মধ্যপ্রাচ্যের চলমান সংঘাতকে কেন্দ্র করে যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্রনীতি ও সামরিক সিদ্ধান্তে ইসরাইলের প্রভাব নিয়ে নতুন করে বিতর্ক শুরু হয়েছে। বিশ্লেষকদের একাংশের দাবি, ইরানকে ঘিরে সাম্প্রতিক সংঘাত, সৌদি আরবের সঙ্গে কৌশলগত সমঝোতা এবং আঞ্চলিক নিরাপত্তা প্রশ্নে ওয়াশিংটনের অবস্থান নির্ধারণে তেল আবিবের ভূমিকা আগের যেকোনো সময়ের তুলনায় বেশি দৃশ্যমান হয়ে উঠেছে। মিডল ইস্ট মনিটরে প্রকাশিত এক বিশ্লেষণে বলা […]
ছবি: সংগৃহীত
মধ্যপ্রাচ্যের চলমান সংঘাতকে কেন্দ্র করে যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্রনীতি ও সামরিক সিদ্ধান্তে ইসরাইলের প্রভাব নিয়ে নতুন করে বিতর্ক শুরু হয়েছে। বিশ্লেষকদের একাংশের দাবি, ইরানকে ঘিরে সাম্প্রতিক সংঘাত, সৌদি আরবের সঙ্গে কৌশলগত সমঝোতা এবং আঞ্চলিক নিরাপত্তা প্রশ্নে ওয়াশিংটনের অবস্থান নির্ধারণে তেল আবিবের ভূমিকা আগের যেকোনো সময়ের তুলনায় বেশি দৃশ্যমান হয়ে উঠেছে।
মিডল ইস্ট মনিটরে প্রকাশিত এক বিশ্লেষণে বলা হয়েছে, ইসরাইল দীর্ঘদিন ধরেই যুক্তরাষ্ট্রকে ইরানের বিরুদ্ধে আরও কঠোর অবস্থান নিতে উৎসাহিত করে আসছে। সমালোচকদের মতে, এর ফলে যুক্তরাষ্ট্রকে সামরিক ও অর্থনৈতিকভাবে বড় মূল্য দিতে হচ্ছে, আর ইসরাইল তুলনামূলকভাবে নিরাপদ অবস্থানে থেকে পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করছে।
বিশ্লেষণে উল্লেখ করা হয়, যুক্তরাষ্ট্র যখন মধ্যপ্রাচ্যে সামরিক অভিযান পরিচালনা করছে, তখন সেই অভিযানের অর্থায়ন করছে মার্কিন করদাতারা এবং এতে ঝুঁকির মুখে পড়ছেন মার্কিন সেনারা। অন্যদিকে, ইসরাইল নিজস্ব প্রতিরক্ষা সক্ষমতা সংরক্ষণ করে ভবিষ্যৎ কৌশলগত প্রয়োজনের জন্য প্রস্তুতি নিচ্ছে বলে দাবি করা হয়েছে।
সম্প্রতি ইসরাইলের অর্থমন্ত্রী বেজালেল স্মোটরিচ এক বক্তব্যে বলেন, ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে সীমিত সংঘাত বর্তমান পরিস্থিতিতে ইসরাইলের জন্য সবচেয়ে সুবিধাজনক। এই বক্তব্য আন্তর্জাতিক অঙ্গনে ব্যাপক আলোচনার জন্ম দেয়।
এদিকে মার্কিন প্রতিরক্ষামন্ত্রী পিট হেগসেথ কংগ্রেসে সামরিক ব্যয় বৃদ্ধির পক্ষে অবস্থান নিয়েছেন। সমালোচকদের প্রশ্ন, যুক্তরাষ্ট্র এমন এক সংঘাতে আরও অর্থ ব্যয় করছে, যার কৌশলগত লক্ষ্য ও পরিণতি নিয়ে ওয়াশিংটনের মধ্যেই স্পষ্ট ঐকমত্য নেই।
বিশ্লেষণে আরও বলা হয়েছে, সৌদি আরবের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের সম্ভাব্য বেসামরিক পারমাণবিক সহযোগিতা চুক্তিও ইসরাইলের আপত্তির মুখে নতুন শর্তের সম্মুখীন হয়েছে।
প্রতিবেদন অনুযায়ী, চুক্তির প্রাথমিক অগ্রগতির পর প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ঘোষণা দেন, সৌদি আরবকে আগে ইসরাইলের সঙ্গে সম্পর্ক স্বাভাবিক করতে হবে। এরপরই ইসরাইলের কয়েকজন মন্ত্রী প্রকাশ্যে দাবি করেন, আঞ্চলিক নিরাপত্তা ও কৌশলগত বিষয়ে তাদের ‘রেড লাইন’ বা সীমারেখা যুক্তরাষ্ট্রের কাছে স্পষ্ট করে দেওয়া হয়েছে।
সমালোচকদের মতে, এই ঘটনা মধ্যপ্রাচ্য নীতিতে ইসরাইলের রাজনৈতিক প্রভাবের একটি গুরুত্বপূর্ণ উদাহরণ হিসেবে দেখা হচ্ছে।
বিশ্লেষণে বলা হয়েছে, ইরানের বিরুদ্ধে নিষেধাজ্ঞা, সামরিক চাপ এবং কূটনৈতিক অবস্থান—সব ক্ষেত্রেই যুক্তরাষ্ট্রের নীতিতে ইসরাইলের উদ্বেগ বড় ভূমিকা পালন করেছে।
অন্যদিকে, যুক্তরাষ্ট্রের প্রশাসন বরাবরই বলে আসছে, তাদের নীতির মূল উদ্দেশ্য হলো আঞ্চলিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করা এবং ইরানকে পারমাণবিক অস্ত্র অর্জন থেকে বিরত রাখা। ওয়াশিংটনের মতে, এসব সিদ্ধান্ত যুক্তরাষ্ট্রের নিজস্ব জাতীয় নিরাপত্তা স্বার্থ বিবেচনায় নেওয়া হয়।
মিডল ইস্ট মনিটরের বিশ্লেষণে আরও দাবি করা হয়েছে, কিছু আরব রাষ্ট্র দীর্ঘদিন ধরে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সম্পর্ক জোরদার করতে রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক বিনিয়োগ করেছে। তবে সমালোচকদের মতে, এসব প্রচেষ্টা অনেক সময় প্রত্যাশিত ফল দেয়নি।
বিশ্লেষণে বিশেষভাবে সাবেক মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের জামাতা জ্যারেড কুশনারের ভূমিকার কথাও উল্লেখ করা হয়েছে। সেখানে বলা হয়েছে, মধ্যপ্রাচ্য নীতি ও আঞ্চলিক সমঝোতার ক্ষেত্রে তিনি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করলেও সমালোচকদের মতে, তার অবস্থান অনেক ক্ষেত্রেই ইসরাইলপন্থী ছিল।
বিশ্লেষণের উপসংহারে বলা হয়েছে, মধ্যপ্রাচ্যের বর্তমান বাস্তবতায় যুক্তরাষ্ট্র, ইসরাইল এবং আরব দেশগুলোর সম্পর্ক নতুন এক কৌশলগত পর্যায়ে প্রবেশ করেছে। তবে যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্রনীতি কতটা নিজস্ব জাতীয় স্বার্থ দ্বারা পরিচালিত এবং কতটা মিত্র রাষ্ট্রগুলোর নিরাপত্তা উদ্বেগ দ্বারা প্রভাবিত—সে প্রশ্ন এখনও আন্তর্জাতিক রাজনীতিতে আলোচনার বিষয় হয়ে রয়েছে।
সূত্র: মিডল ইস্ট মনিটর