নেপালের হিমালয় অঞ্চলে ভয়াবহ আকস্মিক বন্যার এক সপ্তাহ পেরিয়ে গেলেও স্বজনদের অপেক্ষা যেন শেষ হচ্ছে না। কেউ এখনো নিখোঁজ পরিবারের সদস্যকে জীবিত ফিরে পাওয়ার আশায় উদ্ধারকারী দলের দিকে তাকিয়ে আছেন, আবার কেউ দীর্ঘ অপেক্ষার পর মেনে নিচ্ছেন সবচেয়ে কঠিন সত্যটি। নিখোঁজ স্বজনদের শনাক্ত করতে রাজধানী কাঠমান্ডুতে ডিএনএ নমুনা দিতে ভিড় করছেন পরিবারের সদস্যরা। অন্যদিকে, যাদের […]
ছবি: সংগৃহীত
নেপালের হিমালয় অঞ্চলে ভয়াবহ আকস্মিক বন্যার এক সপ্তাহ পেরিয়ে গেলেও স্বজনদের অপেক্ষা যেন শেষ হচ্ছে না। কেউ এখনো নিখোঁজ পরিবারের সদস্যকে জীবিত ফিরে পাওয়ার আশায় উদ্ধারকারী দলের দিকে তাকিয়ে আছেন, আবার কেউ দীর্ঘ অপেক্ষার পর মেনে নিচ্ছেন সবচেয়ে কঠিন সত্যটি।
নিখোঁজ স্বজনদের শনাক্ত করতে রাজধানী কাঠমান্ডুতে ডিএনএ নমুনা দিতে ভিড় করছেন পরিবারের সদস্যরা। অন্যদিকে, যাদের ফিরে পাওয়ার আশা প্রায় ছেড়ে দিয়েছেন স্বজনরা, তাদের আত্মার শান্তির জন্য হিন্দু রীতি মেনে কোথাও কোথাও অনুষ্ঠিত হচ্ছে প্রতীকী শেষকৃত্য।
গত ২৬ আগস্ট চীন-নেপাল সীমান্তের কাছে হিমবাহ ধসের পর বরফগলা পানি, পাথর, কাদা ও ধ্বংসাবশেষের বিশাল স্রোত নেমে আসে নিচের জনপদগুলোতে। মুহূর্তের মধ্যে ভেসে যায় ঘরবাড়ি, সড়ক, সেতু ও বিভিন্ন স্থাপনা। নেপালের সরকারি হিসাবে বুধবার পর্যন্ত ১ হাজার ২০৪ জনের মরদেহ উদ্ধার করা হয়েছে। নিখোঁজ রয়েছেন আরও ৪ হাজার ২১৬ জন।
বুধবার রাজধানী কাঠমান্ডুতে শত শত মানুষ ডিএনএ নমুনা দিতে লাইনে দাঁড়ান। উদ্দেশ্য একটাই—উদ্ধার হওয়া অজ্ঞাত মরদেহগুলোর মধ্যে কোনোটি তাদের স্বজনের কি না, তা শনাক্ত করা।
মরদেহ দ্রুত পচে যাওয়ায় অনেক জায়গায় হাসপাতাল ও মর্গে আর জায়গা থাকছে না। ফলে কিছু অজ্ঞাত মরদেহ সাময়িকভাবে দাফন করা হয়েছে। তবে মরদেহের পরিচয় শনাক্ত করার জন্য ডিএনএ নমুনা, ছবি এবং অন্যান্য পরিচয়সংক্রান্ত তথ্য সংরক্ষণ করছে কর্তৃপক্ষ।
২১ বছর বয়সী সুস্মিতা লো তার ছয় বছর বয়সী ভাগ্নের হাত ধরে ডিএনএ নমুনা দিতে এসেছিলেন। এক সপ্তাহ ধরে তার বাবার কোনো খোঁজ নেই। শুধু তিনি নন, শিশুটির বাবাও নিখোঁজ।
সুস্মিতা জানান, রাতে শিশুটি বারবার তার বাবাকে ডাকে। কিন্তু এত ছোট শিশুকে এখনো বলা হয়নি যে তার বাবা নিখোঁজ।
এই অপেক্ষাই এখন হাজারো পরিবারের বাস্তবতা।
একদিকে যখন পরিবারগুলো ডিএনএ পরীক্ষার মাধ্যমে স্বজনকে খুঁজছেন, অন্যদিকে অনেকেই আর অপেক্ষা করতে পারছেন না।
নেপালের সবচেয়ে ক্ষতিগ্রস্ত এলাকাগুলোর একটিতে নিখোঁজ স্বজনদের জন্য প্রতীকী হিন্দু শেষকৃত্য শুরু হয়েছে। মরদেহ না থাকলেও খড়ের তৈরি প্রতীকী পুতুল ব্যবহার করে শেষকৃত্যের আনুষ্ঠানিকতা পালন করছেন পরিবারের সদস্যরা।
স্বামী নিখোঁজ হওয়ার পর এমনই একটি প্রতীকী শেষকৃত্যে অংশ নেন ডোলমা নেওয়ার তামাং। পাশে ছিল তার কান্নারত ছেলে।
তিনি বলেন, স্বামীর আত্মার মুক্তি ও শান্তির জন্যই তাদের এই আনুষ্ঠানিকতা করতে হয়েছে।
নেপালে নিখোঁজদের জন্য এমন প্রতীকী অন্ত্যেষ্টিক্রিয়া শুধু ধর্মীয় আনুষ্ঠানিকতা নয়, অনেক পরিবারের কাছে এটি দীর্ঘ অনিশ্চয়তার মধ্যে মানসিকভাবে বিদায় জানানোরও একটি উপায়।
তবে উদ্ধারকারী দল এখনো পুরোপুরি আশা ছাড়েনি। বিশেষ করে বিভিন্ন জলবিদ্যুৎ প্রকল্পের কাদায় ও ধ্বংসাবশেষে আটকে থাকা মানুষদের উদ্ধারে অভিযান চলছে।
বন্যার পানির সঙ্গে নেমে আসা বিপুল পরিমাণ কাদা ও ধ্বংসাবশেষে একাধিক জলবিদ্যুৎকেন্দ্রের সুড়ঙ্গ বন্ধ হয়ে গেছে। এসব জায়গায় উদ্ধারকারীরা ড্রিলিং, খনন এবং প্রয়োজনে বিস্ফোরণের মাধ্যমে পথ তৈরি করছেন।
কিছু সুড়ঙ্গে বাতাস, পানি ও খাবারের মজুত থাকার সম্ভাবনা থাকায় সেখানে এখনো জীবিত কাউকে পাওয়ার আশা করছেন উদ্ধারকারীরা। Reuters জানিয়েছে, প্রায় ৯০০ নিখোঁজ কর্মীর সন্ধানে জলবিদ্যুৎ প্রকল্পগুলোর সুড়ঙ্গগুলোতে বিশেষ গুরুত্ব দিয়ে অভিযান চলছে।
নেপালের পররাষ্ট্রমন্ত্রী শিশির খানালও এখনো আশাবাদী। তার ভাষায়, ‘অলৌকিক ঘটনা সত্যিই ঘটে।’ তাই নিখোঁজদের ব্যাপারে এই মুহূর্তে পুরোপুরি আশা ছেড়ে দিতে চান না তিনি।
এই বিপর্যয়ের প্রভাব পড়েছে চীনের তিব্বতেও। নেপাল-চীন সীমান্তের কাছের গিরোং এলাকায় বন্যার স্রোতে যোগাযোগব্যবস্থা মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়।
চীনা রাষ্ট্রীয় সংবাদমাধ্যম জানিয়েছে, ক্ষতিগ্রস্ত গিরোং বন্দরের সঙ্গে যোগাযোগের সড়কটি দিনরাত কাজ করে আবার চালু করা হয়েছে।
চীনের পক্ষ থেকেও হতাহতের খবর এসেছে। দেশটির সরকারি হিসাবে সেখানে ২১ জন নিহত এবং ৫৪১ জন এখনো নিখোঁজ রয়েছেন। ফলে নেপাল ও চীন মিলিয়ে প্রাণহানি ১ হাজার ২২৫ ছাড়িয়েছে এবং নিখোঁজের সংখ্যা কয়েক হাজারে দাঁড়িয়েছে।
এই দুর্যোগে শুধু নেপালের স্থানীয় বাসিন্দারাই নিখোঁজ হননি। হিমালয়ে ট্রেকিং করতে যাওয়া পর্যটক এবং তিব্বতের পবিত্র কৈলাশ পর্বতে যাওয়া তীর্থযাত্রীসহ বিভিন্ন দেশের শত শত নাগরিকও এখনো নিখোঁজ।
নেপালের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের হিসাবে ৩৯টি দেশের ৫৯০ জন বিদেশি এখনো নিখোঁজ রয়েছেন। তবে তাদের মধ্যে কয়েকজনের সঙ্গে পরে যোগাযোগ স্থাপন করা সম্ভব হয়েছে।
অস্ট্রেলিয়াও জানিয়েছে, নিখোঁজ হিসেবে তালিকাভুক্ত কয়েকজন নাগরিকের সঙ্গে নতুন করে যোগাযোগ হয়েছে।
এদিকে ভারতের নদীগুলোর ভাটির দিক থেকেও অন্তত ১৭টি মরদেহ উদ্ধারের খবর পাওয়া গেছে।
নেপালের এই বিপর্যয় নতুন করে সামনে এনেছে হিমালয় অঞ্চলে জলবায়ু পরিবর্তনের ঝুঁকি।
বিজ্ঞানীদের মতে, বৈশ্বিক তাপমাত্রা বাড়ার সঙ্গে হিমালয় দ্রুত উষ্ণ হচ্ছে। এর ফলে হিমবাহ গলার হার বাড়ছে এবং হিমবাহ ধস ও আকস্মিক বন্যার মতো বিপর্যয়ের ঝুঁকি তৈরি হচ্ছে।
হিমালয় ও হিন্দুকুশ অঞ্চলের হিমবাহ কোটি কোটি মানুষের পানির অন্যতম প্রধান উৎস। ফলে এই অঞ্চলে বড় ধরনের পরিবেশগত পরিবর্তনের প্রভাব শুধু নেপাল বা আশপাশের দেশেই সীমাবদ্ধ থাকবে না; দক্ষিণ ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার বিশাল জনগোষ্ঠীও এর প্রভাবের মুখে পড়তে পারে।
নেপালের প্রধানমন্ত্রী বালেন্দ্র শাহও এই বিপর্যয়কে জলবায়ু পরিবর্তনের সঙ্গে যুক্ত বৃহত্তর ঝুঁকির একটি সতর্কসংকেত হিসেবে দেখছেন।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে তিনি বলেন, জলবায়ু পরিবর্তন বৈশ্বিক বিষয়, তাই দুর্যোগ মোকাবিলার দায়িত্বও বৈশ্বিক।
ভয়াবহ এই বন্যায় নেপালের অবকাঠামোও ব্যাপকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। সড়ক, সেতু, ঘরবাড়ি, কৃষিজমি এবং বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনা ধ্বংস হয়েছে।
জাতিসংঘের প্রাথমিক মূল্যায়নে শুধু অবকাঠামোগত ক্ষতির পরিমাণ প্রায় ১৫ কোটি ৮ লাখ ডলার। তবে পূর্ণাঙ্গ হিসাব হলে ক্ষতির পরিমাণ আরও অনেক বাড়তে পারে। পুনর্গঠনে শত কোটি ডলার পর্যন্ত ব্যয় হতে পারে বলে আশঙ্কা করছে কাঠমান্ডু।
সীমিত অর্থনৈতিক সক্ষমতার দেশ নেপালের জন্য এত বড় দুর্যোগ সামাল দেওয়া তাই আরও কঠিন হয়ে উঠেছে।
এক সপ্তাহ পরও নেপালের বহু পরিবার জানে না তাদের প্রিয়জন কোথায়। কেউ হাসপাতাল ও মর্গে ঘুরছেন, কেউ ডিএনএ নমুনা দিচ্ছেন, আবার কেউ প্রতীকী শেষকৃত্যের মাধ্যমে নিখোঁজ স্বজনের আত্মার শান্তি কামনা করছেন।
তবু উদ্ধারকারীদের অভিযান থেমে নেই। ধ্বংসস্তূপের নিচে, কাদায় আটকে থাকা সুড়ঙ্গে কিংবা দুর্গম পাহাড়ি এলাকায় এখনো যদি কেউ বেঁচে থাকেন—তাকে খুঁজে বের করাই তাদের প্রধান লক্ষ্য।
এই মুহূর্তে নেপালের জন্য প্রতিটি উদ্ধার অভিযান তাই শুধু একজন মানুষকে খুঁজে পাওয়ার চেষ্টা নয়; এটি হাজারো পরিবারের দীর্ঘ অপেক্ষার অবসান ঘটানোর লড়াই।