যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে টানা পাঁচ মাসের যুদ্ধ, দীর্ঘদিনের আন্তর্জাতিক নিষেধাজ্ঞা এবং অভ্যন্তরীণ নানা সংকটের মধ্যেও ইরানের অর্থনীতি এখনো পুরোপুরি ভেঙে পড়েনি। যদিও দেশটির সাধারণ মানুষ ক্রমবর্ধমান মূল্যস্ফীতি, আয়ের সংকট এবং জীবনযাত্রার ব্যয় বৃদ্ধির কারণে কঠিন বাস্তবতার মুখোমুখি, তবু রাষ্ট্রীয় অর্থনৈতিক কাঠামো এখনো কার্যকর রয়েছে বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা। আল জাজিরার এক বিশ্লেষণধর্মী প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, প্রায় […]
ছবি: সংগৃহীত
যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে টানা পাঁচ মাসের যুদ্ধ, দীর্ঘদিনের আন্তর্জাতিক নিষেধাজ্ঞা এবং অভ্যন্তরীণ নানা সংকটের মধ্যেও ইরানের অর্থনীতি এখনো পুরোপুরি ভেঙে পড়েনি। যদিও দেশটির সাধারণ মানুষ ক্রমবর্ধমান মূল্যস্ফীতি, আয়ের সংকট এবং জীবনযাত্রার ব্যয় বৃদ্ধির কারণে কঠিন বাস্তবতার মুখোমুখি, তবু রাষ্ট্রীয় অর্থনৈতিক কাঠামো এখনো কার্যকর রয়েছে বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা।
আল জাজিরার এক বিশ্লেষণধর্মী প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, প্রায় ৯ কোটি ২০ লাখ মানুষের দেশ ইরান শুধু তেলনির্ভর অর্থনীতি গড়ে তোলেনি। কয়েক দশক ধরে আন্তর্জাতিক নিষেধাজ্ঞা এবং পশ্চিমা বিশ্বের সঙ্গে উত্তেজনাপূর্ণ সম্পর্কের কারণে দেশটি কৃষি, উৎপাদন ও সেবাখাতের মতো বিকল্প খাতেও গুরুত্ব দিয়েছে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, পানি-নির্ভর কৃষি, স্থানীয় শিল্প উৎপাদন, সীমান্ত বাণিজ্য, বিকল্প সামুদ্রিক পরিবহন ব্যবস্থা এবং বড় অনানুষ্ঠানিক শ্রমবাজার ইরানের অর্থনীতিকে টিকিয়ে রাখতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছে। একই সঙ্গে নিষেধাজ্ঞা এড়িয়ে তেল রপ্তানির বিভিন্ন পদ্ধতিও দেশটির বৈদেশিক আয় ধরে রাখতে সহায়তা করছে।
তবে এই স্থিতিশীলতার সবচেয়ে বড় মূল্য দিচ্ছেন সাধারণ মানুষ। এক দশকেরও বেশি সময় ধরে চলা নিষেধাজ্ঞা, সাম্প্রতিক যুদ্ধ, রাজনৈতিক অস্থিরতা, প্রাণহানি এবং একাধিকবার ইন্টারনেট বন্ধ থাকার ফলে মানুষের আয়, কর্মসংস্থান ও ভবিষ্যৎ নিয়ে অনিশ্চয়তা বেড়েছে।
ম্যাসাচুসেটসভিত্তিক গবেষক ও অর্থনীতিবিদ হাদি কাহালজাদেহ বলেন, অর্থনীতির প্রকৃত পতন বলতে তিনি এমন পরিস্থিতিকে বোঝেন, যখন একটি রাষ্ট্র তার কর্মচারীদের বেতন দেওয়া বা মৌলিক সেবা চালিয়ে যেতে অক্ষম হয়ে পড়ে। সেই অর্থে ইরান এখনো সেই পর্যায়ে পৌঁছায়নি।
তার মতে, যুদ্ধ, নিষেধাজ্ঞা ও অবরোধের সম্মিলিত চাপ অত্যন্ত গুরুতর হলেও তা স্বল্প সময়ে ইরানের অর্থনীতিকে সম্পূর্ণ ধ্বংস করে ফেলবে—এমন সম্ভাবনা তিনি দেখছেন না।
বর্তমানে ইরানে মূল্যস্ফীতি প্রায় ৯০ শতাংশের কাছাকাছি পৌঁছেছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। খাদ্যপণ্যের দাম ব্যাপকভাবে বেড়ে যাওয়ায় মাংস, ডিম, রান্নার তেলসহ নিত্যপ্রয়োজনীয় অনেক পণ্যের মূল্য গত এক বছরে কয়েক গুণ বৃদ্ধি পেয়েছে।
একই সময়ে জাতীয় মুদ্রার মান ক্রমাগত কমে যাওয়ায় আমদানিকৃত পণ্য আরও ব্যয়বহুল হয়ে উঠেছে। যুদ্ধ শুরুর পর হরমুজ প্রণালিতে জাহাজ চলাচল ব্যাহত হওয়ায় সরবরাহ ব্যবস্থাও অতিরিক্ত চাপের মুখে পড়েছে।
কাহালজাদেহ বলেন, সরকার সাধারণত মুদ্রার অবমূল্যায়ন ও মূল্যস্ফীতির মাধ্যমে অর্থনীতিকে সচল রাখার চেষ্টা করে। এতে বাজারে পণ্য পাওয়া গেলেও সেগুলোর দাম সাধারণ মানুষের ক্রয়ক্ষমতার বাইরে চলে যায়।
তার ভাষায়, রাষ্ট্র পরে নগদ সহায়তা, ভর্তুকি এবং খাদ্য কুপনের মাধ্যমে মানুষের ওপর চাপ কমানোর চেষ্টা করে। এটি ব্যয়বহুল হলেও অর্থনীতির সম্পূর্ণ পতন ঠেকাতে কিছুটা ভূমিকা রাখে।
ইরানে মাসিক ন্যূনতম আয় ১০০ মার্কিন ডলারেরও কম। সরকার নিম্নআয়ের মানুষের জন্য মাসিক নগদ সহায়তা এবং ইলেকট্রনিক খাদ্য কুপন চালু রেখেছে।
সরকারের মুখপাত্র ফাতেমেহ মোহাজেরানি জানিয়েছেন, কুপন কর্মসূচির অর্থ পরিশোধ করা হলেও সাম্প্রতিক সাইবার হামলার কারণে ব্যাংকিং কার্যক্রম ব্যাহত হওয়ায় কিছু দোকান এখনো সেই অর্থ পায়নি।
তিনি আরও জানান, সাম্প্রতিক হামলায় সেতু, সুড়ঙ্গ, গ্যাস অবকাঠামো এবং বিদ্যুৎ উৎপাদন কেন্দ্র ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। এর ফলে শিল্প খাতে আগের পরিকল্পনার তুলনায় বেশি সময় বিদ্যুৎ সরবরাহ বন্ধ রাখতে হতে পারে।
ইরানের একটি গবেষণা প্রতিষ্ঠানের তথ্য অনুযায়ী, পাঁচ বছর আগে যেখানে প্রায় ৩০ শতাংশ মানুষ দারিদ্র্যসীমার নিচে বাস করতেন, সেখানে বর্তমানে সেই হার ৪৫ শতাংশে পৌঁছাতে পারে বলে পূর্বাভাস দেওয়া হয়েছে।
জার্মানির ফিলিপস ইউনিভার্সিটির অধ্যাপক মোহাম্মদ রেজা ফারজানগান মনে করেন, ইরানের অর্থনীতির অন্যতম বড় অভ্যন্তরীণ সমস্যা হলো দুর্নীতি। তার মতে, রাজনৈতিক প্রভাবের কারণে দক্ষতার পরিবর্তে বিশেষ সুবিধাপ্রাপ্ত ব্যক্তিরা বেশি লাভবান হন, যা দীর্ঘমেয়াদে অর্থনীতিকে দুর্বল করে।
তিনি বলেন, তেলের আয় বহু বছর ধরে অর্থনীতির দুর্বলতা আড়াল করলেও এতে বেসরকারি বিনিয়োগ ও উদ্ভাবনের গতি কমেছে।
ইরানের জেনারেল ইন্সপেকশন অর্গানাইজেশনের প্রধান জাবিহুল্লাহ খোদাইয়ান জানিয়েছেন, নিষেধাজ্ঞার মধ্যেও বিদেশে বিক্রি হওয়া তেল ও অন্যান্য পণ্যের বিপুল অর্থ এখনো দেশে ফেরেনি।
তার দাবি, কিছু ব্যক্তি রাষ্ট্রের আস্থা ভঙ্গ করে প্রায় ১১ বিলিয়ন মার্কিন ডলারের সম্পদের হিসাব দিতে ব্যর্থ হয়েছেন। এর মধ্যে অন্তত ১ দশমিক ৬ বিলিয়ন ডলার অপব্যবহারের অভিযোগ রয়েছে।
এছাড়া প্রায় ২০ হাজার রপ্তানিকারক আইন অনুযায়ী বৈদেশিক মুদ্রা দেশে ফেরত আনতে ব্যর্থ হয়েছেন বলেও তিনি উল্লেখ করেন।
হাদি কাহালজাদেহ বলেন, দীর্ঘমেয়াদি নিষেধাজ্ঞা ইরানের সামাজিক কাঠামো বদলে দিয়েছে। একসময় যেখানে মধ্যবিত্ত ছিল জনসংখ্যার বড় অংশ, এখন সেই শ্রেণি অনেক ছোট হয়ে এসেছে। বিপরীতে দরিদ্র ও ঝুঁকিপূর্ণ জনগোষ্ঠীর সংখ্যা বেড়ে মোট জনসংখ্যার প্রায় ৭০ শতাংশে পৌঁছেছে।
তার মতে, অনেক পরিবার খাদ্য তালিকা থেকে মাংস ও দুগ্ধজাত খাবার বাদ দিচ্ছে, চিকিৎসা পিছিয়ে দিচ্ছে এবং প্রয়োজনীয় খরচ কমাতে বাধ্য হচ্ছে।
বিশ্লেষকদের মতে, চীন, রাশিয়া এবং প্রতিবেশী দেশগুলোর সঙ্গে অর্থনৈতিক সম্পর্ক ইরানকে কিছুটা সহায়তা করলেও তা আন্তর্জাতিক অর্থনৈতিক ব্যবস্থার পূর্ণ বিকল্প হতে পারে না।
অধ্যাপক ফারজানগান বলেন, নিষেধাজ্ঞা ও যুদ্ধের ঝুঁকি বহাল থাকলে শুধুমাত্র অভ্যন্তরীণ সংস্কার দিয়ে অর্থনীতির টেকসই পুনরুদ্ধার সম্ভব নয়। তার মতে, দীর্ঘমেয়াদে অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতার জন্য কূটনৈতিক সমাধান এবং আন্তর্জাতিক সম্পর্কের উন্নয়নই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ।
তিনি বলেন, রাজনৈতিক ব্যবস্থা হয়তো টিকে থাকতে পারে, কিন্তু স্থিতিশীল আন্তর্জাতিক পরিবেশ ছাড়া ইরানের অর্থনীতির প্রকৃত পুনরুদ্ধার অত্যন্ত কঠিন হবে।
সূত্র: আল জাজিরা