বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর পক্ষ থেকে নিজেদের গবেষণা নিয়ে দেওয়া বক্তব্যকে বিভ্রান্তিকর ও সত্যের অপলাপ বলে মন্তব্য করেছে ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশ (টিআইবি)। দলটির কেন্দ্রীয় নির্বাহী পরিষদে নারীদের প্রতিনিধিত্ব না থাকার বিষয়ে গবেষণায় উঠে আসা তথ্যকে অসত্য বলার সুযোগ নেই বলে জানিয়েছে সংস্থাটি। মঙ্গলবার (৩ নভেম্বর) গণমাধ্যমে পাঠানো এক বিবৃতিতে এসব কথা জানায় টিআইবি। সংস্থাটি বলেছে, নির্বাচন […]
ছবি: সংগৃহীত
বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর পক্ষ থেকে নিজেদের গবেষণা নিয়ে দেওয়া বক্তব্যকে বিভ্রান্তিকর ও সত্যের অপলাপ বলে মন্তব্য করেছে ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশ (টিআইবি)। দলটির কেন্দ্রীয় নির্বাহী পরিষদে নারীদের প্রতিনিধিত্ব না থাকার বিষয়ে গবেষণায় উঠে আসা তথ্যকে অসত্য বলার সুযোগ নেই বলে জানিয়েছে সংস্থাটি।
মঙ্গলবার (৩ নভেম্বর) গণমাধ্যমে পাঠানো এক বিবৃতিতে এসব কথা জানায় টিআইবি।
সংস্থাটি বলেছে, নির্বাচন কমিশনের নিবন্ধনসংক্রান্ত বিধান অনুযায়ী ২০৩০ সালের মধ্যে রাজনৈতিক দলগুলোর সব পর্যায়ের কমিটিতে ন্যূনতম ৩৩ শতাংশ নারী সদস্য অন্তর্ভুক্ত করার লক্ষ্যমাত্রা রয়েছে। অথচ জামায়াতে ইসলামীর ২০২৩-২৫ মেয়াদের ১৯ সদস্যের কেন্দ্রীয় নির্বাহী পরিষদে কোনো নারী সদস্য নেই। টিআইবির মতে, এটি গণপ্রতিনিধিত্ব আদেশের (আরপিও) সংশ্লিষ্ট বিধানের সুস্পষ্ট লঙ্ঘন।
সম্প্রতি ‘বাংলাদেশের রাজনৈতিক দলের প্রাতিষ্ঠানিক সুশাসন’ শীর্ষক একটি গবেষণা প্রতিবেদন প্রকাশ করে টিআইবি। ওই গবেষণার তথ্য নিয়ে জামায়াতে ইসলামীর সেক্রেটারি জেনারেল গণমাধ্যমে দেওয়া বিবৃতিতে দাবি করেন, দলটির কেন্দ্রীয় কর্মপরিষদে ২১ জন নারী সদস্য এবং কেন্দ্রীয় মজলিসে শুরায় ১২২ জন নারী সদস্য রয়েছেন। এ ছাড়া দলটির রুকনদের প্রায় ৪৩ শতাংশ নারী।
জবাবে টিআইবি জানায়, তাদের গবেষণায় রাজনৈতিক দলের জাতীয় বা কেন্দ্রীয় নির্বাহী পরিষদ কিংবা কমিটিতে নারীদের প্রতিনিধিত্ব বিশ্লেষণ করা হয়েছে। জাতীয় কাউন্সিল, সম্মেলন বা মজলিসে শুরায় নারী সদস্যের সংখ্যা গবেষণার আওতাভুক্ত ছিল না।
সংস্থাটির বক্তব্য, আরপিওতে রাজনৈতিক দলের প্রতিটি কমিটিতে নারী সদস্য অন্তর্ভুক্তির কথা বলা হয়েছে, মোট নারী সদস্যের সংখ্যা নির্ধারণের কথা নয়। তাই মজলিসে শুরা ও রুকনদের নারী সদস্যের সংখ্যা তুলে ধরে গবেষণার তথ্যকে প্রশ্নবিদ্ধ করা প্রাসঙ্গিক নয়।
বিবৃতিতে টিআইবি আরও বলেছে, জামায়াতে ইসলামীর গঠনতন্ত্রে প্রতিটি সাংগঠনিক স্তরে পুরুষদের পাশাপাশি নারীদের জন্য পৃথক কমিটি ও কার্যক্রম পরিচালনার বিধান রয়েছে। নারী কর্মীদের জন্য পৃথক মজলিসে শুরা ও কর্মপরিষদও রয়েছে। তবে কেন্দ্রীয় নির্বাহী পরিষদে কোনো নারী সদস্য নেই। আমির, নায়েবে আমির, সেক্রেটারি জেনারেল ও সহকারী সেক্রেটারি জেনারেলের মতো গুরুত্বপূর্ণ নেতৃত্বস্থানীয় পদেও নারীদের অন্তর্ভুক্তির নজির নেই।
টিআইবির মতে, নারীদের জন্য আলাদা কমিটি গঠন করলেই দলীয় কার্যক্রমে তাঁদের প্রকৃত অংশগ্রহণ নিশ্চিত হয় না। বরং এভাবে নারীদের নির্দিষ্ট সাংগঠনিক কাঠামোর মধ্যে সীমাবদ্ধ রাখা হচ্ছে। পৃথক কমিটির উপস্থিতিকে দলের সব পর্যায়ে নারীদের অংশগ্রহণ হিসেবে তুলে ধরাকে ‘শুভঙ্করের ফাঁকি’ বলে উল্লেখ করেছে সংস্থাটি।
গবেষণায় আরও বলা হয়েছে, ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে জামায়াতে ইসলামী কোনো আসনেই নারী প্রার্থীকে মনোনয়ন দেয়নি। অথচ দলটির দাবি অনুযায়ী, সদস্যদের প্রায় ৪৩ শতাংশ নারী। এ বিষয়ে জামায়াতের বিবৃতিতে কোনো মন্তব্য করা হয়নি বলেও জানিয়েছে টিআইবি।
জামায়াতের গঠনতন্ত্রের কয়েকটি বিধান নিয়েও আপত্তি জানিয়েছে সংস্থাটি। টিআইবির বক্তব্য অনুযায়ী, ইসলামের মৌলিক বিশ্বাসের ভিত্তিতে সমাজ গঠন, আল্লাহর বিধান ছাড়া অন্য নিয়মনীতি প্রত্যাখ্যান, ইসলামী আকিদাবিরোধী প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে সম্পর্ক না রাখা এবং মুসলিম ও অমুসলিম নাগরিকদের সদস্যপদের ক্ষেত্রে পৃথক শর্ত আরোপের মতো বিধান সংবিধানের কয়েকটি মূলনীতির সঙ্গে সাংঘর্ষিক। এর মধ্যে রয়েছে জনগণের সার্বভৌমত্ব, ধর্মনিরপেক্ষতা, ধর্মীয় স্বাধীনতা এবং ধর্ম ও লিঙ্গের ভিত্তিতে বৈষম্য না করার নীতি।
টিআইবি বলেছে, গবেষণার ফলাফল অস্বীকার এবং অপ্রাসঙ্গিক তথ্য ব্যবহারের মাধ্যমে জামায়াতে ইসলামী দলের প্রকৃত রাজনৈতিক চর্চাকে আড়াল করার চেষ্টা করছে। তবে গবেষণা প্রতিবেদনটি গুরুত্বসহকারে পর্যালোচনা করায় দলটিকে সাধুবাদ জানিয়েছে সংস্থাটি। একই সঙ্গে গবেষণার সুপারিশ অনুযায়ী জামায়াতসহ সব রাজনৈতিক দলকে নিজ নিজ দলের প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কারের আহ্বান জানিয়েছে।
গবেষণার পদ্ধতি সম্পর্কে টিআইবি জানায়, আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত গবেষণাপদ্ধতি অনুসরণ করে তথ্য সংগ্রহ করা হয়েছে। এ জন্য রাজনৈতিক দলের কেন্দ্রীয় পর্যায়ের দায়িত্বপ্রাপ্ত প্রতিনিধি, নেতা-কর্মী, নির্বাচন কমিশনের কর্মকর্তা, রাজনৈতিক বিশ্লেষক, শিক্ষক ও গবেষকদের সাক্ষাৎকার নেওয়া হয়েছে। পাশাপাশি রাজনৈতিক দলের ওয়েবসাইট, দলীয় দপ্তর, গণমাধ্যম, গবেষণা প্রবন্ধ ও বই থেকে পাওয়া তথ্য বিভিন্ন পর্যায়ে যাচাই-বাছাই করা হয়েছে।