জুলাই গণঅভ্যুত্থানের প্রথম শহীদ বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের (বেরোবি) শিক্ষার্থী আবু সাঈদ হত্যাকাণ্ডের মামলায় আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-২ এর পূর্ণাঙ্গ রায় প্রকাশ করা হয়েছে। ৮০৯ পৃষ্ঠার এই রায়ে মামলার পর্যবেক্ষণ, আইনি বিশ্লেষণ, সাক্ষ্য-প্রমাণের মূল্যায়ন এবং ৩০ আসামির বিরুদ্ধে দেওয়া সাজা বিস্তারিতভাবে তুলে ধরা হয়েছে। সোমবার রাজধানীতে এক সংবাদ ব্রিফিংয়ে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের চিফ প্রসিকিউটর অ্যাডভোকেট আমিনুল ইসলাম […]
ছবি: সংগৃহীত
জুলাই গণঅভ্যুত্থানের প্রথম শহীদ বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের (বেরোবি) শিক্ষার্থী আবু সাঈদ হত্যাকাণ্ডের মামলায় আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-২ এর পূর্ণাঙ্গ রায় প্রকাশ করা হয়েছে। ৮০৯ পৃষ্ঠার এই রায়ে মামলার পর্যবেক্ষণ, আইনি বিশ্লেষণ, সাক্ষ্য-প্রমাণের মূল্যায়ন এবং ৩০ আসামির বিরুদ্ধে দেওয়া সাজা বিস্তারিতভাবে তুলে ধরা হয়েছে।
সোমবার রাজধানীতে এক সংবাদ ব্রিফিংয়ে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের চিফ প্রসিকিউটর অ্যাডভোকেট আমিনুল ইসলাম জানান, রায়ের পূর্ণাঙ্গ অনুলিপি প্রকাশের পর তা পর্যালোচনা করা হবে এবং প্রয়োজন হলে রাষ্ট্রপক্ষ আপিলের বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেবে।
পূর্ণাঙ্গ রায়ে ট্রাইব্যুনাল উল্লেখ করেছে, আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত মানবাধিকার অনুসন্ধান, ফরেনসিক বিশ্লেষণ, প্রত্যক্ষদর্শীর সাক্ষ্য, ভিডিও ফুটেজ এবং অন্যান্য প্রমাণের ভিত্তিতে রাষ্ট্রপক্ষ প্রমাণ করতে সক্ষম হয়েছে যে, আবু সাঈদকে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যরা পরিকল্পিতভাবে এবং বেআইনিভাবে হত্যা করেছে। ট্রাইব্যুনালের মতে, ঘটনাটি কোনো বিচ্ছিন্ন হত্যাকাণ্ড নয়; বরং এটি বেসামরিক জনগণের বিরুদ্ধে পরিচালিত একটি বৃহত্তর ও সংগঠিত দমন-পীড়নের অংশ, যা মানবতাবিরোধী অপরাধের আওতায় পড়ে।
রায়ে বলা হয়েছে, একাধিক আঘাত ও গুলিবিদ্ধ হওয়ার ফলে সৃষ্ট শক ও অভ্যন্তরীণ রক্তক্ষরণের কারণে আবু সাঈদের মৃত্যু হয়েছিল এবং এটি ছিল একটি পরিকল্পিত হত্যাকাণ্ড।
এর আগে গত ৯ এপ্রিল আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-২ মামলার রায় ঘোষণা করে। ওই রায়ে রংপুর মেট্রোপলিটন পুলিশের সাবেক এএসআই আমির হোসেন এবং সাবেক কনস্টেবল সুজন চন্দ্র রায়কে মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হয়।
যাবজ্জীবন কারাদণ্ডপ্রাপ্ত তিন আসামি হলেন রংপুর মেট্রোপলিটন পুলিশের সাবেক সহকারী পুলিশ কমিশনার (কোতোয়ালি জোন) আরিফুজ্জামান ওরফে জীবন, তাজহাট থানার সাবেক ওসি রবিউল ইসলাম ওরফে নয়ন এবং বেরোবির সাবেক ক্যাম্প ইনচার্জ বিভূতি ভূষণ রায় ওরফে মাধব।
১০ বছরের কারাদণ্ড দেওয়া হয়েছে বেরোবির সাবেক উপাচার্য ড. হাসিবুর রশীদ, রংপুর মেট্রোপলিটন পুলিশের সাবেক কমিশনার মনিরুজ্জামান, বিশ্ববিদ্যালয়ের কয়েকজন শিক্ষক এবং ছাত্রলীগের কয়েকজন নেতাসহ পাঁচজনকে। সম্প্রতি গ্রেপ্তার হওয়া সাবেক উপাচার্য হাসিবুর রশীদ বর্তমানে সাজা ভোগ করছেন।
এ ছাড়া আটজনকে পাঁচ বছর এবং ১১ জনকে তিন বছর করে কারাদণ্ড দেওয়া হয়েছে। প্রক্টর অফিসের চুক্তিভিত্তিক কর্মচারী আনোয়ার পারভেজ ওরফে আপেলের ক্ষেত্রে আদালত তার ইতোমধ্যে ভোগ করা হাজতবাসকে সাজা হিসেবে গণ্য করে মুক্তির নির্দেশ দেয়।
২০২৪ সালের ১৬ জুলাই বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের কর্মসূচির সময় রংপুরে বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের সামনে পুলিশের গুলিতে নিহত হন ইংরেজি বিভাগের শিক্ষার্থী আবু সাঈদ। তার গুলিবিদ্ধ হওয়ার ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ার পর দেশজুড়ে আন্দোলন আরও তীব্র হয়ে ওঠে এবং পরবর্তীতে তা গণঅভ্যুত্থানে রূপ নেয়।
পরবর্তীতে আবু সাঈদের পরিবারের অভিযোগের ভিত্তিতে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে মামলা দায়ের করা হয়। দীর্ঘ তদন্ত, সাক্ষ্যগ্রহণ ও শুনানি শেষে ট্রাইব্যুনাল গত এপ্রিলে ঐতিহাসিক এই রায় ঘোষণা করে এবং এখন তার পূর্ণাঙ্গ অনুলিপি প্রকাশ করা হয়েছে।