যুক্তরাষ্ট্র ও কানাডার মধ্যে বাণিজ্য আলোচনা ভেঙে যাওয়ার পর দুই দেশের সম্পর্কের উত্তেজনা আরও বেড়েছে। নতুন করে মার্কিন শুল্ক আরোপের প্রতিবাদে কানাডায় আবারও যুক্তরাষ্ট্রের পণ্য ও সেবা বর্জনের আহ্বান জোরালো হচ্ছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে অনেক কানাডীয় নাগরিক মার্কিন পণ্য কেনা থেকে বিরত থাকার পাশাপাশি যুক্তরাষ্ট্রে ভ্রমণ না করারও আহ্বান জানাচ্ছেন। দুই দেশের মধ্যে কয়েক দফা আলোচনার […]
ছবি: সংগৃহীত
যুক্তরাষ্ট্র ও কানাডার মধ্যে বাণিজ্য আলোচনা ভেঙে যাওয়ার পর দুই দেশের সম্পর্কের উত্তেজনা আরও বেড়েছে। নতুন করে মার্কিন শুল্ক আরোপের প্রতিবাদে কানাডায় আবারও যুক্তরাষ্ট্রের পণ্য ও সেবা বর্জনের আহ্বান জোরালো হচ্ছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে অনেক কানাডীয় নাগরিক মার্কিন পণ্য কেনা থেকে বিরত থাকার পাশাপাশি যুক্তরাষ্ট্রে ভ্রমণ না করারও আহ্বান জানাচ্ছেন।
দুই দেশের মধ্যে কয়েক দফা আলোচনার পর গত শুক্রবার বাণিজ্য আলোচনা ভেস্তে যায়। এর পরদিনই যুক্তরাষ্ট্র কানাডার কিছু পণ্যের ওপর ৫০ শতাংশ শুল্ক কার্যকর করে। নতুন এই শুল্কের আওতায় প্রায় ২০ বিলিয়ন ডলারের কানাডীয় পণ্য পড়েছে। এর জবাবে কানাডার প্রধানমন্ত্রী মার্ক কার্নি যুক্তরাষ্ট্রের পণ্যের ওপর সমপরিমাণ পাল্টা শুল্ক আরোপের ঘোষণা দেন।
নতুন শুল্ক আরোপের পর কানাডায় যুক্তরাষ্ট্রবিরোধী মনোভাব আরও তীব্র হয়েছে বলে প্রতিবেদনে উঠে এসেছে। ভ্যাঙ্কুভারের শিশুমনোরোগ বিশেষজ্ঞ টাইলার ব্ল্যাক বলেন, তাঁর এলাকায় হাঁটতে বের হলে শুল্ক, মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প এবং কানাডার প্রধানমন্ত্রী মার্ক কার্নির বাণিজ্যনীতি নিয়ে আলোচনা প্রায় সব জায়গাতেই শোনা যাচ্ছে। তাঁর মতে, অনেক কানাডীয় মনে করছেন, যুক্তরাষ্ট্র তাদের ওপর আক্রমণাত্মক অর্থনৈতিক চাপ সৃষ্টি করছে।
এরই মধ্যে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে আবারও সক্রিয় হয়েছে ‘বয়কট ইউএসএ’ প্রচারণা। বিভিন্ন প্ল্যাটফর্মে কানাডীয় পণ্য কেনার আহ্বান জানিয়ে পোস্ট, তালিকা ও প্রচারমূলক বার্তা ছড়িয়ে পড়ছে। অনেকেই যুক্তরাষ্ট্রে ভ্রমণ বন্ধ রাখার কথাও বলছেন। ইউরোপের কিছু সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ব্যবহারকারীও এই বর্জন কর্মসূচিতে যুক্ত হওয়ার আগ্রহ দেখিয়েছেন।
কানাডায় মার্কিন পণ্য বর্জনের প্রবণতা অবশ্য নতুন নয়। ট্রাম্প দ্বিতীয় মেয়াদে দায়িত্ব নেওয়ার পর থেকেই দেশটির অনেক নাগরিক মার্কিন পণ্য কেনা কমিয়েছেন। একই সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রে ভ্রমণ থেকেও অনেকে বিরত থেকেছেন।
টরন্টোর লেখক টিনা গ্যারেটের মতে, সাম্প্রতিক শুল্ক আরোপের কারণে যারা আগে থেকেই মার্কিন পণ্য বর্জন শুরু করেছিলেন, তাদের অনেকেই আবার নতুন করে এই কর্মসূচিতে সক্রিয় হতে পারেন।
কানাডার প্রধানমন্ত্রী মার্ক কার্নিও চলমান শুল্কসংঘাতকে দেশের মানুষের জাতীয় ঐক্য জোরদারের একটি সুযোগ হিসেবে তুলে ধরেছেন। তিনি বলেছেন, কানাডার নিজস্ব সম্পদ ও সক্ষমতা রয়েছে এবং কোনো দেশকে কানাডার ভবিষ্যৎ নির্ধারণ করতে দেওয়া হবে না।
কার্নি সরকার আগামী ৮ সেপ্টেম্বর থেকে যুক্তরাষ্ট্রের কিছু পণ্যের ওপর ডলারের বিপরীতে ডলার হিসেবে পাল্টা শুল্ক আরোপের পরিকল্পনা করছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
এদিকে কানাডার অন্টারিও প্রদেশের প্রিমিয়ার ডগ ফোর্ডও যুক্তরাষ্ট্রের বিরুদ্ধে আরও কঠোর অর্থনৈতিক পদক্ষেপ নেওয়ার ইঙ্গিত দিয়েছেন। তাঁর বক্তব্য, পরিস্থিতির আরও অবনতি হলে বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও গুরুত্বপূর্ণ খনিজসহ বিভিন্ন রপ্তানি নিয়েও পাল্টা ব্যবস্থা নেওয়া হতে পারে।
২০২৫ সালে কানাডা যুক্তরাষ্ট্রে প্রায় ৩ দশমিক ৩ বিলিয়ন ডলারের বিদ্যুৎ রপ্তানি করেছিল। ফলে বিদ্যুৎ ও অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ পণ্যকেও সম্ভাব্য পাল্টা ব্যবস্থার অংশ হিসেবে দেখা হচ্ছে।
নতুন মার্কিন শুল্কে কানাডার বিভিন্ন পণ্য ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। মধু, প্রসাধনী, ক্রিসমাসের সাজসজ্জার সামগ্রী, হকি সরঞ্জাম, পোশাক, আসবাবপত্র ও দুগ্ধজাত পণ্যসহ ৫৫০টির বেশি কানাডীয় পণ্যের ওপর ৫০ শতাংশ শুল্ক কার্যকর হয়েছে। এসব পণ্যের মোট মূল্য প্রায় ২০ বিলিয়ন ডলার। তবে যুক্তরাষ্ট্রে কানাডার মোট পণ্য রপ্তানির তুলনায় এটি একটি সীমিত অংশ।
তবে শুল্কযুদ্ধের প্রভাব কেবল দুই দেশের সরকারের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকছে না। কানাডার ব্যবসায়ীরা আশঙ্কা করছেন, দীর্ঘদিন শুল্ক বহাল থাকলে উৎপাদন ব্যয় বাড়বে। এর ফলে পণ্যের দাম বাড়তে পারে এবং যুক্তরাষ্ট্রের বাজারে কানাডীয় পণ্যের প্রতিযোগিতামূলক অবস্থানও দুর্বল হতে পারে।
অন্যদিকে, মার্কিন আমদানিকারকরাও বাড়তি খরচের মুখে পড়তে পারেন। এই অতিরিক্ত ব্যয়ের একটি অংশ শেষ পর্যন্ত ভোক্তাদের ওপর চাপিয়ে দেওয়া হলে যুক্তরাষ্ট্রের বাজারেও বিভিন্ন পণ্যের দাম বাড়তে পারে।
মার্কিন পণ্য বর্জনের অর্থনৈতিক প্রভাব কতটা হবে, তা এখনো স্পষ্ট নয়। বিশেষজ্ঞদের মতে, ভোক্তাদের বড় পরিসরের বর্জন নির্দিষ্ট কিছু কোম্পানির ওপর চাপ সৃষ্টি করতে পারে। তবে দীর্ঘমেয়াদে সামগ্রিক অর্থনীতিতে এর প্রভাব কতটা হবে, তা নির্ভর করবে বর্জন কর্মসূচির ব্যাপ্তি ও কতদিন তা স্থায়ী হয় তার ওপর।
তবে রাজনৈতিক দিক থেকে এই বর্জন আন্দোলনকে গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে করা হচ্ছে। কারণ মার্কিন শুল্কের বিরুদ্ধে কানাডীয়দের মধ্যে জাতীয়তাবাদী মনোভাব আরও জোরালো হচ্ছে। স্থানীয় পণ্য কেনার প্রবণতা এবং মার্কিন পণ্য ও সেবা এড়িয়ে চলার আহ্বান সেই মনোভাবেরই প্রতিফলন।
সব মিলিয়ে, বাণিজ্য আলোচনা ব্যর্থ হওয়ার পর যুক্তরাষ্ট্র ও কানাডার মধ্যে অর্থনৈতিক টানাপোড়েন আরও তীব্র হয়েছে। একদিকে ট্রাম্প প্রশাসনের নতুন শুল্ক, অন্যদিকে কানাডার পাল্টা শুল্ক ও সম্ভাব্য আরও কঠোর অর্থনৈতিক পদক্ষেপ—এর পাশাপাশি সাধারণ মানুষের মার্কিন পণ্য বর্জনের আহ্বানও পরিস্থিতিকে নতুন মাত্রা দিয়েছে। ফলে উত্তর আমেরিকার দুই ঘনিষ্ঠ বাণিজ্য অংশীদারের মধ্যে চলমান শুল্কসংঘাত আরও দীর্ঘায়িত হওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে।