একটিমাত্র রাতের যাত্রা, ৯৪০ ডলারের চুক্তিতে মালামাল বহনের ভাড়া—আর তাতেই পুরো জীবন ওলটপালট হয়ে গেল নিউ ইয়র্কের এক চীনা অভিবাসী চালকের। কানাডা সীমান্ত এলাকা থেকে কিছু বাক্স ম্যানহাটনে পৌঁছে দেওয়ার বিনিময়ে আজ মার্কিন আদালতের কাঠগড়ায় দাঁড়িয়ে ২০ বছরের কারাদণ্ডের মুখোমুখি ওয়েনজিয়ান ঝুও। পেশায় উবার ছাড়ার পর নিজস্ব পরিবহন ব্যবসা গড়ে তোলার স্বপ্নে বিভোর এই চালক […]
ছবি: সংগৃহীত
একটিমাত্র রাতের যাত্রা, ৯৪০ ডলারের চুক্তিতে মালামাল বহনের ভাড়া—আর তাতেই পুরো জীবন ওলটপালট হয়ে গেল নিউ ইয়র্কের এক চীনা অভিবাসী চালকের। কানাডা সীমান্ত এলাকা থেকে কিছু বাক্স ম্যানহাটনে পৌঁছে দেওয়ার বিনিময়ে আজ মার্কিন আদালতের কাঠগড়ায় দাঁড়িয়ে ২০ বছরের কারাদণ্ডের মুখোমুখি ওয়েনজিয়ান ঝুও। পেশায় উবার ছাড়ার পর নিজস্ব পরিবহন ব্যবসা গড়ে তোলার স্বপ্নে বিভোর এই চালক এখন আমেরিকার জটিল আইনি লড়াইয়ে বন্দি।
ঘটনার রাতে চীনা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ‘উইচ্যাট’-এ একটি বুকিং পান ঝুও। বলা হয়, এক আন্তর্জাতিক শিক্ষার্থীর ১২টি বাক্স ও কিছু ব্যাগ কানাডা সীমান্তঘেঁষা আকওয়েসাসন থেকে ম্যানহাটনে পৌঁছে দিতে হবে। অগ্রিম ১০০ ডলার পেয়ে রাত আড়াইটায় কুইন্সের বাসা থেকে বের হন তিনি।
সাত ঘণ্টার পথ পেরিয়ে গন্তব্যে পৌঁছে তিনি দেখেন, সেটি কোনো বসতবাড়ি নয় বরং এক নির্জন গ্যাস স্টেশন। দীর্ঘ অপেক্ষার পর এক ব্যক্তি এসে তাঁর মিনিভ্যানে বাক্সগুলো তুলে দেয়, কিন্তু অদ্ভুতভাবে নিজে গাড়িতে ওঠেনি। এখান থেকেই ঝুও-এর মনে সন্দেহের বীজ দানা বাঁধে।
যাত্রাপথে অস্বস্তি চেপে রাখতে না পেরে নিউ ইয়র্কের এক চালক বন্ধুকে ফোন করেন ঝুও। ফোনে তিনি জানতে চান, বাক্সগুলোতে অবৈধ কিছু থাকতে পারে কি না এবং গাঁজার গন্ধ কেমন হয়। চীনে বড় হওয়া ঝুও জীবনে কখনো গাঁজা দেখেননি বা স্পর্শও করেননি।
পরবর্তী সময়ে আদালতে পেশ করা গাড়ির ড্যাশক্যাম ভিডিওতে শোনা যায়, তিনি নিজেকেই বলছেন—“আমার খুব অস্বস্তি লাগছে, মনে হচ্ছে কিছু একটা ঠিক নেই।” ইচ্ছা থাকা সত্ত্বেও অন্যের মালামাল না খোলার সামাজিক দ্বিধায় তিনি বাক্সগুলো খুলে দেখেননি। আর এই সিদ্ধান্তই তাঁর বিরুদ্ধে প্রসিকিউশনের সবচেয়ে বড় অস্ত্রে পরিণত হয়।
গাড়ি নিয়ে ছাড়ার আধা ঘণ্টার মধ্যেই যুক্তরাষ্ট্রের বর্ডার পেট্রোল তাঁকে ঘেরাও করে। তল্লাশিতে উদ্ধার হয় ২০০ পাউন্ডেরও বেশি ভ্যাকুয়াম-সিল করা মাদক (গাঁজা)।
গ্রেফতারের পর ঝুও পুলিশকে পূর্ণ সহযোগিতা করেন। মোবাইল ফোন, বার্তা, ড্যাশক্যাম ফুটেজ হস্তান্তরের পাশাপাশি চক্রটিকে ধরতে সাহায্য করার প্রস্তাব দেন। কিন্তু ততক্ষণে তাঁর বিরুদ্ধে অবৈধ মাদক পরিবহন ও সরবরাহের গুরুতর অভিযোগ আনা হয়।
ঝুও যখন জেলে, তখন কুইন্সে তাঁর স্ত্রী এক কন্যাসন্তানের জন্ম দেন। বারবার আবেদন জানিয়েও সন্তানের জন্ম কিংবা প্রথম জন্মদিনে উপস্থিত থাকার সুযোগ পাননি এই হতভাগ্য বাবা।
মামলা চলাকালে প্রসিকিউশন একটি সমঝোতার (প্লি বার্গেন) প্রস্তাব দেয়—একটি ছোট অপরাধ মেনে নিলে তিনি হয়তো দ্রুত মুক্তি পেতেন। কিন্তু নির্দোষ দাবি করে তা সোজাসুজি প্রত্যাখ্যান করে ঝুও আদালতে বলেন, “আমি কোনো অপরাধ করিনি। ৪০০ দিন ধরে জেলে আছি, আমি শুধু বিচার চাই।”
বিচারে সরকার পক্ষ প্রয়োগ করে ‘উইলফুল ব্লাইন্ডনেস’ (ইচ্ছাকৃত অন্ধত্ব) বা ‘কনশাস অ্যাভয়ডেন্স’ নীতি। এই মার্কিন আইন অনুযায়ী, কোনো বিষয়ে জোরালো সন্দেহ হওয়া সত্ত্বেও যদি কেউ সত্য যাচাই না করে চোখ বুজে থাকে, তবে আইনের চোখে ধরে নেওয়া হয় যে বিষয়টি সে জানত। প্রায় সাড়ে তিন ঘণ্টার দীর্ঘ শুনানি শেষে জুরি তাঁকে দোষী সাব্যস্ত করে।
আদালতের নথিতে কোথাও প্রমাণিত হয়নি যে ঝুও নিজে আন্তর্জাতিক চোরাচালান চক্রের সদস্য ছিলেন কিংবা নিজে সীমান্ত পেরিয়ে মাদক এনেছিলেন। মূল পাচারকারীদেরও ধরতে পারেনি পুলিশ।
কেবল বাক্সের বাহক হওয়া এবং জোরালো সন্দেহের পর সত্য যাচাই না করার অপরাধে ঝুওর এই শাস্তি যুক্তরাষ্ট্রে নতুন এক বিতর্কের জন্ম দিয়েছে। সাধারণ অভিবাসী চালকদের নিরাপত্তা এবং ‘কেবল সন্দেহ বনাম নিশ্চিত অপরাধ’—আইনের এই সূক্ষ্ম সীমারেখা নিয়ে এখন তোলপাড় মার্কিন আইনি অঙ্গন।