যুক্তরাষ্ট্রের সংবিধানে সুরক্ষিত জন্মসূত্রে নাগরিকত্ব বা বার্থরাইট সিটিজেনশিপ নিয়ে দেশজুড়ে নতুন করে তীব্র আইনি ও রাজনৈতিক বিতর্ক শুরু হয়েছে। মার্কিন সংবিধানের ১৪তম সংশোধনীর প্রথম অংশে স্পষ্টভাবে বলা হয়েছে, যুক্তরাষ্ট্রে জন্মগ্রহণকারী অথবা বৈধভাবে নাগরিকত্বপ্রাপ্ত এবং মার্কিন বিচারব্যবস্থার অধীনস্থ প্রত্যেক ব্যক্তি দেশটির নাগরিক হিসেবে গণ্য হবেন। এই সাংবিধানিক বিধানের ফলে দীর্ঘদিন ধরে যুক্তরাষ্ট্রের মাটিতে জন্ম নেওয়া শিশুদের […]
ফাইল ছবি
যুক্তরাষ্ট্রের সংবিধানে সুরক্ষিত জন্মসূত্রে নাগরিকত্ব বা বার্থরাইট সিটিজেনশিপ নিয়ে দেশজুড়ে নতুন করে তীব্র আইনি ও রাজনৈতিক বিতর্ক শুরু হয়েছে। মার্কিন সংবিধানের ১৪তম সংশোধনীর প্রথম অংশে স্পষ্টভাবে বলা হয়েছে, যুক্তরাষ্ট্রে জন্মগ্রহণকারী অথবা বৈধভাবে নাগরিকত্বপ্রাপ্ত এবং মার্কিন বিচারব্যবস্থার অধীনস্থ প্রত্যেক ব্যক্তি দেশটির নাগরিক হিসেবে গণ্য হবেন।
এই সাংবিধানিক বিধানের ফলে দীর্ঘদিন ধরে যুক্তরাষ্ট্রের মাটিতে জন্ম নেওয়া শিশুদের স্বয়ংক্রিয়ভাবে নাগরিকত্ব প্রদান করা হয়ে আসছে। শিশুটির বাবা-মা নাগরিক, স্থায়ী বাসিন্দা, অস্থায়ী ভিসাধারী কিংবা অনথিভুক্ত অভিবাসী—যাই হোন না কেন, জন্মের ভিত্তিতেই নাগরিকত্ব পাওয়ার অধিকার কার্যকর থাকে। তবে সাবেক প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের একটি নির্বাহী আদেশ এই প্রতিষ্ঠিত ব্যবস্থাকে নতুন করে প্রশ্নের মুখে দাঁড় করিয়েছে।
মার্কিন গণমাধ্যম সিবিএস নিউজের এক বিশ্লেষণধর্মী প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ট্রাম্প প্রশাসনের উদ্যোগের কারণে জন্মসূত্রে নাগরিকত্ব নিয়ে দীর্ঘদিনের সাংবিধানিক ব্যাখ্যা আবারও সুপ্রিম কোর্টের নজরে এসেছে।
ইউনিভার্সিটি অব ভার্জিনিয়ার আইন বিভাগের অধ্যাপক Amanda Frost বলেন, যুক্তরাষ্ট্রের সংবিধানের ভাষা এ বিষয়ে অত্যন্ত পরিষ্কার। তার মতে, মার্কিন ভূখণ্ডে জন্ম নেওয়া ব্যক্তির নাগরিকত্ব পাওয়ার ক্ষেত্রে মাত্র দুটি সীমিত ব্যতিক্রম রয়েছে—বিদেশি কূটনীতিকদের সন্তান এবং শত্রু দেশের দখলদার সেনাবাহিনীর সদস্যদের সন্তান। এই দুটি ক্ষেত্র ছাড়া প্রায় সব ক্ষেত্রেই জন্মসূত্রে নাগরিকত্ব প্রযোজ্য।
তবে বিষয়টি নিয়ে সাধারণ মার্কিন নাগরিকদের মধ্যেও মতভেদ রয়েছে। সাম্প্রতিক এক জরিপে দেখা গেছে, প্রায় অর্ধেক মার্কিন নাগরিক মনে করেন অনথিভুক্ত অভিবাসীদের সন্তানদেরও জন্মসূত্রে নাগরিকত্ব পাওয়া উচিত। অন্যদিকে প্রায় সমসংখ্যক মানুষ এর বিরোধিতা করেছেন।
এই বিভক্ত জনমতের প্রেক্ষাপটে প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প তার দ্বিতীয় মেয়াদের শুরুতে একটি নির্বাহী আদেশ জারি করেন। আদেশটিতে বলা হয়, ১৪তম সংশোধনীর নাগরিকত্ব সংক্রান্ত ধারা কখনোই এমনভাবে ব্যাখ্যা করার কথা ছিল না যাতে যুক্তরাষ্ট্রের মাটিতে জন্ম নেওয়া প্রত্যেক ব্যক্তি স্বয়ংক্রিয়ভাবে নাগরিক হয়ে যায়। বিশেষ করে অনথিভুক্ত অভিবাসী এবং অস্থায়ীভাবে অবস্থানরত বিদেশিদের সন্তানদের নাগরিকত্বের অধিকার সীমিত করার চেষ্টা করা হয় ওই আদেশে।
আইন বিশেষজ্ঞদের মতে, এই নীতি কার্যকর হলে প্রতি বছর প্রায় আড়াই লাখ শিশু নাগরিকত্ব পাওয়ার সুযোগ হারাতে পারে।
তবে নির্বাহী আদেশটি জারির পরপরই একাধিক ফেডারেল আদালত এর বাস্তবায়ন স্থগিত করে দেয়। আদালতগুলো প্রাথমিকভাবে মত দেয় যে, আদেশটি সংবিধানের সঙ্গে সাংঘর্ষিক হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। বর্তমানে বিষয়টি মার্কিন সুপ্রিম কোর্টে বিচারাধীন রয়েছে। সুপ্রিম কোর্টের বিচারপতিরাও শুনানির সময় ট্রাম্প প্রশাসনের যুক্তি নিয়ে নানা প্রশ্ন তুলেছেন এবং অনেক বিচারপতি আদেশটির আইনগত ভিত্তি নিয়ে সন্দেহ প্রকাশ করেছেন।
জন্মসূত্রে নাগরিকত্বের ইতিহাস যুক্তরাষ্ট্রে দীর্ঘ ও জটিল। ১৮৫৭ সালে বহুল আলোচিত Dred Scott v. Sandford মামলায় সুপ্রিম কোর্ট রায় দিয়েছিল যে কৃষ্ণাঙ্গ জনগোষ্ঠী মার্কিন নাগরিক হিসেবে স্বীকৃতি পাবে না। পরে গৃহযুদ্ধের পর ১৮৬৮ সালে ১৪তম সংশোধনী পাসের মাধ্যমে সেই অবস্থার পরিবর্তন আনা হয় এবং যুক্তরাষ্ট্রে জন্মগ্রহণকারী মানুষের নাগরিকত্বের অধিকার সাংবিধানিকভাবে নিশ্চিত করা হয়।
এরপর ১৮৯৮ সালের ঐতিহাসিক United States v. Wong Kim Ark মামলায় সুপ্রিম কোর্ট পুনরায় নিশ্চিত করে যে যুক্তরাষ্ট্রে জন্ম নেওয়া শিশু নাগরিকত্ব লাভ করবে, এমনকি তার বাবা-মা বিদেশি হলেও। এই রায় পরবর্তী শতাব্দীজুড়ে জন্মসূত্রে নাগরিকত্বের অন্যতম ভিত্তি হিসেবে বিবেচিত হয়েছে।
তবে সব আইনবিদ একমত নন। কিছু গবেষক মনে করেন, ১৪তম সংশোধনীর ভাষায় কিছু বিষয় স্পষ্টভাবে ব্যাখ্যা করা হয়নি এবং “subject to the jurisdiction thereof” বা “যুক্তরাষ্ট্রের বিচারিক কর্তৃত্বাধীন” বাক্যাংশটির ভিন্ন ব্যাখ্যা সম্ভব। ট্রাম্প প্রশাসন মূলত এই যুক্তিকেই সামনে এনে জন্মসূত্রে নাগরিকত্ব সীমিত করার চেষ্টা করছে।
বিশ্বের অনেক দেশ ইতোমধ্যে জন্মসূত্রে স্বয়ংক্রিয় নাগরিকত্বের নীতি থেকে সরে এসেছে। ইউরোপের অধিকাংশ রাষ্ট্র এই ব্যবস্থা বাতিল করেছে। উদাহরণ হিসেবে ২০০৫ সালে Ireland গণভোটের মাধ্যমে তাদের জন্মসূত্রে নাগরিকত্ব নীতিতে বড় পরিবর্তন আনে।
অন্যদিকে অধ্যাপক আমান্ডা ফ্রস্টের মতো অনেক বিশেষজ্ঞ মনে করেন, যুক্তরাষ্ট্রের শক্তির অন্যতম উৎসই হচ্ছে অভিবাসীদের দ্রুত নাগরিকত্ব ও অধিকার দেওয়ার ঐতিহ্য। তাদের মতে, দেশের বৃহৎ করপোরেট খাত, উদ্ভাবন ও অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির পেছনে অভিবাসী পরিবারগুলোর অবদান অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
ফ্রস্টের ভাষায়, এই বিতর্ক কেবল আইনি নয়; এটি আমেরিকার জাতীয় পরিচয়, সমতা এবং নাগরিকত্বের মৌলিক ধারণাকে ঘিরে একটি বৃহত্তর প্রশ্ন। তার মতে, জন্মসূত্রে নাগরিকত্বের সাংবিধানিক নিশ্চয়তা যুক্তরাষ্ট্রের গণতান্ত্রিক মূল্যবোধের একটি গুরুত্বপূর্ণ ভিত্তি এবং সেটি সংরক্ষণ করা দেশের দীর্ঘমেয়াদি স্বার্থের সঙ্গেও সম্পর্কিত।
সূত্র: CBS News