সম্পূর্ণ নিউজ বাংলা-ভয়েজ

বিশ্ব
১:৫১ অপরাহ্ন, ৫ নভেম্বর ২০২৬

জাতিসংঘের প্রতিবেদন / বন্যা ও ভূমিধসে আক্রান্ত ৭৬ কোটি ৫০ লাখ মানুষ, ৯৯ শতাংশই নিম্ন ও মধ্যম আয়ের দেশের

২০২০ থেকে ২০২৫ সাল পর্যন্ত বিশ্বজুড়ে বন্যা ও ভূমিধসে প্রায় ৭৬ কোটি ৫০ লাখ মানুষ আক্রান্ত হয়েছেন। তাঁদের ৯৯ শতাংশই নিম্ন ও মধ্যম আয়ের দেশের বাসিন্দা। জলবায়ু পরিবর্তনের ঝুঁকি মোকাবিলায় উন্নয়নশীল দেশগুলোর প্রস্তুতি, তথ্য সংগ্রহ ও অর্থায়নের ঘাটতি তুলে ধরে জাতিসংঘের পরিবেশ কর্মসূচির (ইউএনইপি) নতুন এক প্রতিবেদনে এ তথ্য জানানো হয়েছে। বুধবার (৪ নভেম্বর) প্রকাশিত […]

বন্যা ও ভূমিধসে আক্রান্ত ৭৬ কোটি ৫০ লাখ মানুষ, ৯৯ শতাংশই নিম্ন ও মধ্যম আয়ের দেশের

ছবি: সংগৃহীত

নিজস্ব প্রতিবেদক
৫ মিনিটে পড়ুন |

২০২০ থেকে ২০২৫ সাল পর্যন্ত বিশ্বজুড়ে বন্যা ও ভূমিধসে প্রায় ৭৬ কোটি ৫০ লাখ মানুষ আক্রান্ত হয়েছেন। তাঁদের ৯৯ শতাংশই নিম্ন ও মধ্যম আয়ের দেশের বাসিন্দা। জলবায়ু পরিবর্তনের ঝুঁকি মোকাবিলায় উন্নয়নশীল দেশগুলোর প্রস্তুতি, তথ্য সংগ্রহ ও অর্থায়নের ঘাটতি তুলে ধরে জাতিসংঘের পরিবেশ কর্মসূচির (ইউএনইপি) নতুন এক প্রতিবেদনে এ তথ্য জানানো হয়েছে।

বুধবার (৪ নভেম্বর) প্রকাশিত ‘অ্যাডাপটেশন গ্যাপ রিপোর্ট ২০২৬: রেডি? নট’ শীর্ষক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব বাড়লেও তা মোকাবিলায় প্রয়োজনীয় অর্থ ও প্রাতিষ্ঠানিক সক্ষমতা গড়ে উঠছে না প্রত্যাশিত গতিতে। বিশেষ করে যেসব দেশ বৈশ্বিক কার্বন নিঃসরণে তুলনামূলক কম অবদান রাখে, সেসব উন্নয়নশীল দেশই জলবায়ুজনিত দুর্যোগের বড় ধাক্কা সামলাচ্ছে।

প্রতিবেদনে বন্যা ও ভূমিধসে আক্রান্ত মানুষের পরিসংখ্যানের পাশাপাশি দুর্যোগের ক্ষয়ক্ষতি নথিভুক্ত করার ক্ষেত্রে দেশগুলোর সক্ষমতার বৈষম্যও তুলে ধরা হয়েছে। ইউএনইপির মতে, তথ্য সংগ্রহ ও পর্যবেক্ষণ ব্যবস্থার দুর্বলতার কারণে প্রকৃত ক্ষয়ক্ষতির অনেকটাই আন্তর্জাতিক হিসাবের বাইরে থেকে যাচ্ছে।

দুর্যোগের ক্ষয়ক্ষতির পূর্ণাঙ্গ হিসাব নেই

প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, চরম তাপপ্রবাহের কারণে বিশ্বজুড়ে প্রায় ২ লাখ ৪০ হাজার মৃত্যুর ঘটনা নথিভুক্ত হয়েছে। এর মধ্যে নিম্ন আয়ের দেশগুলোতে নথিভুক্ত হয়েছে মাত্র ২৭ শতাংশ। দুর্যোগ পর্যবেক্ষণ ও তথ্য সংগ্রহের সীমাবদ্ধতার কারণে অনেক দেশের প্রকৃত প্রাণহানি ও ক্ষয়ক্ষতির চিত্র যথাযথভাবে উঠে আসছে না।

জলবায়ুজনিত ক্ষতির হিসাব কেবল অর্থনৈতিক ক্ষয়ক্ষতির মধ্যে সীমাবদ্ধ রাখার বিষয়েও সতর্ক করেছে প্রতিবেদনটি। দুর্যোগের কারণে মানুষের বাস্তুচ্যুতি, মানসিক স্বাস্থ্য, জীবিকা, সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য, জীববৈচিত্র্য ও প্রাকৃতিক পরিবেশের ক্ষতিও বিবেচনায় নেওয়া প্রয়োজন। এসব ক্ষতি অর্থের অঙ্কে নিরূপণ করা কঠিন হলেও মানুষের জীবন ও সমাজের ওপর দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব ফেলে।

প্রতিবেদনের তথ্য অনুযায়ী, ১১৮টি দেশের ৮৯ শতাংশ তাদের জাতীয় জলবায়ু পরিকল্পনায় ক্ষয়ক্ষতির বিষয়টি উল্লেখ করেছে। তবে মাত্র ৫৪ শতাংশ দেশের এ ধরনের ক্ষতি নথিভুক্ত করার তথ্যব্যবস্থা রয়েছে এবং ৩৮ শতাংশ দেশের রয়েছে সংশ্লিষ্ট আইনি কাঠামো।

বাংলাদেশের জন্য কেন গুরুত্বপূর্ণ

নদী, উপকূল ও মৌসুমি বৃষ্টিনির্ভর জনজীবনের কারণে বাংলাদেশ বন্যা, ঘূর্ণিঝড়, জলোচ্ছ্বাস ও আকস্মিক প্লাবনের মতো দুর্যোগের ঝুঁকিতে রয়েছে। এসব দুর্যোগে ঘরবাড়ি, কৃষিজমি, রাস্তাঘাট ও জীবিকার ক্ষতির পাশাপাশি মানুষকে বাস্তুচ্যুতি, স্বাস্থ্যঝুঁকি এবং শিক্ষা ও কর্মজীবনে দীর্ঘমেয়াদি সমস্যার মুখোমুখি হতে হয়।

ইউএনইপির প্রতিবেদনে বাংলাদেশের জন্য আলাদা কোনো ক্ষয়ক্ষতির পরিসংখ্যান দেওয়া হয়নি। তবে উন্নয়নশীল দেশগুলোর তথ্য সংগ্রহ ও ক্ষয়ক্ষতি মূল্যায়নের যে সীমাবদ্ধতার কথা প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, তা বাংলাদেশের মতো জলবায়ু ঝুঁকিপূর্ণ দেশের জন্যও গুরুত্বপূর্ণ।

বিশেষ করে দুর্যোগের পর মানুষের আয় হারানো, মানসিক চাপ, স্বাস্থ্যগত সমস্যা, শিক্ষার ব্যাঘাত এবং দীর্ঘমেয়াদি বাস্তুচ্যুতির মতো বিষয়গুলো যথাযথভাবে নথিভুক্ত করা জরুরি। এসব তথ্য ছাড়া ক্ষতিগ্রস্ত জনগোষ্ঠীর প্রকৃত প্রয়োজন নির্ধারণ এবং আন্তর্জাতিক সহায়তার দাবি কার্যকরভাবে তুলে ধরা কঠিন।

জলবায়ু অভিযোজনের অর্থায়নে বড় ঘাটতি

প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ২০৩৫ সালের মধ্যে উন্নয়নশীল দেশগুলোর জলবায়ু পরিবর্তনের সঙ্গে খাপ খাইয়ে নিতে বছরে প্রায় ৩০৫ বিলিয়ন মার্কিন ডলার প্রয়োজন হবে। অথচ ২০২৪ সালে উন্নত দেশগুলো থেকে উন্নয়নশীল দেশগুলোর কাছে আন্তর্জাতিক সরকারি অভিযোজন অর্থায়নের পরিমাণ ছিল ২৮ দশমিক ২ থেকে ৩১ দশমিক ৭ বিলিয়ন ডলার। আগের বছরের তুলনায় এই অর্থায়ন বেড়েছে মাত্র ১ বিলিয়ন ডলার।

জলবায়ু অভিযোজন বলতে বন্যা প্রতিরোধী অবকাঠামো নির্মাণ, আগাম সতর্কীকরণ ব্যবস্থা শক্তিশালী করা, খরা সহনশীল কৃষি ও সেচব্যবস্থা গড়ে তোলা এবং উপকূলীয় অঞ্চলকে দুর্যোগের ক্ষতি থেকে সুরক্ষিত করার মতো উদ্যোগকে বোঝায়।

প্রতিবেদনের হিসাব অনুযায়ী, বর্তমান অর্থায়নের প্রবণতা বিবেচনায় নিয়ে ২০৩৫ সালের মধ্যে আন্তর্জাতিক সরকারি অভিযোজন অর্থায়ন তিন গুণ করা হলেও উন্নয়নশীল দেশগুলোর মোট চাহিদার মাত্র ২০ থেকে ২৯ শতাংশ পূরণ হবে। অর্থাৎ অর্থায়ন বাড়ানোর প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়িত হলেও প্রয়োজনের বড় অংশ অপূর্ণ থেকে যাবে।

স্বল্পোন্নত দেশ ও ক্ষুদ্র দ্বীপরাষ্ট্রগুলোর পরিস্থিতিও উদ্বেগজনক। এসব দেশের অভিযোজন অর্থায়নের বার্ষিক চাহিদা তাদের মোট দেশজ উৎপাদনের (জিডিপি) প্রায় ৩ থেকে ৪ শতাংশের সমান। অথচ ২০২৪ সালে স্বল্পোন্নত দেশগুলো ২০২২ সালের তুলনায় ১৬ শতাংশ কম অভিযোজন সহায়তা পেয়েছে।

ক্ষয়ক্ষতি মোকাবিলার তহবিলেও অপ্রতুল অর্থ

জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে যেসব ক্ষতি এড়ানো সম্ভব নয়, সেগুলো মোকাবিলায় গঠিত ‘ফান্ড ফর রেসপন্ডিং টু লস অ্যান্ড ড্যামেজ’-এ অর্থের চাহিদা ও বরাদ্দের মধ্যে বড় ব্যবধান রয়েছে।

প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, তহবিলটির প্রথম দফায় ১১৯টি উন্নয়নশীল দেশ মোট ২ দশমিক ৮ বিলিয়ন ডলারের সহায়তা চেয়েছে। কিন্তু প্রাথমিকভাবে বরাদ্দের জন্য ছিল মাত্র ৩৪২ মিলিয়ন ডলার। অর্থাৎ আবেদন করা অর্থের তুলনায় প্রাথমিক তহবিলের পরিমাণ অনেক কম।

ইউএনইপি বলছে, এই ব্যবধান জলবায়ুজনিত ক্ষয়ক্ষতি মোকাবিলায় অর্থের বড় চাহিদার ইঙ্গিত দেয়। তবে এই আবেদনগুলোর পরিসংখ্যান দিয়ে বিশ্বজুড়ে ক্ষয়ক্ষতি মোকাবিলার মোট অর্থের ঘাটতি নির্দিষ্টভাবে নির্ধারণ করা যায় না।

কী পদক্ষেপের সুপারিশ

জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব মোকাবিলায় ইউএনইপি ক্ষয়ক্ষতি মূল্যায়নের সক্ষমতা বাড়ানো, নির্ভরযোগ্য তথ্য সংগ্রহ এবং ক্ষতিগ্রস্ত জনগোষ্ঠীর অংশগ্রহণ নিশ্চিত করার ওপর গুরুত্ব দিয়েছে।

প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, উন্নয়নশীল দেশগুলোর জন্য পর্যাপ্ত ও পূর্বানুমানযোগ্য আর্থিক ও কারিগরি সহায়তা নিশ্চিত করতে হবে। একই সঙ্গে জলবায়ু তহবিলের অর্থ পেতে আবেদন ও অনুমোদনের জটিলতা কমানো প্রয়োজন, যাতে সহায়তা দ্রুত ক্ষতিগ্রস্ত মানুষের কাছে পৌঁছায়।

এ ছাড়া জলবায়ু অভিযোজনের অর্থায়নে ঋণের ওপর অতিরিক্ত নির্ভরতা কমিয়ে অনুদান ও সহজ শর্তের অর্থায়ন বাড়ানোর বিষয়টিও গুরুত্বপূর্ণ। কারণ, জলবায়ু দুর্যোগে ক্ষতিগ্রস্ত দরিদ্র দেশগুলোর ওপর নতুন ঋণের বোঝা চাপলে তাদের অর্থনৈতিক সংকট আরও বাড়তে পারে।

প্রতিবেদনটি এমন এক সময়ে প্রকাশিত হলো, যখন আগামী ৯ থেকে ২০ নভেম্বর তুরস্কের আনতালিয়ায় জাতিসংঘের জলবায়ু সম্মেলন কপ-৩১ অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা। সম্মেলনে জলবায়ু অভিযোজনের অর্থায়ন বাড়ানো, ক্ষয়ক্ষতি মোকাবিলায় সহায়তা নিশ্চিত করা এবং উন্নয়নশীল দেশগুলোর সক্ষমতা বৃদ্ধির বিষয়গুলো গুরুত্ব পেতে পারে।

ইউএনইপির প্রতিবেদনের মূল বার্তা হলো, জলবায়ু পরিবর্তনের ঝুঁকি বাড়ার সঙ্গে তাল মিলিয়ে অভিযোজনের প্রস্তুতি ও অর্থায়ন বাড়ছে না। ফলে সবচেয়ে বেশি ঝুঁকিতে থাকা দেশগুলোর মানুষের দুর্যোগ মোকাবিলার সক্ষমতা বাড়াতে আন্তর্জাতিক সহায়তা আরও কার্যকর ও সহজলভ্য করা জরুরি।

Facebook Comments Box
Advertise with us
এ বিভাগের আরও খবর


আর্কাইভ ক্যালেণ্ডার
Su Mo Tu We Th Fr Sa
Advertise with us
আরও বাংলা-ভয়েজ সংবাদ