ইতিহাস, ঐতিহ্য ও স্থাপত্যের অপূর্ব সমন্বয়ে গড়ে ওঠা তাজহাট জমিদার বাড়ি রংপুরের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ ঐতিহাসিক স্থাপনা। রংপুর শহরের পুরান রংপুরের তাজহাট এলাকায় অবস্থিত এই প্রাসাদ বর্তমানে জাদুঘর হিসেবে ব্যবহৃত হচ্ছে। দেশের বিভিন্ন স্থান থেকে আসা পর্যটকদের কাছে এটি রংপুরের অন্যতম আকর্ষণীয় দর্শনীয় স্থান। রংপুর শহরের জিরো পয়েন্ট থেকে প্রায় ৬ কিলোমিটার দক্ষিণ-পূর্ব দিকে অবস্থিত তাজহাট […]
ইতিহাস, ঐতিহ্য ও স্থাপত্যের অপূর্ব সমন্বয়ে গড়ে ওঠা তাজহাট জমিদার বাড়ি রংপুরের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ ঐতিহাসিক স্থাপনা। রংপুর শহরের পুরান রংপুরের তাজহাট এলাকায় অবস্থিত এই প্রাসাদ বর্তমানে জাদুঘর হিসেবে ব্যবহৃত হচ্ছে। দেশের বিভিন্ন স্থান থেকে আসা পর্যটকদের কাছে এটি রংপুরের অন্যতম আকর্ষণীয় দর্শনীয় স্থান।
রংপুর শহরের জিরো পয়েন্ট থেকে প্রায় ৬ কিলোমিটার দক্ষিণ-পূর্ব দিকে অবস্থিত তাজহাট জমিদার বাড়ি। বিশাল প্রাসাদ, প্রশস্ত মাঠ, গাছের সারি, পুকুর এবং দৃষ্টিনন্দন স্থাপত্যের কারণে জায়গাটি একই সঙ্গে ইতিহাসপ্রেমী ও পর্যটকদের আকৃষ্ট করে।
তাজহাট জমিদার বাড়ির নির্মাণকাজ শুরু হয় বিংশ শতাব্দীর শুরুর দিকে। মহারাজা কুমার গোপাল লাল রায় প্রাসাদটি নির্মাণ করেন। বিশাল এই স্থাপনা নির্মাণে প্রায় ১০ বছর সময় লেগেছিল বলে জানা যায়।
গোপাল লাল রায় ছিলেন একজন হিন্দু এবং পেশায় স্বর্ণকার। কথিত আছে, তাঁর ব্যবহৃত মনোমুগ্ধকর ‘তাজ’ বা মুকুটের সঙ্গে এই এলাকার নামের সম্পর্ক রয়েছে। সেই থেকেই এলাকাটি ‘তাজহাট’ নামে পরিচিত হয়ে ওঠে বলে প্রচলিত রয়েছে।
তবে তাজহাট জমিদার বাড়ির ইতিহাস শুধু জমিদারি আমলেই সীমাবদ্ধ নয়। ১৯৮৪ থেকে ১৯৯১ সাল পর্যন্ত এই প্রাসাদ রংপুর হাইকোর্ট হিসেবে ব্যবহৃত হয়। সে সময় বিচার বিভাগ বিকেন্দ্রীকরণের উদ্যোগের অংশ হিসেবে দেশের বিভিন্ন জেলা সদরে হাইকোর্টের আঞ্চলিক বেঞ্চ স্থাপন করা হয়েছিল। রংপুরেও এমন একটি বেঞ্চ স্থাপন করা হয় এবং তাজহাটের এই প্রাসাদটি সেই কাজে ব্যবহৃত হয়।
১৯৯১ সালে গণতান্ত্রিক সরকার প্রতিষ্ঠার পর হাইকোর্টের আঞ্চলিক বেঞ্চের এই ব্যবস্থা বিলুপ্ত হলে প্রাসাদটির সেই ব্যবহারও শেষ হয়।
পরবর্তীতে ১৯৯৫ সালে বাংলাদেশ সরকারের প্রত্নতত্ত্ব বিভাগ তাজহাট জমিদার বাড়িকে সংরক্ষিত স্থাপনা হিসেবে ঘোষণা করে। ঐতিহাসিক ও প্রত্নতাত্ত্বিক গুরুত্ব বিবেচনায় ২০০৫ সালে রংপুর জাদুঘরকে এই প্রাসাদের দ্বিতীয় তলায় স্থানান্তর করা হয়। এরপর থেকেই প্রাসাদটি ঐতিহাসিক স্থাপনার পাশাপাশি জাদুঘর হিসেবেও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে।
মার্বেলের সিঁড়ি পেরিয়ে জাদুঘরে প্রবেশ করলে বিভিন্ন সময়ের গুরুত্বপূর্ণ প্রত্ননিদর্শনের দেখা মেলে। সেখানে দশম ও একাদশ শতাব্দীর টেরাকোটা শিল্পকর্ম রয়েছে। পাশাপাশি সংস্কৃত ও আরবি ভাষায় লেখা বেশ কিছু প্রাচীন পাণ্ডুলিপিও সংরক্ষিত রয়েছে।
জাদুঘরের সংগ্রহে মুঘল সম্রাট আওরঙ্গজেবের সময়ের কুরআন, মহাভারত ও রামায়ণের মতো গুরুত্বপূর্ণ প্রাচীন গ্রন্থ রয়েছে বলে জানা যায়। এছাড়া পেছনের একটি কক্ষে কালো পাথরে নির্মিত হিন্দু দেবতা বিষ্ণুর বেশ কয়েকটি প্রতিকৃতিও রয়েছে।
তবে জাদুঘরের ভেতরে ছবি তোলার ওপর নিষেধাজ্ঞা রয়েছে।
প্রাসাদের চারপাশেও রয়েছে দর্শনার্থীদের আকৃষ্ট করার মতো পরিবেশ। বিশাল খোলা মাঠ, সারি সারি গাছ এবং প্রাসাদের দুই পাশে থাকা দুটি পুকুর পুরো স্থানটিকে আরও মনোরম করে তুলেছে। নির্দিষ্ট প্রবেশমূল্য পরিশোধ করে জাদুঘরে প্রবেশ করা যায়। প্রাসাদ চত্বরে গাড়ি নিয়ে প্রবেশের ক্ষেত্রেও নির্দিষ্ট ফি রয়েছে।
তাজহাট জমিদার বাড়ির সবচেয়ে আকর্ষণীয় দিকগুলোর একটি হলো এর স্থাপত্যশৈলী। প্রায় ২১০ ফুট প্রশস্ত এবং চারতলা ভবনের সমান উঁচু এই প্রাসাদের নির্মাণশৈলীতে প্রাচীন মুঘল স্থাপত্যের প্রভাব স্পষ্টভাবে দেখা যায়।
প্রাসাদের মাঝখানে রয়েছে বিশাল একটি গম্বুজ। এর দুই পাশে বিস্তৃত দালান ও স্থাপত্য বিন্যাস দূর থেকে দেখলে অনেকটা মসজিদের অবয়বের কথা মনে করিয়ে দেয়।
প্রাসাদে মোট ৩১টি সিঁড়ি রয়েছে। সিঁড়িগুলো ইতালীয় ঘরানার মার্বেল পাথর দিয়ে তৈরি। সিঁড়ি থেকে জাদুঘর পর্যন্ত মেঝের বড় অংশেও একই ধরনের মার্বেল পাথরের ব্যবহার দেখা যায়।
প্রাসাদের সামনের অংশ প্রায় ৭৬ মিটার প্রশস্ত। ভবনটি পূর্বমুখী এবং এর মাঝখানে রয়েছে একটি প্রশস্ত ও দৃষ্টিনন্দন সিঁড়ি। আমদানি করা সাদা মার্বেল দিয়ে তৈরি এই সিঁড়ি বারান্দা থেকে সরাসরি ওপরের তলায় উঠে গেছে।
ছাদের মাঝখানে রয়েছে লম্বা অষ্টভুজাকার অংশসহ একটি পাঁজর-শঙ্কুযুক্ত গম্বুজ। ভবনের বিভিন্ন অংশে সরু স্তম্ভের সারি স্থাপন করা হয়েছে, যা স্থাপনাটির সৌন্দর্যের পাশাপাশি কাঠামোগত দৃঢ়তাও বাড়িয়েছে।
সিঁড়ির দুই পাশের রেলিং মূলত ইতালীয় মার্বেল দিয়ে তৈরি ছিল। এগুলোতে ধ্রুপদি রোমান সাম্রাজ্যের বিভিন্ন মূর্তি ও ভাস্কর্য দিয়ে অলংকরণ করা হয়েছিল বলে জানা যায়। তবে সময়ের সঙ্গে এসব ভাস্কর্যের অনেক কিছুই আর টিকে নেই।
প্রাসাদের সামনের অংশের দুই প্রান্তে রয়েছে অর্ধ-অষ্টভুজাকার বারান্দা এবং মাঝখানে রয়েছে একটি কেন্দ্রীয় সাজানো বারান্দা। পুরো স্থাপত্য বিন্যাসে নান্দনিকতা ও জাঁকজমকের ছাপ রয়েছে।
তাজহাট জমিদার বাড়িকে ঘিরে স্থানীয়ভাবে বেশ কিছু জনশ্রুতিও প্রচলিত রয়েছে। প্রাসাদের পেছনে একটি গুপ্ত সিঁড়ি রয়েছে। প্রচলিত ধারণা অনুযায়ী, এই সিঁড়ি একটি সুড়ঙ্গের সঙ্গে যুক্ত ছিল এবং সেই সুড়ঙ্গের মাধ্যমে সরাসরি ঘাঘট নদীর সঙ্গে যোগাযোগ ছিল।
তবে এটি মূলত জনশ্রুতি হিসেবেই পরিচিত। বর্তমানে নিরাপত্তাজনিত কারণে ওই গুপ্ত সিঁড়ি বন্ধ রাখা হয়েছে।
প্রাসাদ চত্বরে থাকা একটি পুরোনো ফোয়ারাও দর্শনার্থীদের নজর কাড়ে। সময়ের প্রভাবে ফোয়ারাটির সাদা মার্বেল ও সবুজাভ নকশার কিছুটা জৌলুশ কমে গেলেও এর নান্দনিকতা এখনও চোখে পড়ে। প্রচলিত রয়েছে, ফোয়ারাটি বিশেষভাবে রানির জন্য নির্মাণ করা হয়েছিল।
তাজহাট জমিদার বাড়ির নকশায় ‘U’ আকৃতির বিন্যাসের বৈশিষ্ট্য রয়েছে। প্রবেশপথের বাইরে নিচতলায় রয়েছে একটি বিশাল হলঘর, যার আয়তন প্রায় ১৮ মিটার × ১৩ মিটারের বেশি।
ভেতরের ব্লকের পুরো দৈর্ঘ্যজুড়ে প্রায় ৩ মিটার প্রশস্ত একটি গলি রয়েছে। ওপরের তলায় যাওয়ার জন্য দুটি প্রশস্ত কাঠের সিঁড়ির ব্যবস্থাও রয়েছে। প্রাসাদের দুই তলায় প্রায় ২২টি কক্ষ রয়েছে বলে জানা যায়।
সময়ের সঙ্গে তাজহাট জমিদার বাড়ির ব্যবহার ও পরিচয়ে পরিবর্তন এলেও এর ঐতিহাসিক গুরুত্ব কমেনি। জমিদারি আমলের স্মৃতি, আদালত হিসেবে ব্যবহারের ইতিহাস, প্রত্ননিদর্শনের সংগ্রহ এবং অনন্য স্থাপত্যশৈলী—সব মিলিয়ে এটি রংপুরের ইতিহাস ও ঐতিহ্যের গুরুত্বপূর্ণ অংশ হয়ে আছে।
বর্তমানে জাদুঘর হিসেবে ব্যবহৃত এই প্রাসাদ অতীতের স্থাপত্য ও সংস্কৃতির সঙ্গে বর্তমান প্রজন্মের একটি সংযোগ তৈরি করছে। রংপুরে ঘুরতে যাওয়া দর্শনার্থীদের কাছে তাই তাজহাট জমিদার বাড়ি শুধু একটি পুরোনো প্রাসাদ নয়; এটি উত্তরবঙ্গের সমৃদ্ধ ইতিহাস ও স্থাপত্য ঐতিহ্যের একটি জীবন্ত নিদর্শন।