সম্পূর্ণ নিউজ বাংলা-ভয়েজ

আন্তর্জাতিক
১২:৫৫ অপরাহ্ন, ৫ অক্টোবর ২০২৬

‘কিডনি আবার গজাবে’—দালালের ফাঁদে নেপালের যে গ্রাম এখন ‘কিডনি ভ্যালি’

নেপালের হোকসে গ্রাম। একসময় দারিদ্র্যের সুযোগ নিয়ে দালালরা এখানকার মানুষকে কিডনি বিক্রিতে প্রলুব্ধ করত। এমনকি কিডনি অপসারণের পর সেটি আবার গজিয়ে উঠবে—এমন অবিশ্বাস্য কথাও বলা হতো। অর্থের সংকটে থাকা অনেক মানুষ সেই প্রতারণার শিকার হয়ে কিডনি বিক্রি করেছেন। এ কারণে গ্রামটি পরিচিতি পেয়েছে ‘কিডনি ভ্যালি’ নামে। বিভিন্ন গবেষণা ও প্রতিবেদনে দেখা গেছে, দীর্ঘদিন ধরে এ […]

‘কিডনি আবার গজাবে’—দালালের ফাঁদে নেপালের যে গ্রাম এখন ‘কিডনি ভ্যালি’
নিজস্ব প্রতিবেদক
৩ মিনিটে পড়ুন |

নেপালের হোকসে গ্রাম। একসময় দারিদ্র্যের সুযোগ নিয়ে দালালরা এখানকার মানুষকে কিডনি বিক্রিতে প্রলুব্ধ করত। এমনকি কিডনি অপসারণের পর সেটি আবার গজিয়ে উঠবে—এমন অবিশ্বাস্য কথাও বলা হতো। অর্থের সংকটে থাকা অনেক মানুষ সেই প্রতারণার শিকার হয়ে কিডনি বিক্রি করেছেন। এ কারণে গ্রামটি পরিচিতি পেয়েছে ‘কিডনি ভ্যালি’ নামে। বিভিন্ন গবেষণা ও প্রতিবেদনে দেখা গেছে, দীর্ঘদিন ধরে এ এলাকায় কিডনি বিক্রির সঙ্গে দারিদ্র্য, বেকারত্ব, প্রতারণা ও অঙ্গ পাচারের যোগসূত্র রয়েছে।

কাঞ্চা ও রাম—দুজনই আর্থিক সংকটের কারণে কিডনি বিক্রি করেছিলেন। অস্ত্রোপচারের পর নানা শারীরিক সমস্যায় ভুগছেন কাঞ্চা। এখনও ব্যথা রয়েছে এবং কাজ করতেও পারেন না তিনি।

কাঞ্চা বলেন, ‘কতজন এমন করেছে, তার হিসাব করা অসম্ভব। এই গ্রাম, ওই গ্রাম—সব জায়গাতেই অনেক মানুষ কিডনি বিক্রি করেছে।’

হিমালয়ের পাদদেশের এই জনপদে বছরের পর বছর দালালরা ঘুরে বেড়িয়েছে। দরিদ্র মানুষদের অর্থের প্রলোভন দেখিয়ে কিডনি বিক্রিতে রাজি করানো হতো। স্থানীয়দের কেউ কেউ জানিয়েছেন, তারা প্রতারিত ও শোষণের শিকার হয়েছেন। কারও কাছে এমন কথাও বলা হয়েছিল যে একটি কিডনি অপসারণের পর শরীরে নতুন কিডনি গজাবে। অবৈধ অস্ত্রোপচারের পর কয়েকজনের মৃত্যুর ঘটনাও স্থানীয়ভাবে উঠে এসেছে।

কিডনি বিক্রির এই দীর্ঘ ইতিহাসের কারণে হোকসে আন্তর্জাতিকভাবেও ‘কিডনি ভ্যালি’ নামে পরিচিত হয়ে ওঠে। গবেষণায় দেখা গেছে, কাভ্রেপালাঞ্চক জেলার এই গ্রামে কয়েক দশক ধরে কিডনি বিক্রির ঘটনা ঘটেছে। দারিদ্র্য, বেকারত্ব, কম মজুরি এবং পর্যাপ্ত তথ্যের অভাব মানুষকে এ ধরনের ঝুঁকির দিকে ঠেলে দিয়েছে।

তবে সাম্প্রতিক বছরগুলোতে হোকসের বাসিন্দারা এই পরিচয় থেকে বেরিয়ে আসার চেষ্টা করছেন। স্থানীয়রা বলছেন, আগের মতো কিডনি বিক্রির ঘটনা এখন আর দেখা যায় না। কিন্তু দারিদ্র্য ও কর্মসংস্থানের সংকট নেপালে কিডনি-সংক্রান্ত নতুন ঝুঁকি তৈরি করছে।

২০২৪ সালের এপ্রিলে Sky News-এর এক প্রতিবেদনে নেপালের কিডনি বিক্রির এই দীর্ঘদিনের বাস্তবতা তুলে ধরা হয়। প্রতিবেদনে বলা হয়, বিদেশে কাজ করতে যাওয়া নেপালি শ্রমিকদের একটি অংশও কিডনি বিকল হয়ে দেশে ফিরছেন। বিশেষ করে উপসাগরীয় দেশ ও মালয়েশিয়ায় কঠিন পরিবেশে কাজ করা শ্রমিকদের মধ্যে এ ধরনের ঘটনা দেখা যাচ্ছে। তীব্র গরম, পানিশূন্যতা ও দীর্ঘ সময় কঠিন পরিশ্রমকে এর সম্ভাব্য কারণ হিসেবে উল্লেখ করেছেন কয়েকজন বিজ্ঞানী।

এর মধ্যেই নেপালে কিডনি পাচারের আরেকটি উদ্বেগজনক চিত্র সামনে এসেছে। নেপালের গবেষণা প্রতিষ্ঠান সেন্টার ফর দ্য স্টাডি অব লেবার অ্যান্ড মোবিলিটি (CESLAM) ২০২৬ সালের ২৯ মে প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে ভারত-নেপাল সীমান্ত ব্যবহার করে কিডনি পাচারের অভিযোগ তুলে ধরে।

প্রতিবেদন অনুযায়ী, চাকরির প্রলোভন দেখিয়ে দরিদ্র ও আর্থিকভাবে অসহায় নেপালিদের ভারতে নিয়ে যাওয়া হচ্ছে। বিশেষ করে হোটেলে ভালো বেতনের চাকরির প্রতিশ্রুতি দিয়ে তাদের সীমান্ত পার করানোর পর আটকে রেখে কিডনি অপসারণের অভিযোগ রয়েছে।

সিন্ধুলি জেলার এক ব্যক্তি ২০২৫ সালে এমন একটি চক্রের ফাঁদে পড়েন বলে CESLAM-এর প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। চাকরির আশ্বাসে তাকে ভারতের চণ্ডীগড়ে নিয়ে যাওয়া হয়। সেখানে একটি অ্যাপার্টমেন্টে প্রায় এক মাস আটকে রাখা হয় তাকে। পরে জানানো হয়, তার কিডনি অপসারণ করা হবে। এতে তিনি রাজি না হলেও অভিযোগ অনুযায়ী তাকে জোর করে একটি ক্লিনিকে নিয়ে যাওয়া হয় এবং অচেতন করে তার বাম কিডনি অপসারণ করা হয়।

ওই ব্যক্তির দাবি, কিডনি অপসারণের বিনিময়ে তাকে ৬ লাখ রুপি দেওয়ার কথা ছিল। কিন্তু নেপালে ফেরত পাঠানোর সময় তাকে মাত্র ১০ হাজার রুপি দেওয়া হয়। দেশে ফিরে অসুস্থ হয়ে পড়ার পর তিনি পরিবারের কাছে পুরো ঘটনা জানান এবং পরে নেপালের অ্যান্টি-হিউম্যান ট্র্যাফিকিং ইনভেস্টিগেশন ব্যুরোতে (AHTIB) অভিযোগ করেন।

CESLAM-এর প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, এ ধরনের ঘটনা বিচ্ছিন্ন নয়। অর্থনৈতিকভাবে দুর্বল মানুষদের বিদেশে চাকরির মিথ্যা প্রতিশ্রুতি দিয়ে অঙ্গ পাচারচক্রে ফাঁসানোর অভিযোগ রয়েছে। নেপাল ও ভারতের মধ্যে উন্মুক্ত সীমান্ত থাকায় চাকরির সন্ধানে সহজে সীমান্ত পার হওয়া মানুষের একটি অংশ পাচারকারীদের লক্ষ্যবস্তুতে পরিণত হচ্ছে।

ফলে একদিকে অতীতের ‘কিডনি ভ্যালি’ হিসেবে পরিচিত হোকসের মানুষের শরীরে রয়ে গেছে কিডনি বিক্রির দীর্ঘমেয়াদি ক্ষত, অন্যদিকে নতুন করে চাকরির প্রলোভনে কিডনি পাচারের অভিযোগ সামনে আসছে। নেপালের ক্ষেত্রে দারিদ্র্য, কর্মসংস্থানের অভাব এবং মানুষের আর্থিক অসহায়তা যে অঙ্গ পাচারকারীদের জন্য বড় সুযোগ তৈরি করছে, এসব ঘটনা তারই ইঙ্গিত দিচ্ছে।

Facebook Comments Box
Advertise with us
এ বিভাগের আরও খবর


আর্কাইভ ক্যালেণ্ডার
Su Mo Tu We Th Fr Sa
Advertise with us
আরও বাংলা-ভয়েজ সংবাদ