সম্পূর্ণ নিউজ বাংলা-ভয়েজ

ইতিহাস ও ঐতিহ্য
৪:৩২ পিএম, ২৯ জুন ২০২৬

মুন্সীগঞ্জে জগদীশ চন্দ্র বসুর পৈতৃক ভিটা, বিজ্ঞানের ইতিহাসের এক জীবন্ত সাক্ষী

বাংলার মাটিতে জন্ম নেওয়া বিশ্বখ্যাত বিজ্ঞানীদের মধ্যে অন্যতম স্যার জগদীশ চন্দ্র বসু। উদ্ভিদের জীবন ও সাড়া দেওয়ার ক্ষমতা নিয়ে তার যুগান্তকারী গবেষণা বিশ্ববিজ্ঞানে নতুন দিগন্তের সূচনা করেছিল। বেতার যোগাযোগ প্রযুক্তির প্রাথমিক গবেষণাতেও ছিল তার গুরুত্বপূর্ণ অবদান। সেই মহান বিজ্ঞানীর স্মৃতি আজও জীবন্ত হয়ে আছে তার পৈতৃক ভিটায়, মুন্সীগঞ্জের রাঢ়িখালে। ঢাকা থেকে মাত্র কয়েক ঘণ্টার পথ […]

মুন্সীগঞ্জে জগদীশ চন্দ্র বসুর পৈতৃক ভিটা, বিজ্ঞানের ইতিহাসের এক জীবন্ত সাক্ষী
নিজস্ব প্রতিবেদক
৩ মিনিটে পড়ুন |

বাংলার মাটিতে জন্ম নেওয়া বিশ্বখ্যাত বিজ্ঞানীদের মধ্যে অন্যতম স্যার জগদীশ চন্দ্র বসু। উদ্ভিদের জীবন ও সাড়া দেওয়ার ক্ষমতা নিয়ে তার যুগান্তকারী গবেষণা বিশ্ববিজ্ঞানে নতুন দিগন্তের সূচনা করেছিল। বেতার যোগাযোগ প্রযুক্তির প্রাথমিক গবেষণাতেও ছিল তার গুরুত্বপূর্ণ অবদান। সেই মহান বিজ্ঞানীর স্মৃতি আজও জীবন্ত হয়ে আছে তার পৈতৃক ভিটায়, মুন্সীগঞ্জের রাঢ়িখালে।

ঢাকা থেকে মাত্র কয়েক ঘণ্টার পথ পেরোলেই পৌঁছে যাওয়া যায় ইতিহাস ও বিজ্ঞানের এই স্মৃতিধন্য ঠিকানায়। মুন্সীগঞ্জ জেলার শ্রীনগর উপজেলার রাঢ়িখাল গ্রামেই ১৮৫৮ সালের ৩০ নভেম্বর জন্মগ্রহণ করেন জগদীশ চন্দ্র বসু। তৎকালীন বিক্রমপুরের এই গ্রাম আজও বহন করে চলেছে তার শৈশব, পরিবার এবং বিজ্ঞানচর্চার স্মৃতি।

বিজ্ঞানীর পৈতৃক ভিটাকে কেন্দ্র করে বর্তমানে গড়ে উঠেছে জগদীশ চন্দ্র বসু স্মৃতি জাদুঘর ও জগদীশ চন্দ্র বসু কমপ্লেক্স। প্রায় ৩০ একর জায়গাজুড়ে বিস্তৃত এই কমপ্লেক্স এখন দেশের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ বিজ্ঞান ও ঐতিহ্যভিত্তিক দর্শনীয় স্থানে পরিণত হয়েছে।

কমপ্লেক্সে প্রবেশ করতেই চোখে পড়ে সবুজে ঘেরা শান্ত পরিবেশ। বিশাল গাছপালা, শানবাঁধানো পুকুরঘাট, কৃত্রিম পাহাড়, ঝরনা এবং নান্দনিক স্থাপনা পুরো এলাকাকে দিয়েছে ভিন্ন এক আবহ। শহরের ব্যস্ততা থেকে দূরে প্রকৃতির সান্নিধ্যে কিছুটা সময় কাটানোর জন্যও এটি একটি আদর্শ স্থান।

এখানকার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ আকর্ষণ হলো জগদীশ চন্দ্র বসু স্মৃতি জাদুঘর। জাদুঘরটিতে সংরক্ষিত রয়েছে বিজ্ঞানীর জীবন ও কর্মের সঙ্গে জড়িয়ে থাকা বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ স্মারক ও দলিল। রয়েছে তার প্রতিকৃতি, বিভিন্ন গবেষণাপত্র, হাতে লেখা নথি, উদ্ভিদের সাড়া পরিমাপের জন্য ব্যবহৃত বিখ্যাত ক্রেসমোগ্রাফ যন্ত্রের ছবি, রয়্যাল সোসাইটিতে উপস্থাপিত বক্তৃতার অনুলিপি এবং তার জীবনের বিভিন্ন সময়ের দুর্লভ আলোকচিত্র।

এছাড়াও এখানে সংরক্ষিত রয়েছে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের সঙ্গে তার পত্র যোগাযোগের বিভিন্ন স্মারক। রবীন্দ্রনাথের নোবেল পুরস্কার প্রাপ্তি উপলক্ষে লেখা জগদীশ চন্দ্র বসুর চিঠি এবং তাকে লেখা রবীন্দ্রনাথের চিঠিও দর্শনার্থীদের আগ্রহের কেন্দ্রবিন্দু হয়ে উঠেছে।

জগদীশ চন্দ্র বসু শুধু একজন বিজ্ঞানীই ছিলেন না, তিনি ছিলেন শিক্ষার প্রসার এবং সমাজ উন্নয়নেরও একজন প্রবক্তা। তার ও তার স্ত্রী অবলা বসুর উদ্যোগে রাঢ়িখালে একটি মন্দিরভিত্তিক পাঠশালার যাত্রা শুরু হয়েছিল, যা পরবর্তীতে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে রূপ নেয়। বর্তমানে সেটি স্যার জে. সি. বসু ইনস্টিটিউশন অ্যান্ড কলেজ নামে পরিচিত।

স্থানীয়দের উদ্যোগ এবং সরকারি সহযোগিতায় ২০১১ সালে বিজ্ঞানীর স্মৃতি সংরক্ষণের লক্ষ্যে এই কমপ্লেক্স নির্মাণ করা হয়। এরপর থেকে দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে শিক্ষার্থী, গবেষক, বিজ্ঞান অনুরাগী এবং সাধারণ দর্শনার্থীরা এখানে আসছেন। বিশেষ করে শিক্ষা সফরের অংশ হিসেবে প্রতিবছর অসংখ্য শিক্ষার্থী এই স্থান পরিদর্শন করে বিজ্ঞানীর জীবন ও অবদান সম্পর্কে জানার সুযোগ পাচ্ছে।

তবে সময়ের সঙ্গে সঙ্গে জাদুঘরের কিছু অংশ এবং পুরোনো স্থাপনাগুলো সংস্কারের প্রয়োজনীয়তা দেখা দিয়েছে। স্থানীয়দের প্রত্যাশা, যথাযথ সংরক্ষণ ও আধুনিকায়নের মাধ্যমে ভবিষ্যতে এটি আন্তর্জাতিক মানের একটি বিজ্ঞান ও ঐতিহ্যভিত্তিক পর্যটনকেন্দ্রে পরিণত হবে।

ঢাকা থেকে একদিনের ভ্রমণেই ঘুরে আসা সম্ভব এই ঐতিহাসিক স্থানটি। গুলিস্তান বা যাত্রাবাড়ী থেকে মাওয়া বা দোহারগামী বাসে শ্রীনগর এলাকায় নেমে অটোরিকশা কিংবা স্থানীয় পরিবহনে সহজেই পৌঁছে যাওয়া যায় রাঢ়িখালের এই স্মৃতিবিজড়িত ঠিকানায়।

বাঙালির বিজ্ঞানচর্চার ইতিহাস, ঐতিহ্য এবং গৌরবময় অতীতকে কাছ থেকে অনুভব করতে চাইলে মুন্সীগঞ্জে জগদীশ চন্দ্র বসুর পৈতৃক ভিটা হতে পারে এক অনন্য গন্তব্য। এটি শুধু একটি বাড়ি নয়, বরং বাঙালির বৈজ্ঞানিক অর্জন ও জ্ঞানচর্চার এক জীবন্ত সাক্ষী।

Facebook Comments Box
Advertise with us
এ বিভাগের আরও খবর


আর্কাইভ ক্যালেণ্ডার
Su Mo Tu We Th Fr Sa
Advertise with us
আরও বাংলা-ভয়েজ সংবাদ