মিয়ানমারই তাদের নিজভূমি, তবু নিরাপত্তা ও অধিকার নিশ্চিত না হলে সেখানে ফিরতে চান না বাংলাদেশের শিবিরে থাকা অধিকাংশ রোহিঙ্গা। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের এক গবেষণায় দেখা গেছে, জরিপে অংশ নেওয়া ৮১৬ জন রোহিঙ্গার মধ্যে ৭১৩ জন, অর্থাৎ ৮৭ শতাংশের বেশি, নির্দিষ্ট শর্ত পূরণ ছাড়া মিয়ানমারে ফিরতে অনিচ্ছুক। তাদের প্রধান দাবির মধ্যে রয়েছে নাগরিকত্ব ও পরিচয়ের স্বীকৃতি, নিরাপত্তা […]
ছবি: সংগৃহীত
মিয়ানমারই তাদের নিজভূমি, তবু নিরাপত্তা ও অধিকার নিশ্চিত না হলে সেখানে ফিরতে চান না বাংলাদেশের শিবিরে থাকা অধিকাংশ রোহিঙ্গা। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের এক গবেষণায় দেখা গেছে, জরিপে অংশ নেওয়া ৮১৬ জন রোহিঙ্গার মধ্যে ৭১৩ জন, অর্থাৎ ৮৭ শতাংশের বেশি, নির্দিষ্ট শর্ত পূরণ ছাড়া মিয়ানমারে ফিরতে অনিচ্ছুক। তাদের প্রধান দাবির মধ্যে রয়েছে নাগরিকত্ব ও পরিচয়ের স্বীকৃতি, নিরাপত্তা ও আন্তর্জাতিক তদারকি, জমি ও ঘরবাড়ি ফিরিয়ে দেওয়া, অবাধ চলাচল এবং স্বাস্থ্য, শিক্ষা ও জীবিকার মতো মৌলিক সেবা নিশ্চিত করা। পাশাপাশি বিচার ও জবাবদিহির নিশ্চয়তাও চান তারা।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অপরাধবিজ্ঞান বিভাগের গবেষণায় এসব তথ্য উঠে এসেছে। বুধবার (৭ অক্টোবর) বিশ্ববিদ্যালয়ের নওয়াব আলী চৌধুরী সিনেট ভবন মিলনায়তনে ‘অনিশ্চিত ঘরে ফেরা: উখিয়ার ক্যাম্প থেকে নিরাপদ, স্বেচ্ছামূলক ও মর্যাদাপূর্ণ প্রত্যাবাসন নিয়ে রোহিঙ্গাদের ভাবনা’ শীর্ষক গবেষণা প্রতিবেদন প্রকাশ করা হয়। এ উপলক্ষে দিনব্যাপী প্যানেল আলোচনাও অনুষ্ঠিত হয়।
গবেষণার তথ্য অনুযায়ী, অংশগ্রহণকারী ৮১৬ জনের মধ্যে ৮৭ শতাংশের বেশি রোহিঙ্গা জানিয়েছেন, তারা এখনই মিয়ানমারে ফিরে যেতে চান না। তবে গবেষণায় বলা হয়েছে, এর অর্থ এই নয় যে তারা নিজেদের মাতৃভূমিতে কখনোই ফিরতে চান না। নিরাপত্তা, নাগরিকত্ব ও পরিচয়ের স্বীকৃতি, নিজেদের জমি ও বাড়িঘর ফিরে পাওয়ার নিশ্চয়তা এবং আন্তর্জাতিক তদারকিসহ নির্দিষ্ট শর্ত পূরণ হলে তারা প্রত্যাবাসনে আগ্রহী।
রোহিঙ্গাদের মতে, মিয়ানমারে তারা যে সহিংসতার অভিজ্ঞতার মধ্য দিয়ে গেছেন, সেই পরিস্থিতির পুনরাবৃত্তির আশঙ্কা থাকলে প্রত্যাবাসন টেকসই হবে না। জরিপে অংশ নেওয়া প্রায় ২০ শতাংশ রোহিঙ্গা মিয়ানমারে নিজেদের সম্পত্তির মালিকানা থাকার কথাও জানিয়েছেন।
গবেষণার অংশ হিসেবে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অপরাধবিজ্ঞান বিভাগের শিক্ষার্থীরা গত ২ থেকে ৬ আগস্ট কক্সবাজারের উখিয়ার ১৭টি শিবিরে গিয়ে রোহিঙ্গাদের মতামত নেন। এতে ৬৫ শতাংশ পুরুষ ও ৩৫ শতাংশ নারীসহ মোট ৮১৬ জন অংশ নেন। পাশাপাশি ৭২ জনের বিস্তারিত সাক্ষাৎকার নেওয়া হয়। হেড মাঝিদের নিয়ে ফোকাসড গ্রুপ আলোচনা এবং পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের দুই জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তার সাক্ষাৎকারও নেওয়া হয়েছে। গবেষণায় ৩৬টি বিষয় বা থিম ধরে গুণগত তথ্য বিশ্লেষণ করা হয়।
গবেষণায় বলা হয়েছে, বাংলাদেশে বিভিন্ন রোহিঙ্গা শিবিরে প্রায় ১২ লাখ রোহিঙ্গা বসবাস করছেন। এর মধ্যে ২০২৪ সালে নতুন করে এসেছেন প্রায় দেড় লাখ। গবেষণায় অংশ নেওয়া রোহিঙ্গারা মিয়ানমারে সহিংসতার শিকার হওয়ার অভিজ্ঞতা তুলে ধরেছেন। একই সঙ্গে বাংলাদেশে শিবিরজীবনের নানা সমস্যার কথাও জানিয়েছেন তারা।
রোহিঙ্গাদের বক্তব্যে উঠে এসেছে, শিবিরে ঘেরাটোপের মধ্যে জীবনযাপন, রেশন কমে যাওয়া, প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা সনদ না থাকা, কাজের অনিশ্চয়তা, মানব পাচার, চাঁদাবাজি, অপহরণ, জেন্ডারভিত্তিক সহিংসতা এবং শিবিরে সশস্ত্র গোষ্ঠীর উপস্থিতির কারণে নিরাপত্তাহীনতার বিষয়গুলো।
অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথির বক্তব্যে পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী শামা ওবায়েদ ইসলাম গত ৬ মে রোহিঙ্গা শিবির পরিদর্শনের অভিজ্ঞতা তুলে ধরেন। তিনি বলেন, রোহিঙ্গাদের আশা, হতাশা ও অনিশ্চয়তা তাঁকে গভীরভাবে নাড়া দিয়েছে। সহিংসতা, বাস্তুচ্যুতি ও নিরাপত্তাহীনতার বোঝা তরুণী ও কন্যাশিশুদের ওপর তুলনামূলকভাবে বেশি পড়েছে বলেও উল্লেখ করেন তিনি।
পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী বলেন, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষণাটি দেখিয়েছে, রোহিঙ্গারা মিয়ানমারকে নিজেদের নিজভূমি হিসেবে প্রত্যাখ্যান করছে না। তারা প্রত্যাখ্যান করছে সেই পরিস্থিতিতে ফিরে যেতে, যে পরিস্থিতি তাদের পালিয়ে আসতে বাধ্য করেছিল। এই পার্থক্যটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
তিনি আরও বলেন, শুধু সীমান্ত পার হয়ে কেউ মিয়ানমারে ফিরে গেলেই প্রত্যাবাসন সফল হয়েছে বলা যায় না। বাস্তুচ্যুতির মূল কারণগুলো সমাধান না হলে, অধিকার সুরক্ষিত না থাকলে এবং নিরাপত্তা ও মর্যাদা নিশ্চিত না করা গেলে আবারও মানুষ বাস্তুচ্যুত হতে পারে। সরকার সহানুভূতির সঙ্গে রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসনের মূল কারণগুলো সমাধানের দিকে গুরুত্ব দিচ্ছে বলেও জানান তিনি।
অনুষ্ঠানে বিশেষ অতিথির বক্তব্যে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মিয়ানমার অনুবিভাগের মহাপরিচালক মো. তৌফিক-উর-রহমান বলেন, টেকসই প্রত্যাবাসনের কোনো বিকল্প নেই। গবেষণাটি থেকে নীতিনির্ধারকেরা রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসনের মূল সমস্যাগুলো চিহ্নিত করে সিদ্ধান্ত নিতে পারবেন।
তিনি বলেন, দীর্ঘদিন ধরে রোহিঙ্গাদের অবস্থানের কারণে তহবিল সংকটসহ মানবিক সংকট তৈরি হয়েছে। এ বিষয়ে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়কে বাংলাদেশের সঙ্গে কাজ করার আহ্বান জানান তিনি।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অপরাধবিজ্ঞান বিভাগের চেয়ারম্যান মু. রেজাউল করিম সোহাগ বলেন, রোহিঙ্গাদের প্রত্যাবাসনের ক্ষেত্রে সবার আগে তাদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে হবে। গবেষণায় তাদের আর্থসামাজিক অবস্থা, শিক্ষার ঘাটতি এবং অপহরণ, চাঁদাবাজি ও শারীরিক সহিংসতার শিকার হওয়ার বিষয়গুলো উঠে এসেছে। এসব বিষয় প্রকাশ্যে এনে সমস্যা সমাধানে উদ্যোগ নেওয়া প্রয়োজন বলেও তিনি মন্তব্য করেন।
অনুষ্ঠানে আরও বক্তব্য দেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সামাজিক বিজ্ঞান অনুষদের ডিন অধ্যাপক কাজী মোহাম্মদ মাহবুবুর রহমান, শরণার্থী ত্রাণ ও প্রত্যাবাসন কমিশনার (আরআরআরসি) মোহাম্মদ মিজানুর রহমান এবং মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের পরিচালক মো. রাজীব আহসান।
রোহিঙ্গা প্রতিনিধি মো. শফিক বলেন, তাদের মূল সমস্যা নাগরিকত্ব। নাগরিকত্ব, ভূমির অধিকার ও নিরাপত্তা ছাড়া মিয়ানমারে প্রত্যাবাসন হলে তা টেকসই হবে না। আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের এ বিষয়গুলোতে নজর দেওয়া উচিত। তারা প্রতিশোধ নয়, ন্যায়বিচার চান বলেও জানান তিনি।
গবেষণা প্রতিবেদন উপস্থাপন করেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় অপরাধবিজ্ঞান গবেষণা ফোরামের (ডিইউসিআরএফ) সভাপতি সাফায়েত হোসেন ও সাধারণ সম্পাদক আদৃতা আরিফ।
এর আগে সকালে অনুষ্ঠিত প্যানেল আলোচনায় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শান্তি ও সংঘর্ষ অধ্যয়ন বিভাগের চেয়ারম্যান অধ্যাপক মুহাম্মদ সাজ্জাদ হোসেন সিদ্দিকী এবং মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের উপপরিচালক শামীম আহম্মেদ বক্তব্য দেন। আলোচনা সঞ্চালনা করেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অপরাধবিজ্ঞান বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক শাহারিয়া আফরিন।
বক্তারা বলেন, চলাচলের ওপর নিয়ন্ত্রণ এবং জীবিকার সুযোগের ঘাটতির কারণে অনেক রোহিঙ্গা অপরাধে জড়িয়ে পড়ছে অথবা সংঘবদ্ধ অপরাধী চক্রের লক্ষ্যবস্তুতে পরিণত হচ্ছে।
গবেষণায় অংশ নেওয়া রোহিঙ্গাদের কাছে সবচেয়ে বেশি বিশ্বাসযোগ্য প্রতিষ্ঠান হিসেবে উঠে এসেছে বাংলাদেশ সরকার। প্রায় ৫৬ শতাংশ রোহিঙ্গা বাংলাদেশ সরকারকে সবচেয়ে বিশ্বাসযোগ্য প্রতিষ্ঠান হিসেবে উল্লেখ করেছেন। এরপর রয়েছে জাতিসংঘ, যার ওপর প্রায় ২১ শতাংশ রোহিঙ্গা আস্থা প্রকাশ করেছেন। তবে ৪ শতাংশ রোহিঙ্গা জানিয়েছেন, তারা মিয়ানমার সরকারকে সবচেয়ে বিশ্বাসযোগ্য মনে করেন। প্রায় ১৬ শতাংশ কোনো প্রতিষ্ঠানকেই বিশ্বাস করেন না।
বিশদ সাক্ষাৎকারে উঠে এসেছে, শিবিরের জীবনও রোহিঙ্গাদের প্রত্যাবাসন নিয়ে সিদ্ধান্তকে প্রভাবিত করছে। একদিকে তারা মিয়ানমার থেকে বিতাড়িত, অন্যদিকে বাংলাদেশে তাদের স্থায়ীভাবে একীভূত হওয়ার সুযোগও নেই। ফলে জরুরি সহায়তা কমে গেলেও স্থায়ী সমাধানের পথ এখনো তৈরি হয়নি।
গবেষণায় বলা হয়েছে, ২০২৬ সালের জয়েন্ট রেসপন্স প্ল্যানের অর্থায়ন কমে ৭১০ মিলিয়ন ডলারে দাঁড়িয়েছে, যা আগের বছরের তুলনায় ২৬ শতাংশ কম। রেশনও মাথাপিছু ১২ মার্কিন ডলার থেকে কমে ৭ ডলারে নেমেছে।
রেশন কমে যাওয়ায় কিছু পুরুষ শিবিরের বাইরে অনানুষ্ঠানিক কাজে যুক্ত হচ্ছেন। এতে অপহরণ ও গ্রেপ্তারের ঝুঁকিও বাড়ছে বলে গবেষণায় উঠে এসেছে। কর্মহীনতা থেকে জুয়া, জুয়া থেকে পারিবারিক সহিংসতা ও ঋণগ্রস্ততা এবং মানব পাচারের মতো সমস্যার কথাও জানিয়েছেন রোহিঙ্গারা।
সাক্ষাৎকারে আরও জানা গেছে, শিবিরে ১০ ফুট বাই ১৫ ফুটের একটি ঘরে ছয় থেকে ১০ জন পর্যন্ত বসবাস করেন। শিক্ষাব্যবস্থা সনদপ্রাপ্ত নয়, স্বাস্থ্যসেবা সীমিত, চলাচল নিয়ন্ত্রিত এবং আইনগতভাবে চাকরি করার সুযোগ নেই।
জরিপে অংশ নেওয়া রোহিঙ্গাদের কেউ কেউ অভিযোগ করেছেন, বিকেলের পর শিবিরের বিভিন্ন অংশ পাঁচ থেকে ছয়টি সশস্ত্র গোষ্ঠীর নিয়ন্ত্রণে চলে যায়। শিশু ও প্রাপ্তবয়স্কদের মুক্তিপণের জন্য অপহরণের ঘটনাও ঘটে বলে তারা জানিয়েছেন। এসব ঘটনায় দুই লাখ থেকে ২০ লাখ টাকা পর্যন্ত মুক্তিপণ দাবি করা হয় বলেও অভিযোগ রয়েছে।