সম্পূর্ণ নিউজ বাংলা-ভয়েজ

উত্তর আমেরিকা
৪:১২ অপরাহ্ন, ১৪ অক্টোবর ২০২৬

যুক্তরাষ্ট্রে ব্যাংক অব আমেরিকাকে ১২১ কোটি ডলারের বেশি জরিমানা

অর্থপাচার প্রতিরোধে ব্যর্থতা এবং আন্তর্জাতিক নিষেধাজ্ঞা লঙ্ঘনের অভিযোগে যুক্তরাষ্ট্রের দ্বিতীয় বৃহত্তম ব্যাংক ব্যাংক অব আমেরিকাকে ১২১ কোটি ডলারের বেশি জরিমানা করেছে দেশটির ট্রেজারি বিভাগ। সন্দেহজনক আর্থিক লেনদেন শনাক্ত ও কর্তৃপক্ষকে জানাতে ব্যর্থ হওয়া এবং অর্থপাচার প্রতিরোধের কার্যক্রমে গুরুতর ঘাটতির কারণে এ পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে। স্থানীয় সময় মঙ্গলবার (১৩ অক্টোবর) ঘোষিত এ ব্যবস্থায় ট্রেজারি বিভাগের আর্থিক […]

যুক্তরাষ্ট্রে ব্যাংক অব আমেরিকাকে ১২১ কোটি ডলারের বেশি জরিমানা

ছবি: সংগৃহীত

নিজস্ব প্রতিবেদক
৫ মিনিটে পড়ুন |

অর্থপাচার প্রতিরোধে ব্যর্থতা এবং আন্তর্জাতিক নিষেধাজ্ঞা লঙ্ঘনের অভিযোগে যুক্তরাষ্ট্রের দ্বিতীয় বৃহত্তম ব্যাংক ব্যাংক অব আমেরিকাকে ১২১ কোটি ডলারের বেশি জরিমানা করেছে দেশটির ট্রেজারি বিভাগ। সন্দেহজনক আর্থিক লেনদেন শনাক্ত ও কর্তৃপক্ষকে জানাতে ব্যর্থ হওয়া এবং অর্থপাচার প্রতিরোধের কার্যক্রমে গুরুতর ঘাটতির কারণে এ পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে।

স্থানীয় সময় মঙ্গলবার (১৩ অক্টোবর) ঘোষিত এ ব্যবস্থায় ট্রেজারি বিভাগের আর্থিক অপরাধ দমন নেটওয়ার্ক (ফিনসেন) ১২০ কোটি ডলারের জরিমানা নির্ধারণ করেছে। এ ছাড়া মুদ্রা নিয়ন্ত্রকের দপ্তর (ওসিসি) ব্যাংকটির দুর্বল অর্থপাচার প্রতিরোধ কর্মসূচির জন্য ৭৫ কোটি ডলারের দেওয়ানি জরিমানা করেছে। এটি ওসিসির ইতিহাসে কোনো ব্যাংকের বিরুদ্ধে আরোপ করা সর্বোচ্চ জরিমানা। পাশাপাশি নিষেধাজ্ঞা লঙ্ঘনের সম্ভাব্য ৪৭৫টি ঘটনার নিষ্পত্তিতে ১ কোটি ১৬ লাখ ডলারের বেশি অর্থ দিতে সম্মত হয়েছে ব্যাংকটি।

মার্কিন ট্রেজারি বিভাগ ও বার্তা সংস্থা অ্যাসোসিয়েটেড প্রেসের প্রতিবেদনে এসব তথ্য জানানো হয়েছে।

৫০০ কোটি ডলারের বেশি সন্দেহজনক লেনদেনের তথ্য প্রকাশে ব্যর্থতা

ট্রেজারি বিভাগের অভিযোগ, ব্যাংক অব আমেরিকা ৫০০ কোটি ডলারের বেশি সন্দেহজনক লেনদেনের তথ্য যথাসময়ে ফিনসেনকে জানাতে ব্যর্থ হয়েছে। এর মধ্যে ১০০ কোটি ডলারের বেশি লেনদেন জাতীয় নিরাপত্তা ও অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ অবৈধ অর্থায়নের ঝুঁকির সঙ্গে সম্পর্কিত ছিল।

এসব ঝুঁকির মধ্যে ছিল চীনা অর্থপাচারকারী নেটওয়ার্ক, প্রতারণা এবং যুক্তরাষ্ট্রের দক্ষিণ-পশ্চিম সীমান্তকেন্দ্রিক সম্ভাব্য বাণিজ্যভিত্তিক অর্থপাচার। মার্কিন কর্তৃপক্ষের মতে, ব্যাংকটির অভ্যন্তরীণ নজরদারি ও সন্দেহজনক লেনদেন শনাক্তের ব্যবস্থায় উল্লেখযোগ্য দুর্বলতা ছিল।

ট্রেজারি বিভাগের তদন্তে আরও বলা হয়েছে, সন্দেহজনক লেনদেন শনাক্ত করা এবং সেগুলো নিয়ে তদন্তের জন্য প্রয়োজনীয় প্রতিবেদন জমা দেওয়ার ক্ষেত্রে ব্যাংকটি দীর্ঘদিন ধরে সমস্যায় ভুগছিল। কিছু ক্ষেত্রে সন্দেহজনক কার্যক্রমের তথ্য দীর্ঘ সময় ধরে তদন্ত ছাড়াই জমে ছিল। ফলে কর্তৃপক্ষের কাছে দেরিতে প্রতিবেদন পৌঁছেছে, যা আইন প্রয়োগকারী সংস্থার জন্য কম কার্যকর ছিল।

কর্তৃপক্ষের অভিযোগ, নিজস্ব স্বয়ংক্রিয় নজরদারি ব্যবস্থা কার্যকরভাবে ব্যবহার না করে ব্যাংকটি আইন প্রয়োগকারী সংস্থা ও অন্যান্য আর্থিক প্রতিষ্ঠানের কাছ থেকে আসা তথ্যের ওপর অতিরিক্ত নির্ভর করেছে। এতে সম্ভাব্য অর্থপাচারের ঘটনা শনাক্ত ও রিপোর্ট করার দায়িত্বের একটি বড় অংশ কার্যত তৃতীয় পক্ষের ওপর ছেড়ে দেওয়া হয়েছিল।

অর্থপাচার প্রতিরোধ কর্মসূচিতে গুরুতর ঘাটতি

মার্কিন মুদ্রা নিয়ন্ত্রকের দপ্তর ওসিসি জানিয়েছে, ব্যাংক অব আমেরিকার অর্থপাচার প্রতিরোধ কর্মসূচি ছিল অপর্যাপ্ত ও অকার্যকর। ব্যাংকটির লেনদেন পর্যবেক্ষণব্যবস্থা বিপুল পরিমাণ আর্থিক লেনদেন যথাযথভাবে যাচাই করতে পারেনি। এর ফলে কোটি কোটি ডলারের লেনদেনসংক্রান্ত বহু সন্দেহজনক কার্যক্রমের প্রতিবেদন দেরিতে জমা পড়ে।

ওসিসির ভাষ্য অনুযায়ী, ব্যাংকটির ব্যবস্থাপনা বছরের পর বছর ধরে সম্ভাব্য সন্দেহজনক লেনদেন তদন্তের জন্য যথাযথ কর্তৃপক্ষের কাছে পাঠাতে ব্যর্থ হওয়ার বিষয়টি জানত। কিন্তু এ সমস্যা সমাধানে কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া হয়নি।

এ ছাড়া অর্থপাচার প্রতিরোধ কর্মসূচির দায়িত্বে থাকা কিছু কর্মকর্তা ও কর্মীর প্রয়োজনীয় দক্ষতা ও প্রশিক্ষণের ঘাটতি ছিল। অভ্যন্তরীণ নিরীক্ষাব্যবস্থাও দীর্ঘদিনের সমস্যাগুলো যথাযথভাবে শনাক্ত করতে পারেনি।

এর আগে ২০২৪ সালের ডিসেম্বরে ওসিসি ব্যাংকটিকে অর্থপাচার প্রতিরোধ কর্মসূচির ঘাটতি দূর করার নির্দেশ দিয়েছিল। কিন্তু পরবর্তী সময়েও গুরুত্বপূর্ণ দুর্বলতাগুলো রয়ে গেছে বলে নিয়ন্ত্রক সংস্থাটি জানিয়েছে। এ কারণে ব্যাংকটির বিরুদ্ধে রেকর্ড ৭৫ কোটি ডলারের দেওয়ানি জরিমানা আরোপ করা হয়।

ইরান, রাশিয়াসহ বিভিন্ন নিষেধাজ্ঞা কর্মসূচি লঙ্ঘনের অভিযোগ

যুক্তরাষ্ট্রের ট্রেজারি বিভাগের বিদেশি সম্পদ নিয়ন্ত্রণ দপ্তর (ওএফএসি) জানিয়েছে, ব্যাংক অব আমেরিকার বিরুদ্ধে বিভিন্ন আন্তর্জাতিক নিষেধাজ্ঞা কর্মসূচির সম্ভাব্য ৪৭৫টি লঙ্ঘনের অভিযোগ রয়েছে। এসব অভিযোগ নিষ্পত্তিতে ব্যাংকটি ১ কোটি ১৬ লাখ ৬২ হাজার ৯৩০ ডলার দিতে সম্মত হয়েছে।

অভিযোগগুলোর মধ্যে রাশিয়া, বেলারুশ, ইরান, মিয়ানমার, সোমালিয়া, মাদক পাচার এবং আন্তর্জাতিক সন্ত্রাসবাদ সংশ্লিষ্ট নিষেধাজ্ঞা কর্মসূচির সম্ভাব্য লঙ্ঘন রয়েছে।

ওএফএসি বলেছে, কিছু ক্ষেত্রে ব্যাংকটি নিষেধাজ্ঞার আওতাভুক্ত ব্যাংকের মাধ্যমে লেনদেন প্রক্রিয়াকরণ করেছে। আবার নিষেধাজ্ঞার তালিকায় থাকা ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে নাম ও জন্মতারিখের মিল থাকা গ্রাহকদের বিষয়ে সতর্কসংকেত যথাযথ গুরুত্ব দিয়ে পর্যালোচনা করা হয়নি। নিষেধাজ্ঞার তালিকা হালনাগাদ করতে বিলম্ব এবং নিষেধাজ্ঞার আওতাভুক্ত ব্যক্তিদের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট দুটি ব্যবসায়িক হিসাব ব্যবস্থাপনায় মানবিক ভুলের ঘটনাও চিহ্নিত করা হয়েছে।

এসব ক্ষেত্রে যুক্তরাষ্ট্রের নিষেধাজ্ঞা কর্মসূচি লঙ্ঘিত হয়ে থাকতে পারে বলে মনে করছে সংস্থাটি। তবে অভিযোগগুলোকে সম্ভাব্য লঙ্ঘন হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে; সব ঘটনাকে আদালতে প্রমাণিত অপরাধ হিসেবে বিবেচনা করা যাবে না।

সমঝোতার অংশ হিসেবে ব্যাংকটি কর্মীদের প্রশিক্ষণ, নিয়মিত পরীক্ষা ও নিরীক্ষা এবং ভবিষ্যতে ওএফএসির সঙ্গে যোগাযোগ ও সহযোগিতা জোরদারের প্রতিশ্রুতি দিয়েছে।

‘বড় আর্থিক প্রতিষ্ঠানও আইনের ঊর্ধ্বে নয়’

মার্কিন ট্রেজারি সচিব স্কট বেসেন্ট বলেন, বড় কোনো ব্যাংক অর্থপাচার প্রতিরোধ ও নিষেধাজ্ঞা মেনে চলার দায়িত্ব পালনে ব্যর্থ হলে এর প্রভাব শুধু ওই প্রতিষ্ঠানের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকে না। এতে পুরো মার্কিন আর্থিক ব্যবস্থা অবৈধ অর্থায়নের ঝুঁকিতে পড়ে।

তিনি আরও বলেন, এই পদক্ষেপের মাধ্যমে স্পষ্ট বার্তা দেওয়া হয়েছে যে বড় আর্থিক প্রতিষ্ঠানও আইনের ঊর্ধ্বে নয়।

ট্রেজারি বিভাগের তথ্য অনুযায়ী, ফিনসেনের ১২০ কোটি ডলারের জরিমানার মধ্যে ওসিসির নির্ধারিত ৭৫ কোটি ডলারের অর্থ সমন্বয়ের ব্যবস্থা রয়েছে। ফলে দুই সংস্থার ঘোষিত অঙ্ক সরাসরি যোগ করে মোট জরিমানা হিসাব করলে একই অর্থ একাধিকবার গণনা হতে পারে। এ ছাড়া ওএফএসি পৃথকভাবে নিষেধাজ্ঞা লঙ্ঘনের অভিযোগ নিষ্পত্তিতে অর্থ আদায়ের সমঝোতা করেছে।

ট্রেজারি বিভাগের হিসাবে, ব্যাংক অব আমেরিকার বিরুদ্ধে এই ব্যবস্থা সংস্থাটির ইতিহাসে তৃতীয় বৃহত্তম আর্থিক জরিমানা।

ব্যাংক অব আমেরিকার প্রতিক্রিয়া

জরিমানার বিষয়ে ব্যাংক অব আমেরিকা জানিয়েছে, আর্থিক অপরাধ প্রতিরোধ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ এবং এ ক্ষেত্রে যথাযথভাবে দায়িত্ব পালন করা তাদের কর্তব্য।

ব্যাংকটির বিবৃতিতে বলা হয়েছে, আর্থিক অপরাধ মোকাবিলায় প্রযুক্তি খাতে কয়েক বিলিয়ন ডলার বিনিয়োগ করা হয়েছে এবং এ কাজে হাজার হাজার কর্মী নিয়োজিত রয়েছেন। নিয়ন্ত্রক সংস্থাগুলোর চিহ্নিত সমস্যাগুলো সমাধানে কাজ অনেক দূর এগিয়েছে বলেও দাবি করেছে প্রতিষ্ঠানটি।

ব্যাংকটি আরও জানিয়েছে, সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের সঙ্গে কাজ করে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপগুলো সম্পন্ন করতে তারা প্রতিশ্রুতিবদ্ধ।

সন্দেহজনক লেনদেনের পুনর্মূল্যায়ন করতে হবে

ট্রেজারি বিভাগের নির্দেশনা অনুযায়ী, শনাক্ত না হওয়া সন্দেহজনক লেনদেনগুলো পুনরায় পর্যালোচনা করতে একটি স্বাধীন তৃতীয় পক্ষের সঙ্গে কাজ করতে হবে ব্যাংক অব আমেরিকাকে। আগে যেসব লেনদেন যথাযথভাবে শনাক্ত বা রিপোর্ট করা হয়নি, সেগুলো চিহ্নিত করে ফিনসেনকে জানানোর ব্যবস্থাও করতে হবে।

এ ছাড়া সন্দেহজনক লেনদেন পর্যবেক্ষণ, গ্রাহকের পরিচয় ও আর্থিক কার্যক্রম যাচাই এবং বিদেশি আর্থিক প্রতিষ্ঠানের হিসাবসংক্রান্ত যথাযথ সতর্কতামূলক প্রক্রিয়ার কার্যকারিতা স্বাধীনভাবে পর্যালোচনা করতে হবে।

যুক্তরাষ্ট্রের কর্তৃপক্ষের মতে, বড় আর্থিক প্রতিষ্ঠানের কার্যকর অর্থপাচার প্রতিরোধব্যবস্থা জাতীয় নিরাপত্তা ও আর্থিক স্থিতিশীলতা রক্ষার জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। ব্যাংক অব আমেরিকার বিরুদ্ধে নেওয়া এ পদক্ষেপের মধ্য দিয়ে সন্দেহজনক লেনদেন যথাসময়ে শনাক্ত, তদন্ত ও রিপোর্ট করার বাধ্যবাধকতা কঠোরভাবে পালনের বার্তা দেওয়া হয়েছে।

Facebook Comments Box
Advertise with us
এ বিভাগের আরও খবর


আর্কাইভ ক্যালেণ্ডার
Su Mo Tu We Th Fr Sa
Advertise with us
আরও বাংলা-ভয়েজ সংবাদ