ভারতের প্রধান নির্বাচন কমিশনার জ্ঞানেশ কুমারের পদত্যাগের দাবিতে জেন-জি নেতৃত্বাধীন ককরোচ জনতা পার্টি (সিজেপি) ও বিরোধী দলগুলোর চলমান বিক্ষোভে দেশটির রাজনৈতিক পরিস্থিতি উত্তপ্ত হয়ে উঠেছে। এই আন্দোলনের প্রেক্ষাপটে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির নেতৃত্বাধীন সরকারকে অস্থিতিশীল করতে যুক্তরাষ্ট্রসহ বিদেশি শক্তি ষড়যন্ত্র করছে বলে অভিযোগ তুলছেন ক্ষমতাসীন দলের নেতারা ও সরকারঘনিষ্ঠ বিশ্লেষকেরা। ভারতের ক্ষমতাসীন দল ভারতীয় জনতা পার্টির […]
ছবি: সংগৃহীত
ভারতের প্রধান নির্বাচন কমিশনার জ্ঞানেশ কুমারের পদত্যাগের দাবিতে জেন-জি নেতৃত্বাধীন ককরোচ জনতা পার্টি (সিজেপি) ও বিরোধী দলগুলোর চলমান বিক্ষোভে দেশটির রাজনৈতিক পরিস্থিতি উত্তপ্ত হয়ে উঠেছে। এই আন্দোলনের প্রেক্ষাপটে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির নেতৃত্বাধীন সরকারকে অস্থিতিশীল করতে যুক্তরাষ্ট্রসহ বিদেশি শক্তি ষড়যন্ত্র করছে বলে অভিযোগ তুলছেন ক্ষমতাসীন দলের নেতারা ও সরকারঘনিষ্ঠ বিশ্লেষকেরা।
ভারতের ক্ষমতাসীন দল ভারতীয় জনতা পার্টির (বিজেপি) নেতাদের দাবি, দেশের অভ্যন্তরীণ আন্দোলনের পেছনে বিদেশি শক্তির ইন্ধন রয়েছে। কেন্দ্রীয় মন্ত্রী সুকান্ত মজুমদার আন্দোলনটিকে ‘দেশকে অস্থিতিশীল করার চেষ্টা’ বলে বর্ণনা করেছেন। একই সুরে বিজেপি সভাপতি নিতিন নবীন অভিযোগ করেছেন, আন্দোলনটি ‘বিদেশি শক্তির নির্দেশে’ পরিচালিত হচ্ছে।
ভারতীয় গোয়েন্দা সংস্থাগুলো পাকিস্তানসহ বিভিন্ন দেশের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট সন্দেহভাজন সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের প্রোফাইল এবং সিজেপিকে সম্ভাব্য আর্থিক সহায়তার বিষয়টি খতিয়ে দেখছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। আন্দোলনকারীদের সঙ্গে মার্কিন দূতাবাসের কর্মকর্তা ও মার্কিন বিশেষজ্ঞদের যোগাযোগ ছিল কি না, কিংবা যুক্তরাষ্ট্রের কোনো ফাউন্ডেশন ভারতীয় বেসরকারি সংস্থাগুলোকে অর্থায়ন করেছে কি না, তা নিয়েও তদন্ত চলছে।
তবে এসব অভিযোগের পক্ষে এখন পর্যন্ত আনুষ্ঠানিকভাবে কোনো প্রমাণ প্রকাশ করা হয়নি।
বিদেশি হস্তক্ষেপের অভিযোগের তির মূলত যুক্তরাষ্ট্রের কথিত ‘ডিপ স্টেট’, মার্কিন সাহায্য সংস্থা ইউএসএআইডি এবং ন্যাশনাল এন্ডাওমেন্ট ফর ডেমোক্রেসি (এনইডি)-এর দিকে।
এ ছাড়া ধনকুবের জর্জ সোরোসের ওপেন সোসাইটি ফাউন্ডেশনসের বিরুদ্ধেও অভিযোগ করা হচ্ছে। বিজেপি-ঘনিষ্ঠ মহলের দাবি, মোদি সরকারের সমালোচনা জোরদার করা এবং ভারতের রাজনৈতিক পরিস্থিতিতে পরিবর্তন আনতে বিভিন্ন বেসরকারি সংস্থা ও গণমাধ্যমকে অর্থায়ন করা হচ্ছে।
গত ২৫ বছরে কোটি কোটি ডলার অনুদান দেওয়া মার্কিন সাহায্য সংস্থাগুলো অবশ্য এ ধরনের অভিযোগ অস্বীকার করে আসছে। ২০২৫ সালে যুক্তরাষ্ট্রের ন্যাশনাল ইন্টেলিজেন্সের পরিচালক তুলসি গ্যাবার্ডও স্পষ্টভাবে জানিয়েছিলেন, মার্কিন গোয়েন্দা সংস্থাগুলো ভারতে সরকার পরিবর্তনের কোনো প্রক্রিয়ার সঙ্গে যুক্ত নয়।
ভারতে বিদেশি প্রভাব বিস্তারের অভিযোগ নতুন নয়। এর ঐতিহাসিক শিকড়ও রয়েছে।
সাবেক মার্কিন রাষ্ট্রদূত ড্যানিয়েল প্যাট্রিক ময়েনিহান তাঁর ১৯৭৮ সালের স্মৃতিকথায় লিখেছিলেন, ষাটের দশকে কেরালা ও পশ্চিমবঙ্গে কমিউনিস্ট প্রভাব ঠেকাতে যুক্তরাষ্ট্র দুই দফায় কংগ্রেস দলকে আর্থিক সহায়তা দিয়েছিল। এমনকি একটি অর্থপ্রদান তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধীর হাতেও করা হয়েছিল বলে তিনি দাবি করেন।
তবে ইন্দিরা গান্ধী এই অভিযোগকে ‘উদ্দেশ্যপ্রণোদিত ও সম্পূর্ণ ভিত্তিহীন’ বলে প্রত্যাখ্যান করেছিলেন।
এ ছাড়া ১৯৫৯ সালে কেরালায় গণতান্ত্রিকভাবে নির্বাচিত প্রথম কমিউনিস্ট সরকারকে ক্ষমতাচ্যুত করার পেছনেও মার্কিন কেন্দ্রীয় গোয়েন্দা সংস্থা সিআইএর ভূমিকা ছিল বলে দীর্ঘদিন ধরে অভিযোগ রয়েছে।
ভারতে সরকারবিরোধী আন্দোলন কিংবা মানবাধিকার কার্যক্রমকে বিদেশি অর্থায়নের সঙ্গে যুক্ত করা দীর্ঘদিন ধরে রাজনৈতিক বিতর্কের অংশ। গত ১২ বছরে নরেন্দ্র মোদি সরকার বিদেশি অনুদান নিয়ন্ত্রণ আইন (এফসিআরএ) কঠোরভাবে প্রয়োগ করে বহু বেসরকারি সংস্থার নিবন্ধন বাতিল করেছে।
সরকারের সমালোচকেরা এসব পদক্ষেপ নিয়ে প্রশ্ন তুললেও বিদেশি অর্থায়ন, রাজনৈতিক অভিযোগ এবং সরকার উৎখাতের সুসংগঠিত ষড়যন্ত্র—এই তিনটি বিষয়কে এক করে দেখার সুযোগ নেই বলে মনে করেন রাজনৈতিক বিশ্লেষকেরা।
তাঁদের মতে, বিদেশি অর্থায়ন বা কোনো দেশের সঙ্গে যোগাযোগ থাকার অভিযোগ থেকেই সরকারবিরোধী আন্দোলনের পেছনে বিদেশি শক্তির সরাসরি ভূমিকা প্রমাণিত হয় না। বর্তমান আন্দোলনের ক্ষেত্রেও যুক্তরাষ্ট্র সরাসরি ইন্ধন জুগিয়েছে—এমন কোনো সুনির্দিষ্ট প্রমাণ এখনো প্রকাশ্যে আসেনি।
সূত্র: উইয়ন নিউজ