সম্পূর্ণ নিউজ বাংলা-ভয়েজ

আন্তর্জাতিক
৩:১৮ অপরাহ্ন, ২১ অক্টোবর ২০২৬

ফ্রান্সের আন্দোলনকারীদের স্লোগানে ‘বিসমিল্লাহ’, উৎপত্তি হলো যেভাবে

ফ্রান্সে শিক্ষার্থীদের বিক্ষোভের সমর্থনে গত সপ্তাহে রাস্তায় নেমে আসেন লাখ লাখ মানুষ। এ সময় বিক্ষোভকারীদের হাতে থাকা কার্ডবোর্ডের প্ল্যাকার্ডে দেখা যায় একটি ব্যতিক্রমী স্লোগান—‘বিসমিল্লাহ, সে লে তেনেব্র’। আরবি ও ফরাসি শব্দের মিশেলে তৈরি এই বাক্যটি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ে এবং শিক্ষার্থী আন্দোলনের অন্যতম ব্যঙ্গাত্মক স্লোগানে পরিণত হয়। আরবি শব্দ ‘বিসমিল্লাহ’র অর্থ ‘আল্লাহর নামে শুরু’। অন্যদিকে, […]

ফ্রান্সের আন্দোলনকারীদের স্লোগানে ‘বিসমিল্লাহ’, উৎপত্তি হলো যেভাবে

ছবি: সংগৃহীত

নিজস্ব প্রতিবেদক
৪ মিনিটে পড়ুন |

ফ্রান্সে শিক্ষার্থীদের বিক্ষোভের সমর্থনে গত সপ্তাহে রাস্তায় নেমে আসেন লাখ লাখ মানুষ। এ সময় বিক্ষোভকারীদের হাতে থাকা কার্ডবোর্ডের প্ল্যাকার্ডে দেখা যায় একটি ব্যতিক্রমী স্লোগান—‘বিসমিল্লাহ, সে লে তেনেব্র’। আরবি ও ফরাসি শব্দের মিশেলে তৈরি এই বাক্যটি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ে এবং শিক্ষার্থী আন্দোলনের অন্যতম ব্যঙ্গাত্মক স্লোগানে পরিণত হয়।

আরবি শব্দ ‘বিসমিল্লাহ’র অর্থ ‘আল্লাহর নামে শুরু’। অন্যদিকে, ফরাসি বাক্যাংশ ‘সে লে তেনেব্র’র অর্থ ‘এটি অন্ধকার’। দুটি ভাষার শব্দ মিলিয়ে তৈরি স্লোগানটির অর্থ সরাসরি বোঝা কঠিন। তবে আন্দোলনকারীদের কাছে এটি হয়ে উঠেছে তরুণ প্রজন্ম ও কর্তৃপক্ষের মধ্যকার দূরত্ব এবং বিক্ষোভে নজরদারি বা অনুপ্রবেশের অভিযোগ নিয়ে বিদ্রূপের একটি মাধ্যম।

গত মাসে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে পর্যাপ্ত শিক্ষা সরঞ্জামের অভাব নিয়ে তরুণদের প্রতিবাদ শুরু হওয়ার পর আন্দোলনটি বিস্তৃত হয়। পরে বিক্ষোভের একপর্যায়ে ব্যাপক সহিংসতার ঘটনাও ঘটে। এ পরিস্থিতিতে ‘বিসমিল্লাহ, সে লে তেনেব্র’ স্লোগানটি আন্দোলনকারীদের মধ্যে বিশেষভাবে জনপ্রিয় হয়ে ওঠে।

স্লোগানটির উৎপত্তি যেভাবে

ধারণা করা হচ্ছে, স্ন্যাপচ্যাটে পাঠানো একটি বার্তা থেকেই স্লোগানটির উৎপত্তি। ফ্রান্সের শিক্ষার্থী আন্দোলনের আয়োজকদের একটি ব্যক্তিগত চ্যাট গ্রুপে প্রবেশের চেষ্টা করছিলেন—এমন এক ব্যক্তি বার্তাটি পাঠান বলে জানা গেছে।

বার্তার শুরুতে লেখা ছিল ‘বিসমিল্লাহ, সে লে তেনেব্র’। এটি ফ্রান্সের তরুণদের মধ্যে প্রচলিত আরবি ও ফরাসি ভাষার মিশ্র কথ্যরীতির অনুকরণ বলে মনে করা হয়। এরপর বার্তাটিতে লেখা হয়, ‘আমরা সবকিছু ভেঙে ফেলব’।

বার্তাটিতে মামাদৌ ও আবদুল্লাহর মতো নাম এবং আলজেরিয়ার পতাকার ইমোজি ব্যবহার করে বিভিন্ন প্রোফাইল থেকে একাধিকবার একই ধরনের বার্তা পাঠানো হয়েছিল বলে ধারণা করা হয়। পরে অন্য স্ন্যাপচ্যাট ব্যবহারকারীরা বার্তাটিকে হাস্যকর মনে করে এর স্ক্রিনশট নেন এবং সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে দেন। তবে নিউইয়র্ক টাইমস বার্তাগুলোর মূল উৎস স্বাধীনভাবে যাচাই করতে পারেনি।

স্লোগানটি নিয়ে কেন বিতর্ক

অনেক তরুণের সন্দেহ, বার্তাগুলো আইন প্রয়োগকারী সংস্থার কর্মকর্তাদের কাছ থেকে পাঠানো হয়ে থাকতে পারে। তাঁদের ধারণা, কর্মকর্তারা শিক্ষার্থী আন্দোলনে অনুপ্রবেশের চেষ্টা করতে গিয়ে তরুণদের কথ্যভঙ্গি ও পরিচয় অনুকরণ করেছেন।

এরপর বিক্ষোভকারীরা ‘বিসমিল্লাহ, সে লে তেনেব্র’ বাক্যটিকে ব্যঙ্গাত্মক স্লোগান হিসেবে ব্যবহার করতে শুরু করেন। তাঁদের কাছে এটি আন্দোলনে নজরদারি এবং বিক্ষোভকারীদের সম্পর্কে কর্তৃপক্ষের ধারণাকে উপহাস করার একটি উপায় হয়ে ওঠে।

স্লোগানটি ফ্রান্সের আইন প্রয়োগকারী সংস্থা এবং বিশেষ করে শিক্ষার্থী, কৃষ্ণাঙ্গ ও আরব বংশোদ্ভূত ফরাসিদের মধ্যে দীর্ঘদিনের উত্তেজনার প্রতীক হিসেবেও দেখা হচ্ছে। ফ্রান্সের সাবেক উপনিবেশগুলোর বাসিন্দাদের সন্তানসহ কৃষ্ণাঙ্গ ও আরব বংশোদ্ভূত অনেক ফরাসি নাগরিক দীর্ঘদিন ধরে বৈষম্যের শিকার হওয়ার অভিযোগ করে আসছেন। তাঁদের মতে, আলোচিত বার্তায় বিক্ষোভকারীদের পরিচয় ও আচরণকে নির্দিষ্ট জাতিগত গোষ্ঠীর সঙ্গে যুক্ত করে দেখানোর প্রবণতা প্রকাশ পেয়েছে।

এ বিষয়ে ফরাসি স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় তাদের কোনো কর্মকর্তা এ ধরনের বাক্য ব্যবহার করেছেন কি না, সে বিষয়ে মন্তব্য করেনি। তবে মন্ত্রণালয় স্বীকার করেছে, আইন প্রয়োগকারী সংস্থার কর্মকর্তারা কখনো কখনো অনলাইনে ছদ্মপরিচয় ব্যবহার করেন। এর উদ্দেশ্য হলো বিক্ষোভে বেআইনি কর্মকাণ্ডের পরিকল্পনা করা ব্যক্তিদের শনাক্ত করা।

মন্ত্রণালয়ের এক বিবৃতিতে বলা হয়, তদন্তকারী কর্মকর্তারা ছদ্মনাম ব্যবহার করে অপরাধে জড়িত ব্যক্তিদের যোগাযোগ শনাক্ত ও সংরক্ষণ করতে পারেন এবং আইনগত প্রক্রিয়ায় সেসব তথ্য প্রমাণ হিসেবে ব্যবহার করতে পারেন।

তরুণদের কাছে স্লোগানটির তাৎপর্য

শিক্ষার্থী আন্দোলনকারীদের কাছে এই অদ্ভুত বাক্যটি তাঁদের আন্দোলন ও সরকারের মধ্যে প্রজন্মগত ব্যবধানের প্রতীক হয়ে উঠেছে। তাঁদের অভিযোগ, সরকার তাঁদের দাবির প্রতি যথেষ্ট গুরুত্ব দিচ্ছে না। একই সঙ্গে স্লোগানটি আন্দোলনে অনুপ্রবেশের সন্দেহকে ঘিরে তৈরি হওয়া ক্ষোভ ও বিদ্রূপও প্রকাশ করছে।

ফ্রান্সের একটি প্রভাবশালী শিক্ষার্থী ইউনিয়নের মুখপাত্র সাবরিন খারবাচ বলেন, কোনো তরুণ স্বাভাবিকভাবে এভাবে কথা বলে না। তাঁর মতে, তরুণেরা বাক্যটিকে নিজেদের স্লোগানে পরিণত করে বোঝাতে চেয়েছেন, আন্দোলনে নজরদারি বা অনুপ্রবেশের চেষ্টা তাঁদের চোখ এড়ায় না। এসবের মধ্যেও তাঁরা নিজেদের সংগঠিত রাখতে সক্ষম।

বোর্দো বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী সাদানি সাবাদি এক সাক্ষাৎকারে বলেন, স্ন্যাপচ্যাটের বার্তাগুলো কর্তৃপক্ষের একধরনের পূর্বধারণা বা পক্ষপাতের প্রতিফলন। তাঁর বক্তব্য অনুযায়ী, কারা ব্যারিকেড তৈরি করছে কিংবা ‘সবকিছু ভেঙে ফেলার’ পরিকল্পনা করছে, সে বিষয়ে কর্তৃপক্ষ যেন আগে থেকেই ধারণা করে নিয়েছে।

প্যারিসের উচ্চবিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী ফেদ্রে কেমেনের মতে, ‘বিসমিল্লাহ, সে লে তেনেব্র’ এখন একটি জাতীয় কৌতুকে পরিণত হয়েছে। তাঁর ভাষায়, এটি একজন তরুণের অত্যন্ত বাজে অনুকরণ।

কেমেন আরও বলেন, বাক্যটিকে বর্ণবাদের উদাহরণ হিসেবেও দেখা হচ্ছে। কারণ, এর মাধ্যমে এমন ধারণা প্রকাশ পায় যে সম্পত্তি ভাঙচুরের সঙ্গে জড়িত ব্যক্তিরা সবাই আরব বংশোদ্ভূত।

ফ্রান্সের বাইরে ছড়িয়ে পড়েছে যেভাবে

ফ্রান্সের বাইরে বেলজিয়াম ও জার্মানির অনুরূপ বিক্ষোভেও ‘বিসমিল্লাহ, সে লে তেনেব্র’ স্লোগানটি ব্যবহার করা হয়েছে।

সুইডিশ পরিবেশকর্মী গ্রেটা থুনবার্গ শিক্ষার্থী আন্দোলনের প্রতি সংহতি জানিয়ে ইনস্টাগ্রামে প্রকাশিত একটি ভিডিওতে বাক্যটি উচ্চারণ করেন। ভিডিওতে তিনি ‘জেন-জি’ প্রজন্মের তরুণদের আরও কিছু অঙ্গভঙ্গিও দেখান। এর মধ্যে ‘সিক্স-সেভেন’–সংক্রান্ত একটি অঙ্গভঙ্গি ছিল, যা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে মিম হিসেবে জনপ্রিয়তা পেয়েছিল।

স্লোগানটির ব্যঙ্গাত্মক ব্যবহার ভারতের ‘ককরোচ আন্দোলন’-এর হাস্যরসের সঙ্গেও তুলনা করা হচ্ছে। ভারতে শিক্ষাব্যবস্থার উন্নতির দাবিতে শিক্ষার্থীদের একটি আন্দোলনে এ নাম ব্যবহৃত হয়েছিল। দেশটির প্রধান বিচারপতি তরুণ ও বেকার ভারতীয়দের ‘পরজীবী’ এবং ‘তেলাপোকা’ বলে ব্যঙ্গ করার পর প্রতিবাদকারীরা সেই শব্দগুলোকে নিজেদের আন্দোলনের নামের সঙ্গে যুক্ত করেন।

ফ্রান্সের এই স্লোগানও একইভাবে কর্তৃপক্ষের কথিত বিদ্রূপ বা অবমাননাকর ভাষাকে পাল্টা ব্যঙ্গের মাধ্যমে নিজেদের প্রতিবাদের অংশ করে নেওয়ার উদাহরণ হিসেবে আলোচনায় এসেছে।

Facebook Comments Box
Advertise with us
এ বিভাগের আরও খবর


আর্কাইভ ক্যালেণ্ডার
Su Mo Tu We Th Fr Sa
Advertise with us
আরও বাংলা-ভয়েজ সংবাদ