মধ্যপ্রাচ্যজুড়ে ক্রমেই ভয়াবহ আকার নিচ্ছে যুদ্ধ পরিস্থিতি। ইরানের ওপর যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইলের যৌথ হামলার পর পাল্টা আঘাতে আরব বিশ্বের বিভিন্ন দেশে থাকা মার্কিন সামরিক ঘাঁটিগুলো লক্ষ্যবস্তুতে পরিণত হয়েছে। এরই মধ্যে ইরান হরমুজ প্রণালি দিয়ে সব ধরনের জাহাজ চলাচল বন্ধ করে দিয়েছে। ফলে পুরো অঞ্চলে চরম উত্তেজনার পাশাপাশি মধ্যপ্রাচ্যে অবস্থানরত বাংলাদেশি নাগরিকদের মধ্যেও ব্যাপক উদ্বেগ ছড়িয়ে […]
মধ্যপ্রাচ্যজুড়ে ক্রমেই ভয়াবহ আকার নিচ্ছে যুদ্ধ পরিস্থিতি। ইরানের ওপর যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইলের যৌথ হামলার পর পাল্টা আঘাতে আরব বিশ্বের বিভিন্ন দেশে থাকা মার্কিন সামরিক ঘাঁটিগুলো লক্ষ্যবস্তুতে পরিণত হয়েছে। এরই মধ্যে ইরান হরমুজ প্রণালি দিয়ে সব ধরনের জাহাজ চলাচল বন্ধ করে দিয়েছে। ফলে পুরো অঞ্চলে চরম উত্তেজনার পাশাপাশি মধ্যপ্রাচ্যে অবস্থানরত বাংলাদেশি নাগরিকদের মধ্যেও ব্যাপক উদ্বেগ ছড়িয়ে পড়েছে। এমন প্রেক্ষাপটে পরিস্থিতি মূল্যায়ন ও করণীয় নির্ধারণে সরকারের উচ্চপর্যায়ের জরুরি বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়েছে।
আগাম প্রস্তুতির অংশ হিসেবে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ের মন্ত্রী এবং গুরুত্বপূর্ণ দপ্তরের দায়িত্বশীল কর্মকর্তাদের সঙ্গে বৈঠকে বসেন। সম্ভাব্য সংকট মোকাবিলায় আগেভাগে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণের নির্দেশ দেন তিনি। বৈঠকে বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হয় মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন দেশে কর্মরত প্রবাসী শ্রমিকদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার বিষয়ে। একই সঙ্গে জ্বালানি নিরাপত্তা বজায় রাখা এবং যেকোনো পরিস্থিতিতে দ্রুত ব্যবস্থা নিতে সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয় ও সংস্থাগুলোকে সক্রিয় ভূমিকা পালনের নির্দেশনা দেন প্রধানমন্ত্রী।
জ্বালানি তেলের সরবরাহ নিয়ে আলোচনা
মধ্যপ্রাচ্যে চলমান যুদ্ধ স্বল্প সময়ের মধ্যে শেষ হলে বাংলাদেশের জ্বালানি খাতে বড় কোনো সংকটের আশঙ্কা নেই। তবে সংঘাত দীর্ঘায়িত হলে বৈশ্বিক পরিস্থিতির মতো বাংলাদেশও চাপে পড়তে পারে। এই বাস্তবতা বিবেচনায় প্রধানমন্ত্রী বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদমন্ত্রী ইকবাল হাসান মাহমুদসহ সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ের মন্ত্রী ও ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের সঙ্গে বৈঠক করেন।
ইকবাল হাসান মাহমুদ বলেন, যুদ্ধ পরিস্থিতি সবার জন্যই উদ্বেগের। সরকার সর্বোচ্চ সক্ষমতা দিয়ে চেষ্টা করবে, যাতে জ্বালানি খাতসহ সংশ্লিষ্ট খাতে কোনো বড় ধরনের সংকট সৃষ্টি না হয়। প্রধানমন্ত্রী প্রয়োজনীয় তথ্য নিয়েছেন এবং করণীয় বিষয়ে দিকনির্দেশনাও দিয়েছেন। সম্মিলিতভাবে কাজ করে পরিস্থিতি সামাল দেওয়ার আশাবাদ ব্যক্ত করেন তিনি।
প্রধানমন্ত্রীর জ্বালানি বিষয়ক উপদেষ্টা হুমায়ুন কবির জানান, বর্তমানে দেশে যে জ্বালানি মজুত রয়েছে, তাতে তাৎক্ষণিক কোনো সমস্যা হওয়ার সম্ভাবনা নেই। অতীতেও বিভিন্ন সময়ে জ্বালানি খাতে ওঠানামা দেখা গেছে, তবে সেসব মোকাবিলায় প্রস্তুতি রয়েছে। তাই আতঙ্কিত হওয়ার কারণ নেই বলে মন্তব্য করেন তিনি।
হরমুজ প্রণালি বন্ধ হলে সম্ভাব্য প্রভাব
জ্বালানি বিভাগ সূত্র জানায়, প্রধানমন্ত্রীর বৈঠকের পর বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদমন্ত্রী পেট্রোবাংলা এবং বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশনের (বিপিসি) ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের সঙ্গে আলাদা বৈঠক করেন।
বিপিসির এক ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা জানান, বর্তমানে দেশীয় গ্যাস উৎপাদন উল্লেখযোগ্যভাবে কমে গেছে। প্রতিদিন প্রায় ১৭১৪ মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাস দেশীয় উৎস থেকে সরবরাহ করা হচ্ছে। পাশাপাশি আমদানি করা এলএনজি থেকে প্রতিদিন ৮৫০ থেকে ১০০০ মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাস সরবরাহ হচ্ছে। দীর্ঘমেয়াদি চুক্তির আওতায় আমদানি করা প্রায় সব এলএনজি হরমুজ প্রণালি দিয়েই দেশে আসে। এই নৌপথ দিয়ে বিশ্বব্যাপী মোট তেল ও গ্যাস পরিবহনের প্রায় এক-পঞ্চমাংশ সম্পন্ন হয়।
কর্মকর্তারা জানান, জ্বালানি তেল আমদানির চুক্তিগুলো ছয় মাস মেয়াদি হওয়ায় আগামী জুন পর্যন্ত সরবরাহ নিশ্চিত রয়েছে। চীন, মালয়েশিয়া, সিঙ্গাপুর ও ইন্দোনেশিয়া থেকে জ্বালানি আসবে। ফলে হরমুজ প্রণালি বন্ধ থাকলেও তাৎক্ষণিকভাবে বড় কোনো সংকট তৈরি হওয়ার আশঙ্কা নেই।
বর্তমানে দেশে সব ধরনের পরিশোধিত জ্বালানি তেলের প্রায় ৪৫ দিনের মজুত রয়েছে। এর মধ্যে মজুত ও চলমান চালানের সমন্বয়ে ২০ দিনের বেশি সরবরাহ নিশ্চিত আছে। বন্দরে খালাসের অপেক্ষায় থাকা এবং পথে থাকা জাহাজ মিলিয়ে আরও প্রায় ২৫ দিনের জ্বালানি রয়েছে।
তবে যুদ্ধ দীর্ঘস্থায়ী হলে সৌদি আরব ও সংযুক্ত আরব আমিরাত থেকে অপরিশোধিত তেল আমদানিতে সমস্যা দেখা দিতে পারে বলে আশঙ্কা করছেন সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা। এজন্য বিকল্প উৎস খোঁজার বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করা হচ্ছে এবং ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের সঙ্গে নিয়মিত আলোচনা চলছে।
প্রধানমন্ত্রী সার্বক্ষণিক পরিস্থিতি তদারকি করছেন
মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন দেশে অবস্থানরত লাখো বাংলাদেশি শ্রমিক দেশের অর্থনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখছেন। তাদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে এবং সম্ভাব্য সমস্যা সমাধানে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় ও প্রবাসী কল্যাণ মন্ত্রণালয়কে বিশেষ নির্দেশ দিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান।
রোববার সকালে পররাষ্ট্রমন্ত্রী খলিলুর রহমান প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে সাক্ষাৎ করেন। এ সময় উপস্থিত ছিলেন পররাষ্ট্রবিষয়ক উপদেষ্টা হুমায়ুন কবির। তিনি জানান, মধ্যপ্রাচ্যে অবস্থানরত বাংলাদেশিদের অবস্থা সম্পর্কে প্রধানমন্ত্রী নিয়মিত খোঁজখবর নিচ্ছেন এবং প্রয়োজনীয় নির্দেশনা দিচ্ছেন। ফ্লাইট বাতিলসহ বিভিন্ন সংকট মোকাবিলায় সমন্বিত উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে।
তিনি আরও বলেন, বিশ্বের যেকোনো যুদ্ধ পরিস্থিতির প্রভাব অন্য দেশেও পড়ে। এই সংকট কূটনৈতিকভাবে সমাধানের পক্ষেই বাংলাদেশ অবস্থান নিয়েছে। একই সঙ্গে বিদেশে অবস্থানরত বাংলাদেশিদের নিরাপত্তাকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দেওয়া হচ্ছে।
প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশে বিমানমন্ত্রী ও প্রতিমন্ত্রী সরাসরি বিমানবন্দরে গিয়ে যাত্রীদের পরিস্থিতি তদারকি করছেন। প্রবাসী কল্যাণ মন্ত্রণালয়ও সার্বক্ষণিকভাবে কাজ করছে বলে জানিয়েছেন প্রধানমন্ত্রীর অতিরিক্ত প্রেস সচিব আতিকুর রহমান রুমন।
মধ্যপ্রাচ্য: বাংলাদেশের রেমিট্যান্সের প্রধান উৎস
বাংলাদেশের মোট রেমিট্যান্স আয়ের প্রায় অর্ধেক আসে মধ্যপ্রাচ্য থেকে। গত অর্থবছরে দেশটি ১৩ বিলিয়নের বেশি ডলার রেমিট্যান্স পেয়েছে। এসব দেশে প্রায় ১০ লাখ বাংলাদেশি কর্মরত।
সাম্প্রতিক সংঘাতের কারণে প্রবাসীদের কর্মসংস্থানে অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে, যা রেমিট্যান্স প্রবাহে নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে বলে মনে করছেন অর্থনীতিবিদরা। মিউচুয়াল ট্রাস্ট ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক সৈয়দ মাহবুবুর রহমান বলেন, মধ্যপ্রাচ্যে কর্মরত অনেক বাংলাদেশি দৈনিকভিত্তিক কাজে নিয়োজিত। যুদ্ধ পরিস্থিতিতে কাজ বন্ধ হয়ে গেলে আয় কমবে, ফলে রেমিট্যান্সেও বড় ধরনের প্রভাব পড়বে।
তিনি আরও বলেন, হরমুজ প্রণালি বন্ধ থাকায় তেল আমদানির খরচ বাড়বে, যা দেশের বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভের ওপর অতিরিক্ত চাপ সৃষ্টি করতে পারে।