যুক্তরাষ্ট্রে অভিবাসন নীতির কঠোর প্রয়োগের মধ্যেই হেফাজতে মৃত্যুর সংখ্যা নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছে জাতিসংঘ। চলতি বছর দেশটির অভিবাসন হেফাজতে এখন পর্যন্ত ২৩ জনের মৃত্যু হয়েছে বলে জানিয়েছেন জাতিসংঘের মানবাধিকার বিষয়ক হাইকমিশনার ভলকার তুর্ক। এসব মৃত্যুর ঘটনায় যথাযথ জবাবদিহি নিশ্চিত করার আহ্বান জানিয়েছেন তিনি। সোমবার (৭ সেপ্টেম্বর) জেনেভায় জাতিসংঘের মানবাধিকার কাউন্সিলের ৬৩তম অধিবেশনে দেওয়া বক্তব্যে তিনি […]
ছবি: সংগৃহীত
যুক্তরাষ্ট্রে অভিবাসন নীতির কঠোর প্রয়োগের মধ্যেই হেফাজতে মৃত্যুর সংখ্যা নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছে জাতিসংঘ। চলতি বছর দেশটির অভিবাসন হেফাজতে এখন পর্যন্ত ২৩ জনের মৃত্যু হয়েছে বলে জানিয়েছেন জাতিসংঘের মানবাধিকার বিষয়ক হাইকমিশনার ভলকার তুর্ক। এসব মৃত্যুর ঘটনায় যথাযথ জবাবদিহি নিশ্চিত করার আহ্বান জানিয়েছেন তিনি।
সোমবার (৭ সেপ্টেম্বর) জেনেভায় জাতিসংঘের মানবাধিকার কাউন্সিলের ৬৩তম অধিবেশনে দেওয়া বক্তব্যে তিনি এসব কথা বলেন।
ভলকার তুর্ক জানান, গত জুনে মানবাধিকার কাউন্সিলে তার সর্বশেষ প্রতিবেদন দেওয়ার পর থেকে যুক্তরাষ্ট্রের অভিবাসন হেফাজতে আরও চারজনের মৃত্যু হয়েছে। এর ফলে শুধু ২০২৬ সালেই দেশটির অভিবাসন হেফাজতে মৃতের সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ২৩ জনে।
এ ঘটনাকে গুরুতর মানবাধিকার উদ্বেগ হিসেবে তুলে ধরে তিনি বলেন, এসব মৃত্যুর জন্য উপযুক্ত জবাবদিহিতা নিশ্চিত করা জরুরি।
যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প দ্বিতীয় মেয়াদে দায়িত্ব নেওয়ার পর অবৈধ অভিবাসন বন্ধকে প্রশাসনের অন্যতম প্রধান অগ্রাধিকার হিসেবে নিয়েছেন। এর অংশ হিসেবে দেশজুড়ে ব্যাপক ধরপাকড় ও আটক অভিযান চালানো হচ্ছে। একই সঙ্গে অভিবাসীদের রাখার জন্য ডিটেনশন সেন্টারের পরিধিও বাড়ানো হচ্ছে।
শুধু হেফাজতে মৃত্যুই নয়, অভিবাসীদের কোথায় ফেরত পাঠানো হচ্ছে—সেই বিষয়েও যুক্তরাষ্ট্রের নীতির সমালোচনা করেছেন জাতিসংঘের মানবাধিকার প্রধান।
তিনি বিশেষ করে হাইতির মতো এমন দেশে অভিবাসীদের ফেরত পাঠানোর বিষয়ে সতর্ক করেছেন, যেখানে তাদের গুরুতর ও অপূরণীয় ক্ষতির মুখে পড়ার আশঙ্কা রয়েছে।
মানবাধিকার কাউন্সিলে ভলকার তুর্ক বলেন, যুক্তরাষ্ট্রের উচিত এমন জায়গায় মানুষকে ফেরত পাঠানো বন্ধ করা, যেখানে তারা অপূরণীয় ক্ষতির শিকার হতে পারেন। পাশাপাশি তৃতীয় কোনো দেশে কাউকে পাঠানোর ক্ষেত্রেও যথাযথ আইনি প্রক্রিয়া অনুসরণের আহ্বান জানান তিনি।
যুক্তরাষ্ট্রের ইমিগ্রেশন অ্যান্ড কাস্টমস এনফোর্সমেন্ট—আইসিই কর্মকর্তাদের বৈদ্যুতিক শক গ্লাভস দেওয়ার পরিকল্পনার খবর নিয়েও উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন তুর্ক।
তার আশঙ্কা, অভিযানের সময় কর্মকর্তাদের হাতে এ ধরনের সরঞ্জাম তুলে দিলে বলপ্রয়োগ ও সহিংসতার মাত্রা আরও বাড়তে পারে।
মার্কিন সংবাদমাধ্যম এপির এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, এ ধরনের ‘শক গ্লাভস’সহ বিভিন্ন সরঞ্জাম কেনার পরিকল্পনায় আইসিইর অভিভাবক সংস্থা ডিপার্টমেন্ট অব হোমল্যান্ড সিকিউরিটি ১ থেকে ২ কোটি ডলার পর্যন্ত ব্যয় করতে পারে। সংস্থাটি এসব সরঞ্জামকে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণ ও উত্তেজনা কমানোর উপায় হিসেবে বিবেচনা করছে।
অভিবাসন অভিযানে হেফাজতে মৃত্যুর বিষয়টি নতুন করে সামনে আসার পেছনে মানবাধিকার সংগঠনগুলোর প্রতিবেদনও গুরুত্বপূর্ণ।
হিউম্যান রাইটস ওয়াচ ও ফিজিশিয়ানস ফর হিউম্যান রাইটসের জুনে প্রকাশিত যৌথ প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ট্রাম্প প্রশাসনের কঠোর অভিবাসন অভিযানের মধ্যে আইসিই হেফাজতে মৃত্যুর হার গত এক দশকের মধ্যে সর্বোচ্চ পর্যায়ে পৌঁছেছে।
এতে আটক ব্যক্তিদের স্বাস্থ্যসেবা, বন্দিশালার পরিস্থিতি এবং কর্তৃপক্ষের আচরণ নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন উঠেছে।
অভিবাসন অভিযান পরিচালনার সময় প্রাণঘাতী বলপ্রয়োগের কয়েকটি ঘটনাও আইসিইকে বিতর্কের মধ্যে ফেলেছে। এর মধ্যে চলতি বছরের জানুয়ারিতে মিনেসোটায় আইসিইবিরোধী বিক্ষোভের সময় দুই মার্কিন নাগরিককে গুলি করে হত্যার ঘটনাটি বিশেষভাবে আলোচিত হয়।
সমালোচকদের অভিযোগ, অভিবাসীদের আটক করতে গিয়ে আইসিই কর্মকর্তারা ক্রমেই কঠোর বলপ্রয়োগের কৌশল ব্যবহার করছেন। একই সঙ্গে নতুন নিয়োগ পাওয়া কর্মকর্তাদের প্রশিক্ষণের মান নিয়েও প্রশ্ন তুলেছেন তারা।
অবৈধ অভিবাসন ঠেকাতে ট্রাম্প প্রশাসনের নেওয়া কঠোর পদক্ষেপের ফলে যুক্তরাষ্ট্রে হাজার হাজার মানুষ আটক হয়েছেন। তবে এসব অভিযানের পাশাপাশি হেফাজতে মৃত্যু, জোরপূর্বক ফেরত পাঠানো এবং আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর বলপ্রয়োগ নিয়ে আন্তর্জাতিক পর্যায়ে সমালোচনাও বাড়ছে।
জাতিসংঘের সর্বশেষ বক্তব্য সেই বিতর্ককেই আরও সামনে নিয়ে এসেছে। ভলকার তুর্কের বার্তা স্পষ্ট—অভিবাসন আইন প্রয়োগের ক্ষেত্রেও মানুষের জীবন, নিরাপত্তা এবং আইনি অধিকার নিশ্চিত করতে হবে; অন্যথায় এর দায় এড়িয়ে যাওয়ার সুযোগ থাকবে না।