বিদ্যুৎ সংকট নিয়ে জাতীয় সংসদে সরব হয়েছেন বিরোধীদলীয় নেতা ও জামায়াতে ইসলামীর আমির ডা. শফিকুর রহমান। তার দাবি, দেশের অনেক গ্রামে এখনো দিনের ১২ থেকে ১৪ ঘণ্টা পর্যন্ত বিদ্যুৎ থাকছে না। এমন বাস্তবতার মধ্যে শুধু আশ্বাস কিংবা অজুহাত দিয়ে সংকট আড়াল করার চেষ্টা করলে মানুষের সঙ্গে প্রহসন করা হবে। বিদ্যুতের প্রকৃত ঘাটতি জনগণের সামনে স্পষ্টভাবে […]
বিদ্যুৎ সংকট নিয়ে জাতীয় সংসদে সরব হয়েছেন বিরোধীদলীয় নেতা ও জামায়াতে ইসলামীর আমির ডা. শফিকুর রহমান। তার দাবি, দেশের অনেক গ্রামে এখনো দিনের ১২ থেকে ১৪ ঘণ্টা পর্যন্ত বিদ্যুৎ থাকছে না। এমন বাস্তবতার মধ্যে শুধু আশ্বাস কিংবা অজুহাত দিয়ে সংকট আড়াল করার চেষ্টা করলে মানুষের সঙ্গে প্রহসন করা হবে।
বিদ্যুতের প্রকৃত ঘাটতি জনগণের সামনে স্পষ্টভাবে তুলে ধরে সংকট মোকাবিলায় একটি বাস্তবসম্মত রোডম্যাপ দেওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন তিনি। একই সঙ্গে দুর্নীতি ও চাঁদাবাজির বিরুদ্ধে দ্রুত কঠোর ব্যবস্থা নেওয়ারও দাবি জানান।
সোমবার (৭ সেপ্টেম্বর) জাতীয় সংসদের তৃতীয় অধিবেশনে ৬৮ বিধিতে উত্থাপিত নোটিশের ওপর আলোচনায় অংশ নিয়ে এসব কথা বলেন শফিকুর রহমান। এ সময় অধিবেশনে সভাপতিত্ব করেন ডেপুটি স্পিকার ব্যারিস্টার কায়সার কামাল।
বিদ্যুতের মিটার ও ডিমান্ড চার্জ না নেওয়ার কথা সংসদে বলা হলেও বাস্তবে তা এখনো আদায় করা হচ্ছে বলে অভিযোগ করেন শফিকুর রহমান।
তার ভাষ্য, অতীতে ক্ষমতাসীনদের ঘনিষ্ঠ একটি সুবিধাভোগী গোষ্ঠীকে বিভিন্ন সুযোগ দেওয়া হয়েছে। সেই চক্র থেকে বেরিয়ে আসতে হলে শুধু পুরোনো সরকারের সমালোচনা করলেই হবে না, নীতি ও সিদ্ধান্ত বাস্তবায়নের ক্ষেত্রেও স্বচ্ছতা নিশ্চিত করতে হবে।
তিনি সতর্ক করে বলেন, জবাবদিহিতা না থাকলে বড় বড় পরিকল্পনা ও উন্নয়ন প্রকল্প শেষ পর্যন্ত কাগজে-কলমেই সীমাবদ্ধ থেকে যেতে পারে।
বিদ্যুৎ খাতের বহুল আলোচিত ক্যাপাসিটি চার্জ এবং কুইক রেন্টাল বিদ্যুৎকেন্দ্রের মেয়াদ বাড়ানো নিয়েও প্রশ্ন তোলেন বিরোধীদলীয় নেতা।
তার দাবি, কুইক রেন্টাল কেন্দ্রগুলোর সঙ্গে প্রাথমিকভাবে স্বল্পমেয়াদি চুক্তি করা হলেও মেয়াদ শেষ হওয়ার পরও বছরের পর বছর ক্যাপাসিটি চার্জ দেওয়া হয়েছে। এ ধরনের অর্থ পরিশোধকে তিনি জনগণের অর্থের অপচয় ও অনিয়ম হিসেবে সমালোচনা করেন।
অতীতের ভুল থেকে শিক্ষা না নিলে একই ধরনের সুবিধাভোগী গোষ্ঠী বারবার তৈরি হবে বলেও মন্তব্য করেন তিনি।
সরকারের বিভিন্ন বক্তব্য ও মাঠপর্যায়ের বাস্তবতার মধ্যে পার্থক্য রয়েছে বলেও অভিযোগ করেন শফিকুর রহমান।
তিনি বেনজীর আহমেদের গ্রেপ্তার প্রসঙ্গ টেনে বলেন, তাকে গ্রেপ্তারের বিষয়ে সরকারের সক্ষমতার কথা বলা হলেও বাস্তবে সেই অবস্থান কার্যকর হয়নি। একইভাবে ভূতুড়ে বিদ্যুৎ বিল বন্ধের আশ্বাস দেওয়া হলেও সমস্যাটি পুরোপুরি দূর হয়নি বলে দাবি করেন তিনি।
সরকারের নীতি ও সিদ্ধান্তে ব্যক্তিগত বা আত্মীয়স্বজনের স্বার্থ যেন প্রভাব ফেলতে না পারে, সে বিষয়েও সতর্ক থাকার আহ্বান জানান তিনি।
প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সাদামাটা জীবনযাপনের প্রশংসাও করেন বিরোধীদলীয় নেতা। তবে তার অভিযোগ, প্রধানমন্ত্রীর চারপাশে থাকা কিছু সুযোগসন্ধানী ব্যক্তি নেতার সরল জীবনযাপনের প্রশংসা করলেও বাস্তবে সেই নীতি অনুসরণ করেন না।
শফিকুর রহমান বলেন, রাজনৈতিক নেতাদের শুধু তোষামোদ না করে দেশের স্বার্থে সঠিক সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষেত্রে ভূমিকা রাখতে হবে।
বিদ্যুৎ ও জ্বালানি সংকটের প্রকৃত চিত্র লুকিয়ে রাখার সমালোচনা করে শফিকুর রহমান বলেন, দেশের গ্রামাঞ্চলে কোথাও কোথাও ১২ থেকে ১৪ ঘণ্টা পর্যন্ত বিদ্যুৎ থাকছে না।
এর ফলে দেশের বিপুলসংখ্যক গ্রামীণ মানুষকে দীর্ঘ সময় বিদ্যুৎবিহীন থাকতে হচ্ছে বলে দাবি করেন তিনি। তার মতে, সরকারের উচিত পরিস্থিতির প্রকৃত চিত্র জনগণের সামনে তুলে ধরা।
তিনি বলেন, স্বল্প, মধ্য ও দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা এবং নির্দিষ্ট সময়সূচি জনগণের সামনে প্রকাশ করা হলে মানুষও পরিস্থিতি মোকাবিলার জন্য মানসিকভাবে প্রস্তুত হতে পারবে।
তার ভাষায়, মিথ্যা আশ্বাস কিংবা হাস্যকর অজুহাত দিয়ে বর্তমান সংকট ঢেকে রাখা সম্ভব নয়।
বিদ্যুৎ সংকট মোকাবিলায় সরকারকে সহযোগিতার প্রস্তাবও দেন বিরোধীদলীয় নেতা। তার মতে, শুধু রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত নয়, সংকটের কারিগরি দিকগুলো বিবেচনায় নিয়ে একটি শক্তিশালী বিশেষ টাস্কফোর্স বা সেল গঠন করা প্রয়োজন।
এতে সরকারি দল, বিরোধী দল এবং কারিগরি বিশেষজ্ঞদের যুক্ত করে সংকট মোকাবিলার একটি সমন্বিত পরিকল্পনা তৈরির প্রস্তাব দেন তিনি।
শফিকুর রহমান বলেন, এ কাজে বিরোধী দলের কোনো কৃতিত্বের প্রয়োজন নেই। সরকার যদি পুরো কৃতিত্বও নেয়, তাতেও তাদের আপত্তি নেই—তাদের মূল লক্ষ্য হলো কার্যকর সমাধান এবং দেশের উন্নতি।
রাজনৈতিক ক্ষমতা ও সংসদীয় পদ কোনো কিছুই স্থায়ী নয়—এ কথাও মনে করিয়ে দেন শফিকুর রহমান।
তিনি বলেন, অতীতে যারা সরকার ও বিরোধী—দুই ভূমিকাতেই ছিল, তাদের অনেকেই এখন সংসদে নেই। বর্তমান দায়িত্বশীলদের সেখান থেকে শিক্ষা নেওয়া উচিত।
দেশের মানুষের স্বার্থে এখন যেসব ভালো সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে, সেগুলোই ভবিষ্যতে ইতিহাসের অংশ হয়ে থাকবে বলে মন্তব্য করেন তিনি।
একই সঙ্গে দুর্নীতিবাজ ও চাঁদাবাজদের বিরুদ্ধে রাজনৈতিক হিসাব-নিকাশের বাইরে গিয়ে দ্রুত কঠোর ব্যবস্থা নেওয়ার আহ্বান জানান বিরোধীদলীয় নেতা।
তার বক্তব্যের মূল সুর ছিল—বিদ্যুৎ সংকটকে রাজনৈতিক বিতর্কে সীমাবদ্ধ না রেখে বাস্তব পরিস্থিতি স্বীকার করতে হবে এবং জনগণের দুর্ভোগ কমাতে স্বচ্ছ, বাস্তবসম্মত ও সময়ভিত্তিক পদক্ষেপ নিতে হবে।