ঢাকার সাবেক চিফ মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট (সিএমএম) রেজাউল করিম চৌধুরীকে সাময়িক বরখাস্তের সিদ্ধান্ত নিয়েছে আইন ও বিচার বিভাগ। দীর্ঘদিন ধরে বিচার অঙ্গনে নানা অনিয়ম ও দুর্নীতির অভিযোগে বিতর্কিত এই বিচারকের পদত্যাগের খবর আইন পেশাজীবী এবং সাধারণ মানুষের মধ্যে স্বস্তির সৃষ্টি করেছে। চলুন বিস্তারিত জেনে নেওয়া যাক রেজাউল করিমের বিরুদ্ধে থাকা অভিযোগসমূহ, তার প্রভাব এবং বিচার বিভাগের […]
ঢাকার সাবেক চিফ মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট (সিএমএম) রেজাউল করিম চৌধুরীকে সাময়িক বরখাস্তের সিদ্ধান্ত নিয়েছে আইন ও বিচার বিভাগ। দীর্ঘদিন ধরে বিচার অঙ্গনে নানা অনিয়ম ও দুর্নীতির অভিযোগে বিতর্কিত এই বিচারকের পদত্যাগের খবর আইন পেশাজীবী এবং সাধারণ মানুষের মধ্যে স্বস্তির সৃষ্টি করেছে। চলুন বিস্তারিত জেনে নেওয়া যাক রেজাউল করিমের বিরুদ্ধে থাকা অভিযোগসমূহ, তার প্রভাব এবং বিচার বিভাগের জন্য এর অর্থ কী।
রেজাউল করিমের বিরুদ্ধে অভিযোগের সারমর্ম
রেজাউল করিম চৌধুরীকে অভিযোগ করা হয়েছে দুর্নীতি, ক্ষমতার অপব্যবহার, দলবাজি, জোরপূর্বক অর্থ আদায়, বিচার প্রক্রিয়ায় অনিয়মসহ নানা অবৈধ কর্মকাণ্ডের জন্য। ২০১৮ সাল থেকে তার বিরুদ্ধে নানা অনিয়মের কথা প্রকাশ পেতে থাকে, বিশেষ করে আওয়ামী লীগ সরকারের শাসনামলে তার কর্মকাণ্ড নিয়ে নানা প্রশ্ন ওঠে।
আইন ও বিচার বিভাগের এক প্রজ্ঞাপনে বলা হয়েছে, সুপ্রিমকোর্টের সঙ্গে পরামর্শক্রমে ‘বাংলাদেশ সুপ্রিম জুডিশিয়াল সার্ভিসের শৃঙ্খলা বিধিমালা-২০১৭’র বিধি ১১ অনুযায়ী তাকে সাময়িক বরখাস্ত করা হয়েছে। এই আদেশ ২৯ সেপ্টেম্বর থেকে কার্যকর হয়েছে।
ক্ষমতার অপব্যবহারের বিস্তৃত পরিধি
রেজাউল করিম নিজেকে সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার ঘনিষ্ঠ ব্যক্তি হিসেবে পরিচয় দিয়ে বিচার বিভাগে একচ্ছত্র আধিপত্য বিস্তার করেছিলেন। তার কথামতো কাজ না করলে অধীনস্থ বিচারকরা নানা ধরনের হয়রানির শিকার হতেন। বিচার বিভাগে তার এক ধরনের ‘দলীয় ক্যাডার’ গড়ে ওঠে, যারা তার পৃষ্ঠপোষকতায় নানা অনিয়মে লিপ্ত ছিলেন।
জামিন বাণিজ্য, ঘুষ গ্রহণ, মামলায় প্রভাব খাটিয়ে অর্থ হাতিয়ে নেওয়া, বিরোধী দল ও নেতাকর্মীদের অধিকাংশ মামলা প্রভাবিত করা ইত্যাদি অভিযোগ তার বিরুদ্ধে গড়ে ওঠে। এমনকি ২০২৪ সালের নির্বাচনের আগে বিরোধী দলীয় নেতা-কর্মীদের বিরুদ্ধে বিভিন্ন মামলা দ্রুত নিষ্পত্তির মাধ্যমে রাজনৈতিক প্রতিহিংসা দেখা যায়।
বিচার বিভাগের সুনামের জন্য বড় ধাক্কা
এই ধরনের দুর্নীতিবাজ বিচারকের কারণে দেশের বিচার বিভাগের সার্বিক সুনাম ক্ষুণ্ন হয়েছে। বিচারকত্বের মূলমন্ত্র হওয়া উচিত ছিল ‘ন্যায় ও ন্যায়বিচার’ প্রতিষ্ঠা, কিন্তু রেজাউল করিমের সময়ে বিচার প্রক্রিয়া রাজনৈতিক প্রভাব ও ব্যক্তিগত স্বার্থে বিচ্যুত হয়। এজন্য অনেক দক্ষ ও সৎ বিচারকও তাদের দায়িত্ব সঠিকভাবে পালন করতে পারেননি।
ঢাকা আইনজীবী সমিতির সাধারণ সম্পাদক অ্যাডভোকেট নজরুল ইসলাম এই প্রসঙ্গে বলেন, “সাক্ষী যেই ভিআইপি হোক না কেন, বিচারকরা কখনোই নিজেদের কাছে প্রটোকল দেয়ার অধিকার রাখে না। কিন্তু রেজাউল করিমের সময় এ ধরনের অনিয়ম ঘটে।”
দুদক তদন্ত ও অনুসন্ধান
দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) এক অনুসন্ধান টিম রেজাউল করিমের বিরুদ্ধে অভিযোগ তদন্তে নিয়োজিত রয়েছে। তারা বিভিন্ন আর্থিক অনিয়ম ও ক্ষমতার অপব্যবহারের প্রমাণ সংগ্রহ করছে। দুদক মনে করে, এই তদন্তে আরও অনেক অনিয়ম ও দুর্নীতির তথ্য সামনে আসবে, যা বিচার বিভাগের স্বচ্ছতা নিশ্চিত করতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।
ব্যক্তিগত সম্পদের বিস্তার ও আর্থিক লোভ
রেজাউল করিমের বিরুদ্ধে অভিযোগ রয়েছে যে তিনি আদালতের নিলাম সিন্ডিকেট নিয়ন্ত্রণ করে মোটা অঙ্কের অর্থ হাতিয়ে নিয়েছেন। এছাড়াও, গৃহায়ন ও গণপূর্ত মন্ত্রণালয় থেকে অতিরিক্ত প্লট পেয়েছেন, যা বৈধ সীমার বাইরে। চট্টগ্রামের সীতাকুণ্ডে বিলাসবহুল তিনতলা বাড়ি নির্মাণ এবং শহরের কেন্দ্রীয় স্থানে মূল্যবান ফ্ল্যাট কেনা তার আর্থিক অবৈধতার প্রমাণ হিসেবে ধরা হচ্ছে।
বিচার ব্যবস্থা দেশের ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠার মূল স্তম্ভ। যদি এই স্তম্ভ দুর্বল হয়, তাহলে সামগ্রিক শাসনব্যবস্থা দুর্বল হয়। রেজাউল করিমের মতো বিচারকের কর্মকাণ্ড বিচার বিভাগের প্রতি জনসাধারণের আস্থা কমিয়ে দেয়। সাময়িক বরখাস্তের সিদ্ধান্ত একটি ইতিবাচক পদক্ষেপ হলেও, এর মাধ্যমে বিচার বিভাগে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা প্রতিষ্ঠার আরও অনেক কাজ বাকি রয়েছে।
রেজাউল করিম চৌধুরীর বরখাস্ত হওয়া বিচার বিভাগের জন্য এক বড় সংকেত। এটি প্রমাণ করে যে ক্ষমতার অপব্যবহার ও দুর্নীতির বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেয়া সম্ভব। ভবিষ্যতে বিচার বিভাগকে আরও শক্তিশালী, স্বচ্ছ ও নিরপেক্ষ করে গড়ে তোলা প্রয়োজন, যাতে সাধারণ মানুষ ন্যায়বিচারে বিশ্বাস রাখতে পারে।