘটনা হিসেবে মার্টিনসের অভিজ্ঞতার খবর পাওয়া গেছে।
ঘটনাগুলো অনলাইনে তৈরি পরিচয়, এআই দিয়ে বানানো ছবি ও ভিডিও এবং ভার্চুয়াল সম্পর্কের ওপর অতিরিক্ত আস্থা রাখার ঝুঁকি সামনে এনেছে। মার্টিনসের ক্ষেত্রে অনলাইনে গড়ে ওঠা বিশ্বাস তাঁকে শুধু মানসিক হতাশার মুখেই ফেলেনি; নতুন জীবন শুরুর আশায় নিজের জিনিসপত্র বিক্রি করে দীর্ঘ পথ পাড়ি দেওয়ার পর তাঁকে বাস্তবতার মুখোমুখিও হতে হয়েছে।
সূত্র: পালস