রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর ভারতে আশ্রয় নেওয়া আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় নেতাদের মধ্যে আতঙ্ক, হতাশা ও পারস্পরিক অবিশ্বাস ক্রমেই বাড়ছে। দলের সভাপতি শেখ হাসিনা দিল্লিতে অবস্থান করলেও তার সঙ্গে অনেক প্রবীণ ও দীর্ঘদিনের নেতার দূরত্ব তৈরি হয়েছে বলে প্রতিবেদনে দাবি করা হয়েছে। দেশে ফিরলে গ্রেপ্তার কিংবা মৃত্যুদণ্ডের আশঙ্কার পাশাপাশি দলীয় প্রধানের কাছ থেকে কোনো খোঁজখবর না পাওয়া […]
ছবি: আমার দেশ অনলাইন
রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর ভারতে আশ্রয় নেওয়া আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় নেতাদের মধ্যে আতঙ্ক, হতাশা ও পারস্পরিক অবিশ্বাস ক্রমেই বাড়ছে। দলের সভাপতি শেখ হাসিনা দিল্লিতে অবস্থান করলেও তার সঙ্গে অনেক প্রবীণ ও দীর্ঘদিনের নেতার দূরত্ব তৈরি হয়েছে বলে প্রতিবেদনে দাবি করা হয়েছে। দেশে ফিরলে গ্রেপ্তার কিংবা মৃত্যুদণ্ডের আশঙ্কার পাশাপাশি দলীয় প্রধানের কাছ থেকে কোনো খোঁজখবর না পাওয়া এবং তার একতরফা সিদ্ধান্ত নিয়ে ক্ষোভ জমছে পলাতক নেতাদের মধ্যে।
এই পরিস্থিতির সবচেয়ে আলোচিত উদাহরণ হিসেবে উঠে এসেছে সাবেক স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামালের নাম। কলকাতার নিউটাউনের একটি ফ্ল্যাটে নিরাপত্তাহীনতা ও অনেকটা আত্মগোপনের মতো জীবন কাটাচ্ছেন তিনি। সম্প্রতি দলের প্রেসিডিয়াম সদস্য জাহাঙ্গীর কবির নানক একটি সংবাদমাধ্যমকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে দেশে ফিরে প্রতিশোধ নেওয়ার বিষয়ে আত্মবিশ্বাসী বক্তব্য দেন। এ নিয়ে ক্ষোভ প্রকাশ করেন কামাল।
প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, নানকের বক্তব্যের প্রতিক্রিয়ায় আসাদুজ্জামান খান কামাল প্রশ্ন তোলেন, শুধু বললেই কি ইচ্ছেমতো দেশে ফেরা সম্ভব? তার ওপর যদি একই ধরনের কঠোর আইনি নির্দেশ বা ফাঁসির সাজা থাকত, তাহলে তিনি কি এভাবে প্রকাশ্যে কথা বলতে পারতেন—এমন প্রশ্নও তোলেন সাবেক এই মন্ত্রী।
কামাল দাবি করেন, তার ওপর ভারতীয় কর্তৃপক্ষের কড়া বিধিনিষেধ রয়েছে। সামান্য কোনো রাজনৈতিক বক্তব্য দিলেও তাকে আটক করে বাংলাদেশ সরকারের হাতে তুলে দেওয়া হতে পারে—এমন আশঙ্কায় রয়েছেন তিনি। নিজের অসহায়ত্ব প্রকাশ করে তিনি বলেন, তার ফাঁসি হতে পারে, অথচ অন্যরা হয়তো বেঁচে যাবেন। এ কারণে তিনি দেশে ফিরতে চান না বলেও প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
একসময় ক্ষমতাধর এসব নেতার অনেকেই এখন অর্থকষ্ট, গ্রেপ্তারের ভয় এবং বন্দিদশার মতো পরিস্থিতির মধ্যে দিন কাটাচ্ছেন বলে প্রতিবেদনে দাবি করা হয়েছে। অথচ এমন সময়ে শেখ হাসিনা দিল্লিতে অবস্থান করলেও তাদের সঙ্গে যোগাযোগ বা খোঁজখবর রাখছেন না—এমন অভিযোগ রয়েছে। দলের সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদেরও বর্তমানে অনেকটাই কোণঠাসা এবং শেখ হাসিনার কাছ থেকে দূরে রয়েছেন বলে প্রতিবেদনে বলা হয়েছে।
পলাতক নেতাদের ক্ষোভ আরও বাড়িয়েছে শেখ হাসিনার সাম্প্রতিক একটি বক্তব্য। কলকাতার একটি সংবাদমাধ্যমকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে তিনি ইঙ্গিত দেন, তার অনুপস্থিতিতে দলের জ্যেষ্ঠ প্রেসিডিয়াম সদস্য এবং তার ফুফাতো ভাই শেখ ফজলুল করিম সেলিম সভাপতির দায়িত্ব পালন করতে পারেন।
এই খবর ছড়িয়ে পড়ার পর ভারতে অবস্থানরত আওয়ামী লীগের একটি অংশের মধ্যে অসন্তোষ তৈরি হয় বলে প্রতিবেদনে দাবি করা হয়েছে। কলকাতার নিউটাউনে শেখ হাসিনার চাচাতো ভাই শেখ হেলাল উদ্দিনের বাসায় দলের কয়েকজন জ্যেষ্ঠ নেতা গোপনে বৈঠক করেন এবং শেখ সেলিমকে দায়িত্ব দেওয়ার সম্ভাবনার বিরোধিতা করেন।
বৈঠকে আসাদুজ্জামান খান কামাল, জাহাঙ্গীর কবির নানক, আ ফ ম বাহাউদ্দিন নাছিম, মির্জা আজমসহ বেশ কয়েকজন প্রভাবশালী নেতা উপস্থিত ছিলেন বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
সেখানে নেতারা অভিযোগ করেন, শেখ সেলিম দীর্ঘদিন ধরে দলের সাংগঠনিক কর্মকাণ্ডে সক্রিয় ছিলেন না এবং নেতা-কর্মীদের সঙ্গে তার আচরণ নিয়েও অসন্তোষ রয়েছে। গত ১৫ বছরে তদবির ছাড়া দলীয় কাজে তাকে পাওয়া যায়নি বলেও তারা অভিযোগ করেন।
তাদের বক্তব্য, দলের সঙ্গে নিয়মিতভাবে সম্পৃক্ত না থাকা কাউকে সভাপতির দায়িত্ব দেওয়া হলে তা দলের অধিকাংশ নেতা-কর্মী মেনে নেবেন না। এ কারণে শেখ সেলিমের পরিবর্তে অন্য কোনো নেতাকে মূল্যায়নের আহ্বান জানিয়ে শেখ হেলালের মাধ্যমে শেখ হাসিনার কাছে বার্তা পাঠানোর চেষ্টা করেন তারা।
প্রতিবেদনের সামগ্রিক চিত্রে ভারতে অবস্থানরত আওয়ামী লীগের শীর্ষ নেতাদের মধ্যে গভীর অস্বস্তির বিষয়টি উঠে এসেছে। দেশে ফেরার ক্ষেত্রে গ্রেপ্তার বা মৃত্যুদণ্ডের আশঙ্কা যেমন রয়েছে, তেমনি দলীয় নেতৃত্বের সিদ্ধান্ত ও যোগাযোগের অভাব নিয়েও তৈরি হয়েছে ক্ষোভ।
পাশাপাশি কিছু নেতার প্রকাশ্য বক্তব্য এবং আত্মপ্রচারের রাজনীতিতেও অনেকেই হতাশ বলে প্রতিবেদনে দাবি করা হয়েছে। সব মিলিয়ে দলের ভেতরে তৈরি হওয়া এই অনাস্থা ও বিভাজন ভারতে অবস্থানরত আওয়ামী লীগের নেতাদের রাজনৈতিক ভবিষ্যৎকে আরও অনিশ্চিত করে তুলেছে।
তথসূত্র: আমার দেশ