নিউইয়র্ক সিটিতে চলতি গ্রীষ্মে খুন, গুলির ঘটনা, ডাকাতি ও চুরিসহ বেশ কয়েক ধরনের অপরাধ কমেছে। নিউইয়র্ক পুলিশ বিভাগ (এনওয়াইপিডি) এটিকে সাম্প্রতিক সময়ের অন্যতম নিরাপদ গ্রীষ্ম হিসেবে দেখলেও, একই সময়ে একাধিকবার অপরাধে জড়িতদের সংখ্যা বাড়ায় নতুন করে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। অপরাধ বিশ্লেষকদের কাছে জুন, জুলাই ও আগস্ট বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ। কারণ গ্রীষ্মে রাত পর্যন্ত মানুষের চলাচল, বিভিন্ন […]
ছবি: সংগৃহীত
নিউইয়র্ক সিটিতে চলতি গ্রীষ্মে খুন, গুলির ঘটনা, ডাকাতি ও চুরিসহ বেশ কয়েক ধরনের অপরাধ কমেছে। নিউইয়র্ক পুলিশ বিভাগ (এনওয়াইপিডি) এটিকে সাম্প্রতিক সময়ের অন্যতম নিরাপদ গ্রীষ্ম হিসেবে দেখলেও, একই সময়ে একাধিকবার অপরাধে জড়িতদের সংখ্যা বাড়ায় নতুন করে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে।
অপরাধ বিশ্লেষকদের কাছে জুন, জুলাই ও আগস্ট বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ। কারণ গ্রীষ্মে রাত পর্যন্ত মানুষের চলাচল, বিভিন্ন অনুষ্ঠান ও জমায়েত এবং মদ্যপানের কারণে সাধারণত সহিংস অপরাধ বাড়ার আশঙ্কা থাকে। কিন্তু চলতি বছর নিউইয়র্কে সেই ধরনের ঊর্ধ্বগতি দেখা যায়নি।
এনওয়াইপিডি কমিশনার জেসিকা টিশ শহরের সামগ্রিক অপরাধ পরিস্থিতির উন্নতিকে স্বাগত জানিয়েছেন। তার মতে, নিউইয়র্ক নিক্সের এনবিএ চ্যাম্পিয়নশিপ, বিশ্বকাপ, সেল ২৫০ এবং যুক্তরাষ্ট্রের ২৫০তম স্বাধীনতা দিবসের মতো বড় আয়োজনের মধ্য দিয়েও অপরাধ নিয়ন্ত্রণে রাখা সম্ভব হয়েছে।
এ জন্য পুলিশের গ্রীষ্মকালীন সহিংসতা প্রতিরোধ কর্মসূচিকেও গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে করা হচ্ছে। মে মাসে শুরু হওয়া এ কর্মসূচির আওতায় যেসব সময় ও এলাকায় সহিংসতার ঝুঁকি বেশি, সেখানে অতিরিক্ত পুলিশ মোতায়েন করা হয়।
সিটি ইউনিভার্সিটি অব নিউইয়র্কের জন জে কলেজের অধ্যাপক ও সাবেক এনওয়াইপিডি অপরাধ বিশ্লেষক ক্রিস্টোফার হারম্যান বলেন, পুরো শহরজুড়ে একই সময়ে অপরাধের এত বড় পতন তাকে বিস্মিত করেছে। সাধারণত নির্দিষ্ট কোনো বরো বা এলাকায় অপরাধ কমতে দেখা গেলেও পুরো শহরে একসঙ্গে এমন প্রবণতা তুলনামূলকভাবে বিরল।
ব্রঙ্কসেও অপরাধ কমার প্রবণতা অব্যাহত রয়েছে। আগস্টে ২০২৫ সালের একই মাসের তুলনায় সেখানে খুনের ঘটনা প্রায় ৩৬ শতাংশ এবং গুলির ঘটনা প্রায় ২২ শতাংশ কমেছে। এর আগে ব্রঙ্কসের জননিরাপত্তা পরিস্থিতি মোকাবিলায় আরও ২০০ পুলিশ কর্মকর্তা পাঠানোর পরিকল্পনার কথা জানিয়েছিলেন কমিশনার টিশ।
ব্রুকলিনেও একই চিত্র দেখা গেছে। বরোটির ডিস্ট্রিক্ট অ্যাটর্নি এরিক গনজালেজের দাবি, ব্রুকলিন আবারও রেকর্ড সর্বনিম্ন অপরাধের বছরের দিকে এগোচ্ছে।
২০২৫ সালের জুন, জুলাই ও আগস্টে ব্রুকলিনে মোট ২৮টি হত্যাকাণ্ড ঘটেছিল। চলতি বছরের একই সময়ে সেই সংখ্যা নেমে এসেছে ১৫টিতে।
তবে সব ধরনের অপরাধ কমেনি। ফেলনি অ্যাসল্ট বা গুরুতর শারীরিক হামলার ঘটনা কিছুটা বেড়েছে। আগস্টে এ ধরনের হামলা গত বছরের একই মাসের তুলনায় প্রায় ৩ শতাংশ বেড়ে ২ হাজার ৬৬০টির বেশি হয়েছে। যদিও বছরজুড়ে হিসাব করলে এই অপরাধের সংখ্যা ২০২৫ সালের তুলনায় এখনো ১ শতাংশেরও কম বেশি।
সামগ্রিক অপরাধ কমলেও পুলিশের তথ্য অনুযায়ী, একাধিকবার গুরুতর হামলার অভিযোগে অভিযুক্ত ব্যক্তিদের সংখ্যা উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে।
এনওয়াইপিডির হিসাবে, ২০১৮ সালের একই সময়ের তুলনায় ২০২৬ সালে একই ধরনের অপরাধে তিনবার পুনরায় জড়ানোর অভিযোগ প্রায় তিনগুণ হয়েছে। ফলে অপরাধের সামগ্রিক হার কমলেও একই ব্যক্তিদের বারবার অপরাধে জড়িয়ে পড়ার বিষয়টি আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর জন্য নতুন চ্যালেঞ্জ হয়ে উঠছে।
নিউইয়র্কে হেট ক্রাইম বা বিদ্বেষমূলক অপরাধও বেড়েছে। চলতি বছরের প্রথম আট মাসে গত বছরের একই সময়ের তুলনায় এ ধরনের ঘটনা ১৫ শতাংশের বেশি বৃদ্ধি পেয়েছে।
এনওয়াইপিডির তথ্য অনুযায়ী, নিশ্চিত হওয়া বিদ্বেষমূলক অপরাধের অর্ধেকের বেশি ইহুদিদের বিরুদ্ধে সংঘটিত হয়েছে। অপরাধ বিশ্লেষকদের ধারণা, মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাতের প্রভাব এতে থাকতে পারে। পাশাপাশি মানুষ বিদ্বেষমূলক অপরাধ সম্পর্কে আগের তুলনায় বেশি সচেতন হওয়ায় পুলিশের কাছে রিপোর্ট বাড়ার কারণেও সংখ্যাটি বেড়ে থাকতে পারে।
অপরাধের পরিসংখ্যান কমলেও নিউইয়র্কবাসীর নিরাপত্তাবোধ সবসময় সেই হিসাবের সঙ্গে তাল মিলিয়ে চলে না। বিশেষ করে হঠাৎ ও এলোমেলো হামলার ঘটনা মানুষের মধ্যে দীর্ঘস্থায়ী আতঙ্ক তৈরি করতে পারে।
সম্প্রতি টাইমস স্কয়ারে কর্মস্থল থেকে বের হওয়ার সময় ৩২ বছর বয়সী এরিন পিয়াচেন্তিকে ছুরিকাঘাতে হত্যার ঘটনাটিও তার উদাহরণ। ওই হামলায় আরও একজন আহত হন। পরে পুলিশের সঙ্গে সংঘর্ষের পর সন্দেহভাজন হামলাকারীও নিহত হন।
অপরাধ বিশ্লেষক হারম্যানের মতে, এ ধরনের ঘটনা মানুষকে মনে করিয়ে দেয় যে সামগ্রিক পরিসংখ্যান ইতিবাচক হলেও রাস্তায় আকস্মিক হামলার আশঙ্কা পুরোপুরি দূর হয়নি।
তবে ব্রুকলিনের ডিস্ট্রিক্ট অ্যাটর্নি গনজালেজ বলছেন, মানুষের নিরাপত্তাবোধেও ধীরে ধীরে পরিবর্তন আসছে। অনেক বাসিন্দাই তাকে আগের তুলনায় নিজেদের বেশি নিরাপদ মনে হওয়ার কথা জানিয়েছেন। একই সঙ্গে তারা ধীরে ধীরে অপরাধের সরকারি পরিসংখ্যানের ওপরও আস্থা রাখতে শুরু করেছেন বলে দাবি তার।
বিশেষজ্ঞদের মতে, কোভিড-১৯ মহামারির সময় নিউইয়র্কে অপরাধের যে ঊর্ধ্বগতি দেখা গিয়েছিল, তা এখন অনেকটাই পেছনে পড়ে গেছে। শুধু নিউইয়র্ক নয়, পুরো যুক্তরাষ্ট্রেই চলতি বছর অপরাধের হার কমার প্রবণতা দেখা যাচ্ছে।
ক্রিমিনাল জাস্টিস নীতিবিষয়ক প্রতিষ্ঠান কাউন্সিল অন ক্রিমিনাল জাস্টিসের গবেষণা অনুযায়ী, যুক্তরাষ্ট্র চলতি বছর ১৯০০ সালের পর সবচেয়ে কম হত্যার হারের দিকে এগোচ্ছে।
বিশেষজ্ঞরা এর পেছনে বয়স্ক জনসংখ্যা বৃদ্ধি, তরুণদের বেশি সময় একা বা ফোনে কাটানো, উন্নত পুলিশ প্রযুক্তির ব্যবহার এবং স্থানীয় পর্যায়ে সহিংসতা প্রতিরোধে বাড়তি বিনিয়োগসহ বিভিন্ন কারণকে দায়ী করছেন।
তবে অপরাধ কমার এই প্রবণতা কতদিন স্থায়ী হবে, তা এখনো নিশ্চিত নয়। নিউইয়র্কে অপরাধের হার আরও কতটা কমতে পারে, কোথায় গিয়ে এই পতন থামবে কিংবা ভবিষ্যতে আবার অপরাধ বাড়বে কি না—এসব প্রশ্নের উত্তর খুঁজছেন আইনশৃঙ্খলা বিশ্লেষকরা।