যুদ্ধের ধ্বংসযজ্ঞ কাটিয়ে স্বাভাবিক অবস্থায় ফেরার চেষ্টা করছে ইরান। তবে সামরিক সংঘাতের ক্ষত কাটতে না কাটতেই দেশটির সামনে নতুন করে দেখা দিয়েছে অর্থনৈতিক, সামাজিক ও রাজনৈতিক নানা সংকট। লাগামহীন মূল্যস্ফীতি, সম্ভাব্য বিদ্যুৎ সংকট, বেকারত্বের চাপ এবং নাগরিক স্বাধীনতা নিয়ে বিতর্ক—সব মিলিয়ে ইরানের ভবিষ্যৎ নিয়ে উদ্বেগ বাড়ছে বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা। ব্রিটিশ সংবাদপত্র দ্য গার্ডিয়ান–এর এক […]
ছবি: সংগৃহীত
যুদ্ধের ধ্বংসযজ্ঞ কাটিয়ে স্বাভাবিক অবস্থায় ফেরার চেষ্টা করছে ইরান। তবে সামরিক সংঘাতের ক্ষত কাটতে না কাটতেই দেশটির সামনে নতুন করে দেখা দিয়েছে অর্থনৈতিক, সামাজিক ও রাজনৈতিক নানা সংকট। লাগামহীন মূল্যস্ফীতি, সম্ভাব্য বিদ্যুৎ সংকট, বেকারত্বের চাপ এবং নাগরিক স্বাধীনতা নিয়ে বিতর্ক—সব মিলিয়ে ইরানের ভবিষ্যৎ নিয়ে উদ্বেগ বাড়ছে বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা।
ব্রিটিশ সংবাদপত্র দ্য গার্ডিয়ান–এর এক বিশ্লেষণে বলা হয়েছে, যুদ্ধকালীন জাতীয় ঐক্যের আবহ ধীরে ধীরে স্তিমিত হলে বহুদিনের অমীমাংসিত সমস্যাগুলো আবার সামনে চলে আসতে পারে। যুদ্ধ পুরোপুরি শেষ না হলেও ইরানে ইতোমধ্যে ভবিষ্যৎ রাষ্ট্রনীতি নিয়ে বিতর্ক শুরু হয়েছে।
একদিকে সংস্কারপন্থী ও উন্মুক্ত নীতির সমর্থকেরা আন্তর্জাতিক সম্পর্ক পুনর্গঠন এবং রাজনৈতিক শিথিলতার পক্ষে মত দিচ্ছেন। অন্যদিকে আরেক অংশের অবস্থান, পশ্চিমা নিষেধাজ্ঞা উপেক্ষা করে স্বনির্ভরতা ও অভ্যন্তরীণ সক্ষমতা বাড়ানোর মধ্য দিয়েই এগোতে হবে দেশকে।
অর্থনীতিবিদদের মতে, যুদ্ধ ও অবরোধের যৌথ প্রভাবে ইরানের অর্থনীতি বড় ধরনের চাপে রয়েছে। সরকারি তথ্য অনুযায়ী, মে মাসে খাদ্য মূল্যস্ফীতি ছিল প্রায় ১৩০ শতাংশ। মাংস ও মুরগির দাম বেড়েছে ১৭৬ শতাংশ পর্যন্ত। বিশ্লেষকদের আশঙ্কা, যুদ্ধ শেষ হলেও সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রার ব্যয় দ্রুত কমবে না; বরং দীর্ঘমেয়াদে চাপ আরও বাড়তে পারে।
ইরানের সমাজবিজ্ঞানীরা বলছেন, যুদ্ধের আগেই যে অর্থনৈতিক ও সামাজিক অসন্তোষ বিক্ষোভের জন্ম দিয়েছিল, সেসব সমস্যার কোনো মৌলিক সমাধান হয়নি। নৌ অবরোধ, মূল্যবৃদ্ধি এবং ইন্টারনেট সীমাবদ্ধতার কারণে লাখো মানুষের কর্মসংস্থান ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। ফলে আনুষ্ঠানিকভাবে অসন্তোষ প্রকাশের সুযোগ সীমিত থাকলেও নতুন করে জনঅসন্তোষ দেখা দেওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।
যুদ্ধের সময় অবকাঠামোর ক্ষতির কারণে বিদ্যুৎ সরবরাহ নিয়েও উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। ব্যবসায়ী নেতারা সতর্ক করেছেন, উৎপাদন সচল রাখতে জনগণকে প্রতিদিন কয়েক ঘণ্টার বিদ্যুৎ বিভ্রাটের জন্য প্রস্তুত থাকতে হতে পারে। যদিও সরকার তাৎক্ষণিক লোডশেডিংয়ের আশঙ্কা নাকচ করেছে, তবুও শিল্প ও ব্যবসায়িক মহলে উদ্বেগ কমেনি।
বিশ্লেষকদের মতে, বিদ্যুৎ ঘাটতি দীর্ঘস্থায়ী হলে তা শিল্প উৎপাদন, কর্মসংস্থান এবং নিত্যপণ্যের সরবরাহে আরও চাপ তৈরি করবে।
অনেকের আশা, যুদ্ধ-পরবর্তী সময়ে আন্তর্জাতিক নিষেধাজ্ঞা ও অর্থনৈতিক অবরোধ শিথিল হলে ইরান কিছুটা স্বস্তি পেতে পারে। তবে অর্থনীতিবিদদের মতে, কেবল বিদেশি অর্থ প্রবাহ বা নিষেধাজ্ঞা শিথিল হওয়া বড় পরিবর্তন আনবে না। কার্যকর অর্থনৈতিক সংস্কার, উৎপাদনশীল বিনিয়োগ এবং দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা ছাড়া সংকট কাটানো কঠিন হবে।
রাজনৈতিক ক্ষেত্রেও চাপ বাড়ছে। যুদ্ধের মধ্যেও ভিন্নমত দমন, মৃত্যুদণ্ড এবং নাগরিক অধিকার নিয়ে বিতর্ক অব্যাহত রয়েছে। সংস্কারপন্থীরা রাজনৈতিক উদারতা ও ন্যায়বিচারের দাবি জানালেও বিশ্লেষকদের মতে, বর্তমান পরিস্থিতিতে রাজনৈতিক বহুত্ববাদের সুযোগ এখনও সীমিত।
বিশ্লেষকদের ভাষায়, ইরানের সামনে এখন সবচেয়ে বড় প্রশ্ন যুদ্ধ জেতা নয়, শান্তি টিকিয়ে রাখা। অর্থনৈতিক অবরোধ অব্যাহত থাকলে এবং পুনর্গঠনের জন্য প্রয়োজনীয় পুঁজি ও প্রযুক্তি না এলে যুদ্ধের ক্ষয়ক্ষতি সাময়িক সংকট হয়ে থাকবে না; বরং তা দেশটির সামাজিক ও অর্থনৈতিক বাস্তবতার স্থায়ী অংশ হয়ে উঠতে পারে।
সূত্র: দ্য গার্ডিয়ান