যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প প্রশাসনের বিরুদ্ধে গুরুত্বপূর্ণ রায় দিয়েছেন দেশটির একটি ফেডারেল আদালত। আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালতের (আইসিসি) সঙ্গে যোগাযোগ রাখা দুটি মানবাধিকার সংগঠনের বিরুদ্ধে নিষেধাজ্ঞা আরোপের সরকারি পদক্ষেপ আটকে দিয়েছেন আদালত। বিচারকের মতে, প্রশাসনের এ ধরনের পদক্ষেপ যুক্তরাষ্ট্রের সংবিধানে সুরক্ষিত মতপ্রকাশের স্বাধীনতাকে অসাংবিধানিকভাবে সীমিত করতে পারে। যুক্তরাষ্ট্রের জেলা আদালতের বিচারক জেসি ফারম্যান এ বিষয়ে প্রাথমিক […]
ছবি: সংগৃহীত
যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প প্রশাসনের বিরুদ্ধে গুরুত্বপূর্ণ রায় দিয়েছেন দেশটির একটি ফেডারেল আদালত। আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালতের (আইসিসি) সঙ্গে যোগাযোগ রাখা দুটি মানবাধিকার সংগঠনের বিরুদ্ধে নিষেধাজ্ঞা আরোপের সরকারি পদক্ষেপ আটকে দিয়েছেন আদালত। বিচারকের মতে, প্রশাসনের এ ধরনের পদক্ষেপ যুক্তরাষ্ট্রের সংবিধানে সুরক্ষিত মতপ্রকাশের স্বাধীনতাকে অসাংবিধানিকভাবে সীমিত করতে পারে।
যুক্তরাষ্ট্রের জেলা আদালতের বিচারক জেসি ফারম্যান এ বিষয়ে প্রাথমিক নিষেধাজ্ঞা জারি করেন। তিনি বলেন, নিষেধাজ্ঞার আওতায় থাকা আইসিসি কর্মকর্তা ও সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের সেবা দেওয়ার ক্ষেত্রে সরকারের বিধিনিষেধ মতপ্রকাশের বিষয়বস্তুভিত্তিক নিয়ন্ত্রণের শামিল। এ ধরনের নিয়ন্ত্রণের পক্ষে প্রয়োজনীয় কঠোর আইনি মানদণ্ড পূরণ করতে পারেনি ট্রাম্প প্রশাসন।
এই রায়ের ফলে মানবাধিকার সংগঠন ডেমোক্রেসি ফর দ্য আরব ওয়ার্ল্ড নাউ (ডন) এবং ট্যাক্সপেয়ার অ্যালায়েন্স অ্যাগেইনস্ট জেনোসাইডের (টিএএজি) বিরুদ্ধে আন্তর্জাতিক জরুরি অর্থনৈতিক ক্ষমতা আইন (আইইইপিএ) প্রয়োগ করে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা কার্যকর করতে পারবে না সংশ্লিষ্ট মার্কিন কর্তৃপক্ষ।
আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালতের সঙ্গে যোগাযোগ রাখা এবং যুদ্ধাপরাধের অভিযোগসংক্রান্ত তথ্য সরবরাহের কারণে সংগঠন দুটি ট্রাম্প প্রশাসনের পদক্ষেপের মুখে পড়ে।
ডন নিয়মিতভাবে আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালতের রোম সংবিধির ১৫ অনুচ্ছেদের আওতায় যুদ্ধাপরাধের অভিযোগের প্রমাণ ও তথ্য আদালতে জমা দিয়ে আসছিল। অন্যদিকে, একই ধরনের নথি আদালতে উপস্থাপনের উদ্দেশ্যে গঠিত টিএএজি সম্ভাব্য নিষেধাজ্ঞার আশঙ্কায় এত দিন আনুষ্ঠানিকভাবে কোনো নথি জমা দেওয়া থেকে বিরত ছিল।
আন্তর্জাতিক জরুরি অর্থনৈতিক ক্ষমতা আইন অনুযায়ী, সংশ্লিষ্ট অভিযোগে সর্বোচ্চ ৩ লাখ ৭৭ হাজার ৭০০ ডলার পর্যন্ত দেওয়ানি জরিমানা কিংবা ২০ বছর পর্যন্ত কারাদণ্ডের ঝুঁকি তৈরি হতে পারত বলে মামলায় উল্লেখ করা হয়েছে।
আদালতের রায়কে স্বাগত জানিয়েছে সংগঠন দুটি। তারা জানিয়েছে, আইনি বাধা দূর হওয়ায় আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালতে যুদ্ধাপরাধের প্রমাণসংবলিত নথি জমা দেওয়ার কাজ আবার শুরু করবে।
পাশাপাশি জাতিসংঘের বিশেষ প্রতিবেদক ফ্রান্সেসকা আলবানিজের সঙ্গে আনুষ্ঠানিক সমন্বয় এবং ফিলিস্তিনের মানবাধিকার সংগঠন আল-হক, আল-মিজান ও ফিলিস্তিনিয়ান সেন্টার ফর হিউম্যান রাইটসের সঙ্গে যোগাযোগও পুনরায় চালু করার পরিকল্পনা রয়েছে তাদের।
ট্রাম্প প্রশাসনের বিরুদ্ধে করা মামলায় ২০২৫ সালের ফেব্রুয়ারিতে জারি করা নির্বাহী আদেশ ১৪২০৩-কে চ্যালেঞ্জ করা হয়। ওই আদেশে যুক্তরাষ্ট্র বা ইসরায়েলের মতো মিত্রদেশের বিরুদ্ধে তদন্তে যুক্ত আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালতের কর্মকর্তা ও সংশ্লিষ্ট ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানের ওপর চাপ সৃষ্টির জন্য মার্কিন সংস্থাগুলোকে ব্যবস্থা নেওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয়েছিল।
ওই নির্বাহী আদেশের আওতায় আইসিসির সাবেক প্রধান কৌঁসুলি করিম খান, ছয়জন বিচারক এবং জাতিসংঘের কয়েকজন কর্মকর্তাকে লক্ষ্যবস্তু করা হয়। যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল—কোনো দেশই আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালতের সদস্য নয়।
২০২৪ সালের নভেম্বরে গাজায় যুদ্ধাপরাধের অভিযোগে ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু এবং দেশটির সাবেক প্রতিরক্ষামন্ত্রী ইয়োভ গ্যালান্টের বিরুদ্ধে গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারির পর আইসিসিকে ঘিরে ওয়াশিংটনের সঙ্গে বিরোধ আরও তীব্র হয়। আদালতের এখতিয়ার ও কার্যক্রম নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের আপত্তির পাশাপাশি নিষেধাজ্ঞার মতো পদক্ষেপও নেওয়া হয়।
গত শুক্রবার মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিও আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালতের বিরুদ্ধে নিষেধাজ্ঞা আরোপের ঘোষণা দেন। একই সঙ্গে সদস্যদেশগুলো আদালতের ক্ষমতা সীমিত করতে ব্যর্থ হলে যুক্তরাষ্ট্র আন্তর্জাতিক এই বিচারিক প্রতিষ্ঠানটিকে ভেঙে দেওয়ার উদ্যোগ নিতে পারে বলে সতর্ক করেন।
বর্তমানে আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালতের সদস্যরাষ্ট্র ১২৫টি। আদালতটি আন্তর্জাতিক অপরাধের বিচার করে, যার মধ্যে গণহত্যা, মানবতাবিরোধী অপরাধ এবং যুদ্ধাপরাধ রয়েছে।
মানবাধিকার সংগঠনগুলোর বিরুদ্ধে নিষেধাজ্ঞা আরোপের পথে আদালতের এই বাধা ট্রাম্প প্রশাসনের আইসিসিবিরোধী পদক্ষেপে নতুন আইনি জটিলতা তৈরি করেছে। একই সঙ্গে আন্তর্জাতিক আদালতের সঙ্গে যোগাযোগ, যুদ্ধাপরাধের প্রমাণ সংগ্রহ এবং মানবাধিকার সংগঠনগুলোর স্বাধীনভাবে কাজ করার অধিকার নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রে সাংবিধানিক বিতর্কও সামনে এসেছে।
আদালতের এই আদেশটি প্রাথমিক নিষেধাজ্ঞা। ফলে মামলার চূড়ান্ত নিষ্পত্তির আগে এটি ট্রাম্প প্রশাসনের সংশ্লিষ্ট পদক্ষেপের বিরুদ্ধে আইনি বাধা হিসেবে কার্যকর থাকবে।