লিওনেল মেসির আন্তর্জাতিক ফুটবল অধ্যায়ের সমাপ্তির মধ্য দিয়ে নতুন এক বাস্তবতার মুখোমুখি হচ্ছে আর্জেন্টিনা। মাঠের সাফল্য, বিশ্বজুড়ে সমর্থকদের আবেগ এবং বাণিজ্যিক সম্প্রসারণ—সব মিলিয়ে গত কয়েক বছরে আর্জেন্টিনা জাতীয় দল পরিণত হয়েছে বড় এক বৈশ্বিক ব্র্যান্ডে। এই ব্র্যান্ডের বিকাশে বিশ্বকাপ ও কোপা আমেরিকার শিরোপা যেমন ভূমিকা রেখেছে, তেমনি মেসির জনপ্রিয়তাও খুলে দিয়েছে বাণিজ্যের নতুন দুয়ার। এখন […]
ছবি: সংগৃহীত
লিওনেল মেসির আন্তর্জাতিক ফুটবল অধ্যায়ের সমাপ্তির মধ্য দিয়ে নতুন এক বাস্তবতার মুখোমুখি হচ্ছে আর্জেন্টিনা। মাঠের সাফল্য, বিশ্বজুড়ে সমর্থকদের আবেগ এবং বাণিজ্যিক সম্প্রসারণ—সব মিলিয়ে গত কয়েক বছরে আর্জেন্টিনা জাতীয় দল পরিণত হয়েছে বড় এক বৈশ্বিক ব্র্যান্ডে। এই ব্র্যান্ডের বিকাশে বিশ্বকাপ ও কোপা আমেরিকার শিরোপা যেমন ভূমিকা রেখেছে, তেমনি মেসির জনপ্রিয়তাও খুলে দিয়েছে বাণিজ্যের নতুন দুয়ার। এখন প্রশ্ন, মেসিকে ছাড়া সেই আকর্ষণ কতটা ধরে রাখতে পারবে আর্জেন্টিনার ফুটবল অ্যাসোসিয়েশন (এএফএ)?
বেনিনের বিপক্ষে ৩-০ গোলের জয়ে গোল ও দুটি অ্যাসিস্ট করে আন্তর্জাতিক অধ্যায়ের শেষ ম্যাচটি স্মরণীয় করে রেখেছেন মেসি। ৩৯ বছর বয়সে শেষবারের মতো আর্জেন্টিনার জার্সি পরার আগে ২০৮ আন্তর্জাতিক ম্যাচে তাঁর গোলসংখ্যা ছিল ১২৬। জিতেছেন দুটি কোপা আমেরিকা ও ২০২২ সালের বিশ্বকাপ। তাঁর বিদায়ী ম্যাচ ঘিরে সমর্থকদের আবেগের পাশাপাশি ফুটবল-বাণিজ্যের বিশাল ব্যাপ্তিও স্পষ্ট হয়ে উঠেছে।
মেসির বিদায়ের সঙ্গে তাই শুধু একটি বর্ণাঢ্য আন্তর্জাতিক ক্যারিয়ারের সমাপ্তি ঘটছে না, বরং আর্জেন্টিনার ফুটবলকে ঘিরে গড়ে ওঠা বাণিজ্যিক ব্যবস্থার সামনে তৈরি হচ্ছে নতুন চ্যালেঞ্জ।
১২০টির বেশি ব্র্যান্ডের সঙ্গে এএফএর অংশীদারত্ব
আর্জেন্টিনার ফুটবল-বাণিজ্যের বিস্তারের চিত্র পাওয়া যায় দেশটির ফুটবল অ্যাসোসিয়েশনের বাণিজ্যিক অংশীদারত্বের পরিসংখ্যানে। ২০১৭ সালে জাতীয় দলের সঙ্গে বাণিজ্যিকভাবে যুক্ত ছিল হাতে গোনা কয়েকটি প্রতিষ্ঠান। পরবর্তী বছরগুলোতে এএফএর বাণিজ্যিক কৌশলে বড় পরিবর্তন আসে। লিয়ান্দ্রো পিটারসেনের নেতৃত্বে অংশীদারত্বের সংখ্যা বেড়ে এখন ১২০ ছাড়িয়েছে।
এএফএর নিজস্ব তথ্য অনুযায়ী, ২০২৬ সালে তাদের সঙ্গে ১২০টির বেশি ব্র্যান্ডের অংশীদারত্ব রয়েছে। চীন, ভারত, যুক্তরাষ্ট্র, ইউরোপ ও মধ্যপ্রাচ্যসহ বিশ্বের বিভিন্ন অঞ্চলে ছড়িয়ে পড়েছে আর্জেন্টিনা ফুটবলের বাণিজ্যিক উপস্থিতি।
অবশ্য এই সম্প্রসারণের পেছনে শুধু মেসির জনপ্রিয়তাই কাজ করেনি। বিশ্বকাপ ও কোপা আমেরিকায় ধারাবাহিক সাফল্য, লিওনেল স্কালোনির অধীনে দলের অর্জন এবং এএফএর দীর্ঘমেয়াদি বিপণন পরিকল্পনাও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে। আন্তর্জাতিক পর্যায়ে একের পর এক শিরোপা জয়ের ফলে আর্জেন্টিনার জাতীয় দলের প্রতি সমর্থকদের আগ্রহ বেড়েছে, যা বাণিজ্যিক অংশীদারদের কাছেও দলটিকে আকর্ষণীয় করে তুলেছে।
তবে এএফএর বাণিজ্যিক কর্মকর্তা লিয়ান্দ্রো পিটারসেনের ভাষায়, মেসি ছিলেন এই ব্র্যান্ডের বিকাশে ‘অসাধারণ গতিবর্ধক’। তাঁর বিশ্বব্যাপী পরিচিতি ও জনপ্রিয়তা এমন অনেক বাজারে আর্জেন্টিনার প্রবেশ সহজ করেছে, যেখানে আগে দলটির বাণিজ্যিক উপস্থিতি তুলনামূলকভাবে সীমিত ছিল।
বিদায়ী ম্যাচেও কোটি ডলারের বাণিজ্যিক সম্ভাবনা
মেসির শেষ আন্তর্জাতিক ম্যাচ ঘিরে বাণিজ্যিক আগ্রহের বড় উদাহরণ দেখা গেছে বুয়েনস এইরেসের মনুমেন্টাল স্টেডিয়ামে। বেনিনের বিপক্ষে ম্যাচটির ৮৫ হাজার টিকিট দ্রুত বিক্রি হয়ে যায়। কিছু টিকিটের দাম উঠেছিল ৪ লাখ ৮০ হাজার আর্জেন্টাইন পেসো পর্যন্ত।
ফোর্বস আর্জেন্টিনার হিসাব অনুযায়ী, শুধু টিকিট বিক্রি থেকেই প্রায় ১ কোটি ৩০ লাখ ডলার আয়ের সম্ভাবনা তৈরি হয়েছিল। টেলিভিশনেও ম্যাচটি পেয়েছে উল্লেখযোগ্য দর্শকসংখ্যা। প্রতিপক্ষ বেনিন হলেও মেসির উপস্থিতি ম্যাচটিকে সাধারণ একটি প্রীতি ম্যাচের গণ্ডি ছাড়িয়ে বড় বাণিজ্যিক ও গণমাধ্যমের আয়োজনে পরিণত করে।
এ ঘটনা দেখিয়েছে, মেসির নাম ও উপস্থিতি কীভাবে দর্শকদের আগ্রহ, টিকিটের চাহিদা এবং সম্প্রচারমাধ্যমের মনোযোগ বাড়াতে পারে। জাতীয় দলের একটি ম্যাচকে ঘিরে এত বড় বাণিজ্যিক আগ্রহ তৈরি হওয়ার পেছনে তাঁর ব্যক্তিগত জনপ্রিয়তার প্রভাবও স্পষ্ট।
মেসিকে ছাড়া কোন জায়গায় তৈরি হবে চ্যালেঞ্জ?
আর্জেন্টিনার সামনে এখন মূল প্রশ্ন, মেসির অনুপস্থিতিতে এই বাণিজ্যিক আকর্ষণ কতটা বজায় থাকবে। জাতীয় দলের ম্যাচ আয়োজন, স্পনসরশিপ, টিকিট বিক্রি, বিশেষ দর্শকসেবা, স্মারক ও জার্সি বিক্রি, বিজ্ঞাপন, ডিজিটাল কনটেন্ট, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দর্শকদের সম্পৃক্ততা এবং সম্প্রচারস্বত্ব—এসব ক্ষেত্রেই মেসির উপস্থিতি বাড়তি আগ্রহ তৈরি করত।
বিদেশের বিভিন্ন বাজারে আর্জেন্টিনার ম্যাচ আয়োজনের ক্ষেত্রেও মেসির জনপ্রিয়তা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে। তাঁর উপস্থিতি নিশ্চিত হলে দর্শক, আয়োজক ও বাণিজ্যিক অংশীদারদের আগ্রহ বাড়তে পারে। ফলে আন্তর্জাতিক ক্যারিয়ারের ইতি টানার পর জাতীয় দলের বিপণন কৌশলে নতুন করে গুরুত্ব দিতে হবে এএফএকে।
তবে মেসির বিদায়ের অর্থ এই নয় যে আর্জেন্টিনার ফুটবলের বাণিজ্যিক আকর্ষণ স্বয়ংক্রিয়ভাবে কমে যাবে। দলটির সাফল্য, জনপ্রিয় খেলোয়াড়দের উপস্থিতি, সমর্থকদের আনুগত্য এবং দীর্ঘদিনের ফুটবল ঐতিহ্যও ব্র্যান্ডটির শক্তির অংশ। এসব উপাদান কাজে লাগিয়ে মেসি-পরবর্তী সময়েও বাণিজ্যিক প্রবৃদ্ধি ধরে রাখার সুযোগ রয়েছে।
শিরোপার সাফল্যে তৈরি হয়েছে শক্ত অর্থনৈতিক ভিত্তি
মেসি ও স্কালোনির সময়ে আর্জেন্টিনা জাতীয় দলের ধারাবাহিক সাফল্য এএফএর বাণিজ্যিক ভিত্তি শক্তিশালী করতে সহায়তা করেছে। বিভিন্ন প্রতিযোগিতায় অর্জিত সাফল্যের বোনাস বাবদ ২০১৯ সাল থেকে প্রায় ১২ কোটি ১০ লাখ ডলার আয়ের হিসাবও সামনে এসেছে।
এই অর্থ শুধু মেসির ব্যক্তিগত অবদানের ফল নয়; পুরো দলের সাফল্য থেকেই এমন আয় এসেছে। তবে বিশ্বকাপ ও কোপা আমেরিকার মতো বড় প্রতিযোগিতায় শিরোপা জয়ের ফলে জাতীয় দলের পরিচিতি, সমর্থকদের আগ্রহ এবং বাণিজ্যিক অংশীদারত্বের সুযোগ বেড়েছে। এএফএ সেই সাফল্যকে কাজে লাগিয়ে দীর্ঘমেয়াদি বাণিজ্যিক কাঠামো গড়ে তুলতে পেরেছে।
এখন সেই কাঠামোর কার্যকারিতা যাচাইয়ের সময়। মেসির মতো বৈশ্বিক তারকার অনুপস্থিতিতে জাতীয় দলের ব্র্যান্ডকে কীভাবে এগিয়ে নেওয়া হবে, সেটিই হবে এএফএর বিপণন পরিকল্পনার অন্যতম বড় পরীক্ষা।
মাঠে মেসির ১০ নম্বর জার্সির উত্তরসূরি কে হবেন, তা সময়ের সঙ্গে স্পষ্ট হবে। কিন্তু মাঠের বাইরের চ্যালেঞ্জ আরও বিস্তৃত। আর্জেন্টিনার জার্সি, জাতীয় দলের ম্যাচ এবং দেশটির ফুটবল ব্র্যান্ডের প্রতি বিশ্বজুড়ে সমর্থক ও বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠানগুলোর আগ্রহ ধরে রাখতে নতুন কৌশল প্রয়োজন হবে। মেসির বিদায় তাই শুধু একটি ফুটবল যুগের সমাপ্তি নয়; এটি আর্জেন্টিনার ফুটবল-বাণিজ্যের জন্যও নতুন অধ্যায়ের সূচনা।