সম্পূর্ণ নিউজ বাংলা-ভয়েজ

আন্তর্জাতিক
২:০৯ অপরাহ্ন, ৩১ অক্টোবর ২০২৬

নিষেধাজ্ঞা এড়িয়ে সামরিক সরঞ্জাম আমদানিতে ইরানের ৫ হাজার প্রতিষ্ঠানের নেটওয়ার্ক: রয়টার্স

যুক্তরাষ্ট্রের অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞা ও নৌ-অবরোধের মধ্যেও সামরিক সরঞ্জাম, বিস্ফোরক এবং ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন তৈরির উপকরণ আমদানি অব্যাহত রেখেছে ইরান। এ কাজে দেশটি প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়ের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট ৫ হাজারের বেশি প্রতিষ্ঠানের একটি গোপন নেটওয়ার্ক ব্যবহার করছে। ২০২৫ সালের জানুয়ারি থেকে এ পর্যন্ত এই নেটওয়ার্কের মাধ্যমে অন্তত ২০০ কোটি ডলারের সামরিক ও দ্বৈত ব্যবহারযোগ্য সরঞ্জাম আমদানি করা […]

নিষেধাজ্ঞা এড়িয়ে সামরিক সরঞ্জাম আমদানিতে ইরানের ৫ হাজার প্রতিষ্ঠানের নেটওয়ার্ক: রয়টার্স

ছবি: সংগৃহীত

নিজস্ব প্রতিবেদক
৪ মিনিটে পড়ুন |

যুক্তরাষ্ট্রের অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞা ও নৌ-অবরোধের মধ্যেও সামরিক সরঞ্জাম, বিস্ফোরক এবং ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন তৈরির উপকরণ আমদানি অব্যাহত রেখেছে ইরান। এ কাজে দেশটি প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়ের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট ৫ হাজারের বেশি প্রতিষ্ঠানের একটি গোপন নেটওয়ার্ক ব্যবহার করছে। ২০২৫ সালের জানুয়ারি থেকে এ পর্যন্ত এই নেটওয়ার্কের মাধ্যমে অন্তত ২০০ কোটি ডলারের সামরিক ও দ্বৈত ব্যবহারযোগ্য সরঞ্জাম আমদানি করা হয়েছে বলে এক অনুসন্ধানে জানিয়েছে বার্তা সংস্থা রয়টার্স।

২৯ অক্টোবর প্রকাশিত রয়টার্সের এই বিশেষ অনুসন্ধানটি করা হয়েছে ইসরায়েলি-আমেরিকান ঝুঁকি বিশ্লেষণকারী প্রতিষ্ঠান ‘২৪০ অ্যানালিটিক্স’-এর সহযোগিতায়। ইরানের ব্যাংক ও সরকারি নথি, কোম্পানির নিবন্ধনসংক্রান্ত তথ্য এবং আমদানি-সংক্রান্ত প্রায় ১৯ হাজার রেকর্ড বিশ্লেষণ করে নেটওয়ার্কটির কার্যক্রমের চিত্র তুলে ধরেছে প্রতিষ্ঠান দুটি।

রয়টার্সের অনুসন্ধানে দেখা যায়, নেটওয়ার্কের প্রতিষ্ঠানগুলোর নামের শুরুতে ‘এমওডি’ (MOD) অক্ষরগুলো রয়েছে, যা ইরানের প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়কে নির্দেশ করে। এরপর পাঁচ বা ছয় অঙ্কের একটি নম্বর ব্যবহার করা হয়। প্রতিষ্ঠানগুলোর নিবন্ধিত ঠিকানা তেহরানে দেশটির প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয় ও সশস্ত্র বাহিনীর লজিস্টিক বিভাগের ঠিকানার সঙ্গে মিলে যায়।

এসব প্রতিষ্ঠানের কয়েকটির সঙ্গে ইরানের ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ড কর্পস (আইআরজিসি) এবং দেশটির প্রভাবশালী অর্থনৈতিক প্রতিষ্ঠান ‘বুনিয়াদ’-এর যোগসূত্র রয়েছে। বিদেশি মধ্যস্থতাকারী ও নামসর্বস্ব কোম্পানির মাধ্যমে এসব প্রতিষ্ঠান আমদানি কার্যক্রম পরিচালনা করে। রয়টার্সের অনুসন্ধান অনুযায়ী, নিষেধাজ্ঞার আওতায় থাকা তেল বিক্রির অর্থ ব্যবহার করেও সামরিক সরঞ্জাম কেনা হচ্ছে।

লেনদেনের ৯৭ শতাংশে আন্তর্জাতিক মুদ্রা স্থানান্তর হয়নি

রয়টার্সের পর্যালোচনা করা আমদানি চালানের ৯৭ শতাংশের ক্ষেত্রে ‘মুদ্রা স্থানান্তর ছাড়া’ লেনদেন সম্পন্ন হওয়ার তথ্য পাওয়া গেছে। অর্থাৎ, আন্তর্জাতিক ব্যাংকিং ব্যবস্থার মাধ্যমে সরাসরি অর্থ পাঠানোর পরিবর্তে বিদেশে থাকা ব্যাংক হিসাবে জমা অর্থ ব্যবহার করে মধ্যস্থতাকারীরা পণ্য কিনেছেন। পরে সেসব পণ্য ইরানে পাঠানো হয়েছে। এ পদ্ধতিতে আন্তর্জাতিক আর্থিক লেনদেনের নজরদারি এড়ানো সহজ হয়।

আমদানি করা পণ্যের উৎস হিসেবে চীন, রাশিয়া, জার্মানি, ইউরোপীয় ইউনিয়নের অন্যান্য দেশ এবং সংযুক্ত আরব আমিরাতের নাম উঠে এসেছে। এসব পণ্যের মধ্যে ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন তৈরির কাঁচামাল, বিস্ফোরক, উড়োজাহাজের যন্ত্রাংশ, সূক্ষ্ম যন্ত্রপাতি এবং ভারী যানবাহন রয়েছে। বিশেষজ্ঞদের মতে, এসব সরঞ্জামের অনেকগুলো সামরিক কাজে ব্যবহারের পাশাপাশি বেসামরিক কাজেও ব্যবহার করা সম্ভব।

এক প্রতিষ্ঠানের আমদানি ২৩০ কোটি ডলারের

নেটওয়ার্কের মধ্যে ‘এমওডি ৩৪৬৪২৮’ নম্বরের একটি প্রতিষ্ঠানকে বড় আমদানিকারক হিসেবে চিহ্নিত করেছে রয়টার্স। ২০২৫ সালের জানুয়ারি থেকে ২০২৬ সালের জুন পর্যন্ত প্রতিষ্ঠানটি প্রায় ২৩০ কোটি ডলারের সামরিক সরঞ্জাম আমদানি করেছে বলে আমদানি তথ্য বিশ্লেষণ করে জানিয়েছে সংবাদ সংস্থাটি।

২০২৫ সালের জানুয়ারি থেকে এপ্রিলের মধ্যে প্রতিষ্ঠানটি চীন থেকে ৮৮৬ টন রাসায়নিক উপাদান আমদানি করে। আমদানির নথিতে এসব পণ্যের শ্রেণিতে সোডিয়াম ক্লোরেট ও পারক্লোরেটের মতো রাসায়নিক ছিল, যা কঠিন জ্বালানিচালিত রকেট তৈরিতে ব্যবহৃত হয়।

এই চালানের শেষ অংশ বন্দরে পৌঁছানোর তিন দিন পর, ২০২৫ সালের ২৬ এপ্রিল ইরানের বন্দর আব্বাসের শহীদ রাজাই বন্দরে ভয়াবহ বিস্ফোরণ ঘটে। এতে অন্তত ৭০ জন নিহত এবং ১ হাজার ২০০ জনের বেশি আহত হন।

বিস্ফোরণের কারণ সম্পর্কে ঘটনাটি সম্পর্কে অবগত দুজন ব্যক্তি রয়টার্সকে জানিয়েছেন, বন্দরের কনটেইনারে থাকা সোডিয়াম পারক্লোরেটে আগুন ধরে বিস্ফোরণটি ঘটেছিল। তবে শেষ চালানের ৭৫ টন রাসায়নিক ওই বিস্ফোরণের জন্য দায়ী ছিল কি না, তা নিশ্চিত হতে পারেনি রয়টার্স।

যুদ্ধের মধ্যেও আমদানি অব্যাহত

২০২৬ সালের ২৮ ফেব্রুয়ারি যুদ্ধ শুরুর পরও ইরানের সামরিক সরঞ্জাম আমদানির নেটওয়ার্ক সক্রিয় ছিল বলে অনুসন্ধানে উঠে এসেছে। যুদ্ধ শুরুর আগের মাসগুলোতেও চীন থেকে ৯৩ টন টাইটানিয়াম আমদানি করা হয়। উচ্চ শক্তিসম্পন্ন এই ধাতু ক্ষেপণাস্ত্রের কাঠামো ও রকেটের আবরণ তৈরিতে ব্যবহার করা যেতে পারে।

এ ছাড়া যুদ্ধ শুরুর আগের মাসে চীন থেকে ২৬৮ টন নাইট্রোসেলুলোজ এবং পারক্লোরেট-শ্রেণির আরও ২৭৬ টন রাসায়নিক আমদানির তথ্য পাওয়া গেছে। এগুলো রকেটের জ্বালানি ও বিস্ফোরক তৈরিতে ব্যবহারযোগ্য।

যুদ্ধ শুরুর পর মার্চে ইরানের সামরিক পণ্য আমদানি আগের মাসের তুলনায় ৪৭ শতাংশ কমে ৫ কোটি ৪০ লাখ ডলারে নেমে আসে। তবে মে মাসে তা বেড়ে ৭ কোটি ৭০ লাখ ডলারে পৌঁছায়। জুনে রাশিয়া থেকে ১৯ লাখ ডলারের ডেটোনেটরও আমদানি করা হয়, যা বিস্ফোরক সক্রিয় করতে ব্যবহৃত হতে পারে।

সামরিক সরবরাহের ‘জীবনরেখা’

যুক্তরাষ্ট্রের অর্থ মন্ত্রণালয়ের সাবেক জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা মিয়াদ মালেকি এই নেটওয়ার্ককে ইরানের সামরিক বাহিনীর ‘জীবনরেখা’ হিসেবে বর্ণনা করেছেন। তাঁর মতে, নিষেধাজ্ঞার মধ্যেও সামরিক পণ্য কেনা ও সরবরাহের জন্য তেহরান একটি পূর্ণাঙ্গ অর্থনৈতিক কাঠামো গড়ে তুলেছে।

রয়টার্সের অনুসন্ধানে আরও বলা হয়েছে, নেটওয়ার্কের মাধ্যমে আমদানি করা অনেক পণ্য সরাসরি সামরিক কাজে ব্যবহারের উপযোগী হলেও কিছু পণ্যের বেসামরিক ব্যবহারও রয়েছে। আমদানি-সংক্রান্ত সব নথিতে পণ্যের বিস্তারিত বিবরণ ছিল না। ফলে শুল্কসংক্রান্ত কোডের ভিত্তিতে কিছু পণ্যের ধরন ও উৎস নির্ধারণ করতে হয়েছে।

ইরানের সংশ্লিষ্ট সরকারি প্রতিষ্ঠানগুলোর কাছে এ বিষয়ে মন্তব্য জানতে চেয়েছিল রয়টার্স। তবে তাদের কাছ থেকে কোনো জবাব পাওয়া যায়নি। যুক্তরাষ্ট্রের অর্থ মন্ত্রণালয়ের এক মুখপাত্র অবশ্য বলেছেন, ইরানের অর্থনৈতিক ও সামরিক সক্ষমতার অর্থায়নের উৎস বিচ্ছিন্ন করতে যুক্তরাষ্ট্র কাজ করছে।

সূত্র: রয়টার্সের বিশেষ অনুসন্ধান

Facebook Comments Box
Advertise with us
এ বিভাগের আরও খবর


আর্কাইভ ক্যালেণ্ডার
Su Mo Tu We Th Fr Sa
Advertise with us
আরও বাংলা-ভয়েজ সংবাদ