ইরান-সমর্থিত হুথি বিদ্রোহীদের ধারাবাহিক ও প্রাণঘাতী হামলার মুখে পড়েছে সৌদি আরব। গত শনিবার রিয়াদের কিং খালিদ আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে ভয়াবহ এক হামলায় ১২ জন নিহত এবং ৩০০ জনের বেশি আহত হয়েছেন। এক দশকেরও বেশি সময়ের মধ্যে বিশ্বের শীর্ষ তেল রপ্তানিকারক দেশটির প্রধান বিমানবন্দরে এটিই সবচেয়ে বড় ও প্রাণঘাতী হামলার ঘটনা। পরিস্থিতির গুরুত্ব বিবেচনায় বিদেশি কূটনৈতিক মিশনগুলোও […]
ছবি: সংগৃহীত
ইরান-সমর্থিত হুথি বিদ্রোহীদের ধারাবাহিক ও প্রাণঘাতী হামলার মুখে পড়েছে সৌদি আরব। গত শনিবার রিয়াদের কিং খালিদ আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে ভয়াবহ এক হামলায় ১২ জন নিহত এবং ৩০০ জনের বেশি আহত হয়েছেন। এক দশকেরও বেশি সময়ের মধ্যে বিশ্বের শীর্ষ তেল রপ্তানিকারক দেশটির প্রধান বিমানবন্দরে এটিই সবচেয়ে বড় ও প্রাণঘাতী হামলার ঘটনা। পরিস্থিতির গুরুত্ব বিবেচনায় বিদেশি কূটনৈতিক মিশনগুলোও তাদের নাগরিকদের বিমানবন্দরটি এড়িয়ে চলার পরামর্শ দিয়েছে।
বিশাল সামরিক বাজেট এবং অত্যাধুনিক অস্ত্রশস্ত্র থাকা সত্ত্বেও হুথিদের হামলা ঠেকাতে সৌদি আরবের এই হিমশিম খাওয়া দেশটির প্রতিরক্ষাব্যবস্থার দুর্বলতা সামনে এনেছে। একই সঙ্গে তেলের ওপর নির্ভরতা কমিয়ে অর্থনীতিকে বহুমুখী করার লক্ষ্যে সৌদি যুবরাজ মোহাম্মদ বিন সালমান রিয়াদকে বিনিয়োগ ও ব্যবসার নিরাপদ গন্তব্য হিসেবে গড়ে তোলার যে চেষ্টা করছেন, সেই পরিকল্পনার নিরাপত্তা ও স্থিতিশীলতার ভাবমূর্তিও প্রশ্নের মুখে পড়েছে।
চলতি বছরের শুরুর দিকে ইরান-সমর্থিত হুথি বিদ্রোহী ও সৌদি-সমর্থিত ইয়েমেন সরকারের মধ্যকার যুদ্ধবিরতি ভেঙে যাওয়ার পর উত্তেজনা বাড়তে থাকে। রিয়াদ ইয়েমেনে সামরিক তৎপরতা জোরদার করলে পরিস্থিতি আরও জটিল হয়ে ওঠে।
ইয়েমেনের প্রায় এক-তৃতীয়াংশ ভূখণ্ড হুথিদের নিয়ন্ত্রণে রয়েছে। ওই এলাকায় দেশটির মোট জনসংখ্যার ৭০ থেকে ৮০ শতাংশ বসবাস করেন। গত মাসে লোহিত সাগর উপকূলের কয়েকটি কৌশলগত এলাকা দখলে নেওয়ার পর হুথিদের বিরুদ্ধে বিমান হামলা চালায় সৌদি আরব এবং ইয়েমেনের সরকারি বাহিনীর পাল্টা অভিযানেও সমর্থন দেয়।
এর জবাবে হুথিরা সৌদি আরবের গুরুত্বপূর্ণ তেল স্থাপনা ও পর্যটন অবকাঠামোকে লক্ষ্যবস্তু করতে শুরু করেছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
বিশ্বের অন্যতম সুসজ্জিত সামরিক বাহিনী রয়েছে সৌদি আরবের। ২০২৫ সালে দেশটি মোট দেশজ উৎপাদনের (জিডিপি) ৬ দশমিক ৫ শতাংশ, অর্থাৎ প্রায় ৮৩ বিলিয়ন ডলার প্রতিরক্ষা খাতে ব্যয় করেছে। সামরিক ব্যয়ের হিসাবে বিশ্বে দেশটির অবস্থান অষ্টম।
সম্প্রতি তুরস্ক ও পাকিস্তানের সঙ্গে প্রতিরক্ষা চুক্তি করলেও নিজস্ব সামরিক সরঞ্জাম উৎপাদনে সৌদি আরবের সক্ষমতা সীমিত। ফলে আধুনিক অস্ত্রের জন্য দেশটি মূলত যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য ও ফ্রান্সের মতো পশ্চিমা নির্মাতাদের ওপর নির্ভরশীল।
সৌদি সামরিক বাহিনীর বহরে রয়েছে এফ-১৫ ইগল ও ইউরোফাইটার টাইফুন যুদ্ধবিমান। এ ছাড়া আকাশ প্রতিরক্ষায় ব্যবহৃত হয় প্যাট্রিয়ট ও টার্মিনাল হাই অল্টিটিউড এরিয়া ডিফেন্স (থাড) ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিরক্ষাব্যবস্থা।
অন্যদিকে, ২০১৪ সালে ইয়েমেনের রাজধানী সানা দখলের পর থেকে নিজেদের অস্ত্রভান্ডার ও সামরিক সক্ষমতা উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়িয়েছে হুথিরা। তাদের ড্রোন ও ক্ষেপণাস্ত্র ইয়েমেন থেকে প্রায় দুই হাজার কিলোমিটার দূরের ইসরায়েলেও আঘাত হানতে সক্ষম।
আকাশ প্রতিরক্ষাব্যবস্থাকে বিভ্রান্ত করতে তারা ভিন্ন গতি ও বৈশিষ্ট্যের ড্রোন এবং ক্ষেপণাস্ত্র একসঙ্গে ব্যবহার করে। তাদের অস্ত্রভান্ডারে মাঝারি পাল্লার হাইপারসনিক সক্ষমতার ‘প্যালেস্টাইন-২’, ইরানের কদর ক্ষেপণাস্ত্রের উন্নত সংস্করণ ‘তুফান’ এবং ‘বোরকান’ ও ‘বদর’ সিরিজের স্বল্পপাল্লার ক্ষেপণাস্ত্র রয়েছে।
প্রতিরক্ষা খাতে বিপুল অর্থ ব্যয় করেও হুথিদের হামলা পুরোপুরি ঠেকাতে পারছে না সৌদি আরব। বিশেষজ্ঞদের মতে, দেশটির বিশাল ভৌগোলিক আয়তন এই ব্যর্থতার অন্যতম প্রধান কারণ।
অটোয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের নিরাপত্তা বিশ্লেষক থমাস জুনো বলেন, সৌদি আরবের আকাশ প্রতিরক্ষাব্যবস্থা হুথিদের কিছু হামলা প্রতিহত করতে সক্ষম হলেও দেশটির বিশাল আয়তনের কারণে সর্বত্র ধারাবাহিকভাবে নিরাপত্তা নিশ্চিত করা কঠিন।
প্রায় ২২ লাখ ২০ হাজার বর্গকিলোমিটার আয়তনের সৌদি আরবে রাজধানী রিয়াদ, বিমানবন্দর, তেল স্থাপনা, সামরিক ঘাঁটি ও ধর্মীয় পবিত্র শহরগুলোকে সুরক্ষা দিতে হয়। শুধু প্যাট্রিয়ট বা থাডের মতো প্রতিরক্ষাব্যবস্থা দিয়ে এত বড় এলাকার নিরাপত্তা নিশ্চিত করা সম্ভব নয়।
লন্ডনভিত্তিক ঝুঁকি বিশ্লেষণকারী প্রতিষ্ঠান মেনা অ্যানালিটিকার অ্যান্ড্রেয়াস ক্রিগ বলেন, প্যাট্রিয়ট, থাড, যুদ্ধবিমান ও সেন্সর নিয়ে গঠিত বহুস্তরীয় প্রতিরক্ষাব্যবস্থাও সৌদি আরবের মতো বিশাল দেশে সম্পূর্ণ অপ্রবেশযোগ্য নিরাপত্তাবলয় তৈরি করতে পারে না।
এ ছাড়া ধারাবাহিক হামলার কারণে সৌদি আরবের ইন্টারসেপ্টর বা শত্রুপক্ষের ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন ধ্বংসে ব্যবহৃত প্রতিরোধী ক্ষেপণাস্ত্রের মজুত দ্রুত কমে আসছে। বিশ্বজুড়েই এ ধরনের ক্ষেপণাস্ত্রের সরবরাহ ও মজুত নিয়ে চাপ রয়েছে।
বিশ্লেষকদের মতে, হুথিদের কৌশলগত লক্ষ্য অর্জনের জন্য প্রতিবার সৌদি প্রতিরক্ষাব্যবস্থা ভেদ করা প্রয়োজন নেই। রিয়াদের মতো গুরুত্বপূর্ণ স্থানে মাঝেমধ্যে এক-দুটি হামলা সফল হলেও তা জনমনে আতঙ্ক সৃষ্টি এবং দেশের নিরাপত্তা নিয়ে প্রশ্ন তোলার জন্য যথেষ্ট।
অ্যান্ড্রেয়াস ক্রিগের মতে, হামলার সামরিক ফলাফলের পাশাপাশি এর অর্থনৈতিক ও মনস্তাত্ত্বিক প্রভাবও হুথিদের কৌশলের গুরুত্বপূর্ণ অংশ।
থমাস জুনো বলেন, হুথিরা মূলত সংঘাতের নিয়ম নতুন করে নির্ধারণ করতে চাইছে। সৌদি বিমানবাহিনী সানার বিমানবন্দরে হামলা চালানোর পর হুথিরাও সৌদি আরবের গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনায় একই ধরনের পাল্টা আঘাত হানছে।
জুনোর ভাষায়, হুথিদের বার্তা হলো—শান্তি প্রতিষ্ঠার মূল্য ক্রমেই বাড়ছে। তাঁর মতে, সৌদি আরবের জন্য পরিস্থিতিটি বড় ধরনের বিপর্যয়, কারণ দেশটি কয়েক বছর ধরেই ইয়েমেন যুদ্ধ থেকে বেরিয়ে আসার চেষ্টা করছিল।
সৌদি যুবরাজ মোহাম্মদ বিন সালমানের ‘ভিশন ২০৩০’ পরিকল্পনার অন্যতম কেন্দ্রবিন্দু রিয়াদ। শহরটিকে পর্যটন, বহুজাতিক প্রতিষ্ঠান ও আন্তর্জাতিক আয়োজনের গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্র হিসেবে গড়ে তোলার লক্ষ্য রয়েছে সৌদি সরকারের।
এ কারণে রিয়াদের প্রধান বিমানবন্দরে হামলা শুধু নিরাপত্তার বিষয় নয়, দেশটির অর্থনৈতিক পরিকল্পনা ও আন্তর্জাতিক ভাবমূর্তির জন্যও বড় উদ্বেগের কারণ।
অ্যান্ড্রেয়াস ক্রিগ সতর্ক করে বলেন, বিমানবন্দরে হামলায় সামরিক ক্ষয়ক্ষতি সীমিত হলেও এর অর্থনৈতিক ও মনস্তাত্ত্বিক প্রভাব সুদূরপ্রসারী হতে পারে।
প্রতিবেদন অনুযায়ী, রিয়াদে শুরু হতে যাওয়া ‘ডব্লিউপিসি এনার্জি কংগ্রেস’-এর মতো গুরুত্বপূর্ণ আন্তর্জাতিক আয়োজনের ঠিক আগেই শনিবারের প্রাণঘাতী হামলার ঘটনা ঘটে। এতে বিদেশি অতিথি, বিনিয়োগকারী ও ব্যবসায়ীদের নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ বাড়তে পারে।
এদিকে, আগে হামলার আশঙ্কা দেখা দিলে কর্তৃপক্ষ নাগরিকদের মুঠোফোনে সতর্কবার্তা পাঠাত। সম্প্রতি এ ধরনের সতর্কবার্তা বন্ধ থাকায় সাধারণ মানুষের উদ্বেগ আরও বেড়েছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
শনিবারের হামলার পর সৌদি সরকারের পক্ষ থেকে প্রাথমিক কোনো বিবৃতি আসার আগেই কয়েকটি দেশের দূতাবাস তাদের নাগরিকদের রিয়াদ বিমানবন্দর এড়িয়ে চলার পরামর্শ দেয়। এতে কূটনৈতিক অস্বস্তিও বেড়েছে।
সব মিলিয়ে, বিপুল প্রতিরক্ষা বাজেট ও অত্যাধুনিক অস্ত্র থাকা সত্ত্বেও সৌদি আরবের জন্য হুথিদের ড্রোন ও ক্ষেপণাস্ত্র হামলা ঠেকানো কঠিন হয়ে উঠেছে। বিশাল ভূখণ্ডের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা, প্রতিরোধী ক্ষেপণাস্ত্রের মজুত ধরে রাখা এবং গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামো সুরক্ষিত রাখার চ্যালেঞ্জ দেশটির প্রতিরক্ষাব্যবস্থার সীমাবদ্ধতা স্পষ্ট করছে।
সূত্র: এনডিটিভি