নিউইয়র্কের কুইন্সে বাংলাদেশি অভিবাসী পরিবারে বেড়ে ওঠা মহুয়া খান মাত্র ২৭ বছর বয়সেই উদ্যোক্তা ও কনটেন্ট ক্রিয়েটর হিসেবে নিজের পরিচিতি তৈরি করেছেন। ২০২৫ সালে বিভিন্ন উৎস থেকে তাঁর মোট আয় ছিল প্রায় ১ লাখ ৩০ হাজার ডলার। কর ও অন্যান্য খরচ বাদ দেওয়ার পর তাঁর নিট আয় দাঁড়ায় প্রায় ৭০ হাজার ডলার। বর্তমানে স্বামীকে নিয়ে […]
ছবি: সংগৃহীত
নিউইয়র্কের কুইন্সে বাংলাদেশি অভিবাসী পরিবারে বেড়ে ওঠা মহুয়া খান মাত্র ২৭ বছর বয়সেই উদ্যোক্তা ও কনটেন্ট ক্রিয়েটর হিসেবে নিজের পরিচিতি তৈরি করেছেন। ২০২৫ সালে বিভিন্ন উৎস থেকে তাঁর মোট আয় ছিল প্রায় ১ লাখ ৩০ হাজার ডলার। কর ও অন্যান্য খরচ বাদ দেওয়ার পর তাঁর নিট আয় দাঁড়ায় প্রায় ৭০ হাজার ডলার।
বর্তমানে স্বামীকে নিয়ে নিউইয়র্কের অ্যাস্টোরিয়ায় প্রায় ৩ হাজার ডলার মাসিক ভাড়ার একটি এক বেডরুমের অ্যাপার্টমেন্টে থাকেন মহুয়া। সেখান থেকেই নিজের ব্যবসা ও কনটেন্ট তৈরির কাজ পরিচালনা করছেন তিনি।
নিউইয়র্কের ব্যয়বহুল জীবনযাপন সম্পর্কে নিজের অভিজ্ঞতা তুলে ধরে মহুয়া বলেন, এই শহরের জীবন অনেকটা দ্বিমুখী বাস্তবতার মতো। চারপাশে মানুষকে একাধিক চাকরি ও দীর্ঘ সময় কাজ করতে দেখে অনেকের কাছেই অতিরিক্ত পরিশ্রমকে স্বাভাবিক জীবনযাপনের অংশ বলে মনে হতে পারে।
অভিবাসী পরিবারের সন্তান হিসেবে ছোটবেলা থেকেই কঠোর পরিশ্রমের সঙ্গে পরিচিত ছিলেন মহুয়া। তাঁর বাবা নিউইয়র্কের রাস্তায় ট্যাক্সি চালাতেন। সপ্তাহের সাত দিন, প্রতিদিন প্রায় ১৬ ঘণ্টা কাজ করতেন তিনি।
অন্যদিকে তাঁর মা সব সময় মেয়েকে বোঝাতেন, নিজের কাঙ্ক্ষিত লক্ষ্যে পৌঁছাতে হলে অন্যদের তুলনায় আরও বেশি পরিশ্রম করতে হবে।
পরিবারের এই মানসিকতার প্রভাবেই মাত্র ১৫ বছর বয়সে কাজ শুরু করেন মহুয়া। পরবর্তীতে উচ্চশিক্ষার সময় নিজের জমানো অর্থ ও ঋণের মাধ্যমে পড়াশোনার খরচ চালিয়েছেন। একই সময়ে বাসাভাড়া ও দৈনন্দিন ব্যয় মেটাতে আফটার-স্কুল কাউন্সেলর হিসেবেও পার্ট-টাইম কাজ করেছেন।
মহামারির সময় ইউটিউব, ইনস্টাগ্রাম ও টিকটকে নিজের আঁকাআঁকির ভিডিও প্রকাশের মাধ্যমে কনটেন্ট ক্রিয়েশনের যাত্রা শুরু হয় তাঁর। ধীরে ধীরে দর্শক বাড়তে থাকলে নিজের দক্ষতা আরও উন্নত করতে ইউটিউব ও স্কিলশেয়ারের বিভিন্ন ক্লাস করেন।
একসময় কনটেন্ট তৈরির কাজকেই আরও গুরুত্ব দিতে শুরু করেন তিনি। পাশাপাশি ‘Labyrinthave’ নামে নিজের একটি পোশাকের ব্র্যান্ডও গড়ে তোলেন। ব্র্যান্ডটির পোশাকে ইন্দো-ওয়েস্টার্ন ডিজাইনের সঙ্গে বাংলাদেশি ঐতিহ্যের বিভিন্ন উপাদানের সমন্বয় রয়েছে।
তবে শুরুটা মোটেও সহজ ছিল না। মহুয়া জানান, ক্যারিয়ারের শুরুর দিকে সবকিছু নিজে করার প্রবল আগ্রহে তিনি অনেকটা আচ্ছন্ন ছিলেন। কাউকে সাহায্য করতে দিতে চাইতেন না। ফলে কাজের চাপ এতটাই বেড়ে গিয়েছিল যে ব্যক্তিগত জীবনের জন্য প্রায় কোনো সময়ই থাকত না।
একপর্যায়ে অতিরিক্ত কাজের চাপে তিনি চরম ক্লান্ত হয়ে পড়েন। সেই অভিজ্ঞতা থেকেই মহুয়া অন্যদের সতর্ক করে বলেন, পর্যাপ্ত প্রস্তুতি বা সঞ্চয় ছাড়া হঠাৎ চাকরি ছেড়ে নিজের পছন্দের কাজ শুরু করা অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ হতে পারে।
কনটেন্ট ক্রিয়েশন ও উদ্যোক্তা হিসেবে কাজ শুরুর প্রায় পাঁচ বছর পর এখন মহুয়া আর্থিকভাবে স্বাধীন এবং ঋণমুক্ত। নিজের আয়ের একটি অংশ দিয়ে বাবা-মায়ের বাড়ির মর্টগেজ পরিশোধেও সহায়তা করছেন তিনি।
এ ছাড়া নিজের ও পরিবারের ফোন বিল, অ্যাপার্টমেন্টের ইউটিলিটি এবং মাসিক বাজারের খরচও বহন করছেন। তাঁর নিজের একটি গাড়ি রয়েছে। তবে সেটি মায়ের যাতায়াতের সুবিধার জন্য বাবা-মায়ের বাড়িতে রেখে দিয়েছেন। নিজের চলাচলের জন্য তিনি নিউইয়র্কের সাবওয়ে ব্যবহার করতেই বেশি স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করেন।
মহুয়ার মতে, ক্যারিয়ারের শুরুতে যে পরিমাণ পরিশ্রম করতেন, এখন আর তেমন অমানবিক চাপ নিতে হয় না। কাজ ও ব্যক্তিজীবনের মধ্যে একটি ভারসাম্য তৈরি করতে পেরেছেন তিনি।
নিউইয়র্কের জীবনযাত্রার ব্যয় অনেক বেশি হলেও এই শহর ছাড়ার কোনো পরিকল্পনা নেই মহুয়ার। বরং যে শহরে জন্ম ও বেড়ে ওঠা, সেখানেই ভবিষ্যতে নিজের পরিবার গড়ে তোলার স্বপ্ন দেখছেন বাংলাদেশি বংশোদ্ভূত এই তরুণ উদ্যোক্তা।