যুক্তরাষ্ট্র ও কানাডার মধ্যে বাণিজ্যিক বিরোধ নতুন করে তীব্র হয়েছে। দুই দেশের মধ্যে শেষ মুহূর্তের বাণিজ্য আলোচনা ভেস্তে যাওয়ার পর কানাডার প্রায় ২০ বিলিয়ন ডলার মূল্যের পণ্যের ওপর ৫০ শতাংশ শুল্ক আরোপ করেছে যুক্তরাষ্ট্র। এর পাল্টা ব্যবস্থা হিসেবে কানাডাও আগামী ৮ সেপ্টেম্বর থেকে সমপরিমাণ পাল্টা শুল্ক আরোপের প্রস্তুতি নিচ্ছে। ফলে দীর্ঘদিনের ঘনিষ্ঠ দুই বাণিজ্য অংশীদারের […]
ছবি: সংগৃহীত
যুক্তরাষ্ট্র ও কানাডার মধ্যে বাণিজ্যিক বিরোধ নতুন করে তীব্র হয়েছে। দুই দেশের মধ্যে শেষ মুহূর্তের বাণিজ্য আলোচনা ভেস্তে যাওয়ার পর কানাডার প্রায় ২০ বিলিয়ন ডলার মূল্যের পণ্যের ওপর ৫০ শতাংশ শুল্ক আরোপ করেছে যুক্তরাষ্ট্র। এর পাল্টা ব্যবস্থা হিসেবে কানাডাও আগামী ৮ সেপ্টেম্বর থেকে সমপরিমাণ পাল্টা শুল্ক আরোপের প্রস্তুতি নিচ্ছে। ফলে দীর্ঘদিনের ঘনিষ্ঠ দুই বাণিজ্য অংশীদারের মধ্যে নতুন করে বাণিজ্যযুদ্ধের আশঙ্কা তৈরি হয়েছে।
সোমবার এই উত্তেজনা আরও বাড়িয়ে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প জানান, আগামী ১ জানুয়ারি ২০২৭ থেকে কানাডা থেকে আমদানি করা গাড়ি, ট্রাক ও গাড়ির যন্ত্রাংশের ওপর শুল্ক ৫০ শতাংশ পর্যন্ত বাড়ানো হতে পারে। এর ফলে উত্তর আমেরিকার অত্যন্ত আন্তঃনির্ভরশীল গাড়ি শিল্প ও সরবরাহ ব্যবস্থায় নতুন চাপ তৈরি হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।
ট্রাম্পের অভিযোগ, কানাডা দীর্ঘদিন ধরে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে অন্যায্য বাণিজ্য করে আসছে। তবে কানাডার প্রধানমন্ত্রী মার্ক কার্নি যুক্তরাষ্ট্রের অবস্থানের বিরোধিতা করে বলেছেন, দেশটি ন্যায্য বাণিজ্য চুক্তির পক্ষে এবং প্রয়োজন হলে পাল্টা ব্যবস্থা নেবে। কানাডার ঘোষিত পাল্টা শুল্কের আওতায় যুক্তরাষ্ট্রের বিভিন্ন পণ্য ও শিল্পপণ্য পড়তে পারে।
নতুন শুল্কের আওতায় কানাডা থেকে যুক্তরাষ্ট্রে আমদানি করা বিভিন্ন পণ্যের দাম বাড়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে। ব্যবসায়ীরা আমদানি ব্যয় বৃদ্ধির একটি অংশ ভোক্তাদের ওপর চাপিয়ে দিলে খুচরা বাজারে তার প্রভাব পড়তে পারে। অর্থাৎ শুল্কের সরাসরি চাপ শেষ পর্যন্ত সাধারণ মানুষের দৈনন্দিন ব্যয়ও বাড়িয়ে দিতে পারে।
কাগজ ও কাগজজাত পণ্য, বিভিন্ন ধরনের প্যাকেজিং উপকরণ, আসবাবপত্র, ক্রীড়া সামগ্রী ও পোশাকসহ বিস্তৃত পণ্য যুক্তরাষ্ট্রের নতুন শুল্কের আওতায় এসেছে। এ ছাড়া কানাডা থেকে আমদানি করা মদ, ওয়াইন ও অন্যান্য পণ্যেও শুল্কের প্রভাব পড়ছে।
দুগ্ধজাত পণ্য নিয়েও দুই দেশের মধ্যে দীর্ঘদিন ধরে বাণিজ্যিক বিরোধ রয়েছে। কানাডার বাজারে মার্কিন দুগ্ধপণ্যের প্রবেশাধিকার ও বাণিজ্যনীতির বিষয়টি নিয়ে ওয়াশিংটনের অসন্তোষ নতুন শুল্ক আরোপের অন্যতম পটভূমি হিসেবে সামনে এসেছে।
দুই দেশের বাণিজ্য সম্পর্কে সবচেয়ে বড় উদ্বেগ তৈরি হয়েছে গাড়ি ও গাড়ির যন্ত্রাংশ নিয়ে। যুক্তরাষ্ট্র ও কানাডার গাড়ি শিল্প একে অপরের ওপর ব্যাপকভাবে নির্ভরশীল। একটি গাড়ির যন্ত্রাংশ উৎপাদন থেকে চূড়ান্ত সংযোজন পর্যন্ত সরবরাহ শৃঙ্খলের বিভিন্ন ধাপে দুই দেশের প্রতিষ্ঠান জড়িত থাকে।
এ অবস্থায় কানাডা থেকে গাড়ি ও যন্ত্রাংশ আমদানিতে ৫০ শতাংশ শুল্ক কার্যকর হলে উৎপাদন ব্যয় বাড়তে পারে। এর প্রভাব গাড়ি নির্মাতা প্রতিষ্ঠানগুলোর পাশাপাশি মার্কিন ভোক্তাদের ওপরও পড়ার আশঙ্কা রয়েছে। ইতোমধ্যে শুল্কের হুমকির পর বড় কয়েকটি গাড়ি নির্মাতা প্রতিষ্ঠানের শেয়ারে চাপ দেখা গেছে।
যুক্তরাষ্ট্র ও কানাডার মধ্যে বিশাল বাণিজ্যিক সম্পর্কের কারণে শুল্কবিরোধের প্রভাব শুধু নির্দিষ্ট কয়েকটি পণ্যের মধ্যে সীমাবদ্ধ নাও থাকতে পারে। উৎপাদনের বিভিন্ন ধাপে সীমান্ত পেরিয়ে পণ্য ও কাঁচামাল পরিবহন হয়। নতুন শুল্ক কার্যকর হলে সেই সরবরাহ ব্যবস্থায় ব্যয় ও অনিশ্চয়তা বাড়তে পারে।
ব্যবসায়ীরা অতিরিক্ত ব্যয়ের পুরোটা নিজেরা বহন না করে পণ্যের দামে তা যোগ করলে শেষ পর্যন্ত ভোক্তাদেরই বেশি অর্থ দিতে হতে পারে। এতে মূল্যস্ফীতির ওপরও বাড়তি চাপ তৈরি হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।
যুক্তরাষ্ট্রের পদক্ষেপের জবাবে কানাডা আগামী ৮ সেপ্টেম্বর থেকে ‘ডলার-ফর-ডলার’ ভিত্তিতে পাল্টা শুল্ক আরোপের পরিকল্পনা জানিয়েছে। এর আওতায় যুক্তরাষ্ট্রের ইস্পাত, দুগ্ধজাত পণ্য, ইলেকট্রনিকস ও কৃষি সরঞ্জামসহ বিভিন্ন পণ্য পড়তে পারে।
ফলে দুই দেশের মধ্যে পাল্টাপাল্টি শুল্ক বাড়তে থাকলে ব্যবসা-বাণিজ্যের পাশাপাশি ভোক্তাদের ব্যয়ও বাড়তে পারে। একই সঙ্গে উত্তর আমেরিকার শিল্প উৎপাদন ও সরবরাহব্যবস্থায় দীর্ঘমেয়াদি অনিশ্চয়তা তৈরি হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।
সব মিলিয়ে যুক্তরাষ্ট্র ও কানাডার বাণিজ্য বিরোধ এখন শুধু দুই দেশের সরকারের নীতিগত মতপার্থক্যের মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই। গাড়ি, ভোগ্যপণ্য ও শিল্প সরবরাহব্যবস্থায় এর প্রভাব পড়তে শুরু করায় আগামী দিনগুলোতে এই বাণিজ্য সংঘাত সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রার ব্যয়েও কতটা প্রভাব ফেলে, সেটিই এখন বড় প্রশ্ন।
সূত্র: সিএনএন, রয়টার্স ও এপি