বিশ্ব ফুটবলের নিয়ন্ত্রক সংস্থা ফিফাকে ঘিরে চলমান বিরোধ এবার প্রকাশ্য রূপ পেয়েছে। ফিফা সভাপতি জিয়ান্নি ইনফান্তিনোর নেতৃত্ব ও সিদ্ধান্ত গ্রহণের ধরন নিয়ে সরাসরি প্রশ্ন তুলেছে ইউরোপীয় ফুটবল সংস্থা উয়েফা, এশিয়ান ফুটবল কনফেডারেশন (এএফসি) এবং উত্তর ও মধ্য আমেরিকার কনকাকাফ। সোমবার প্রকাশিত এক যৌথ খোলা চিঠিতে তিন কনফেডারেশন ফুটবলের নেতৃত্বে ব্যক্তিকেন্দ্রিক ক্ষমতা চর্চার সমালোচনা করেছে। চিঠিতে […]
ছবি: সংগৃহীত
বিশ্ব ফুটবলের নিয়ন্ত্রক সংস্থা ফিফাকে ঘিরে চলমান বিরোধ এবার প্রকাশ্য রূপ পেয়েছে। ফিফা সভাপতি জিয়ান্নি ইনফান্তিনোর নেতৃত্ব ও সিদ্ধান্ত গ্রহণের ধরন নিয়ে সরাসরি প্রশ্ন তুলেছে ইউরোপীয় ফুটবল সংস্থা উয়েফা, এশিয়ান ফুটবল কনফেডারেশন (এএফসি) এবং উত্তর ও মধ্য আমেরিকার কনকাকাফ। সোমবার প্রকাশিত এক যৌথ খোলা চিঠিতে তিন কনফেডারেশন ফুটবলের নেতৃত্বে ব্যক্তিকেন্দ্রিক ক্ষমতা চর্চার সমালোচনা করেছে।
চিঠিতে ইনফান্তিনোর নাম সরাসরি উল্লেখ করা হয়নি। তবে সেখানে ক্ষমতা কেন্দ্রীভূত করা, বৃহত্তর ফুটবল সংগঠনের স্বার্থের ঊর্ধ্বে ব্যক্তিগত কর্তৃত্বকে স্থান দেওয়া এবং নেতৃত্বের কারণে আস্থার সংকট তৈরি হওয়ার বিষয়ে যে ভাষা ব্যবহার করা হয়েছে, তা ফিফা সভাপতির নেতৃত্বকেই লক্ষ্য করে লেখা বলে স্পষ্ট ইঙ্গিত পাওয়া যাচ্ছে।
সম্প্রতি বিশ্বকাপসহ ফিফার বিভিন্ন প্রতিযোগিতায় বেসরকারি বিনিয়োগকারীদের সম্পৃক্ত করে আংশিক মালিকানা দেওয়ার একটি পরিকল্পনা সামনে এসেছিল। ব্যাপক সমালোচনার মুখে পরে সেই উদ্যোগ থেকে সরে আসে ফিফা। একই সঙ্গে ২০২৭ থেকে ২০৩০ সময়ের জন্য ২ কোটি ডলারের একটি তহবিল গঠনের কথাও জানায় সংস্থাটি।
তবে পরিকল্পনা প্রত্যাহারের পরও বিতর্ক থামেনি। বরং সিদ্ধান্তটি কীভাবে তৈরি হলো এবং এত বড় একটি উদ্যোগের ক্ষেত্রে যথাযথ মূল্যায়ন হয়েছিল কি না, তা নিয়ে নতুন প্রশ্ন উঠেছে।
উয়েফা, এএফসি ও কনকাকাফের যৌথ চিঠিতে বলা হয়েছে, ফুটবল কোনো ব্যক্তি বা নির্দিষ্ট গোষ্ঠীর ব্যক্তিগত সম্পদ নয়। তাদের মতে, ফুটবলের নেতৃত্বের উদ্দেশ্য ক্ষমতা নিজের হাতে কেন্দ্রীভূত করা নয়; বরং খেলাটির সামগ্রিক স্বার্থ নিশ্চিত করা।
চিঠিতে আরও বলা হয়, অসততা বা প্রতারণার কারণে কোনো প্রতিষ্ঠানের প্রতি আস্থা নষ্ট হলে এবং কোনো ব্যক্তি তাকে ক্ষমতা দেওয়া বৃহত্তর সংগঠনের ওপরে নিজেকে স্থান দিলে তিনি অর্পিত দায়িত্বের মূল উদ্দেশ্য থেকে সরে যান।
ইনফান্তিনোকে ঘিরে বিরোধের মধ্যে গত সপ্তাহে মরক্কোতে ফিফার একটি জরুরি বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়। সেখানে ইনফান্তিনো দুঃখ প্রকাশ করে ক্ষমা চেয়েছিলেন বলে জানা গেছে। তবে এতে বিরোধ পুরোপুরি কাটেনি।
উয়েফার ৫৫ সদস্যদেশ ফিফার বিভিন্ন টুর্নামেন্ট বর্জনের যে অবস্থান নিয়েছে, তা এখনো বহাল রয়েছে। নরওয়ে ফুটবল ফেডারেশনের সভাপতি লিসে ক্লাভেনেস আরও কঠোর অবস্থান নিয়ে ইনফান্তিনোর দ্রুত পদত্যাগের দাবি জানিয়েছেন।
তিন কনফেডারেশন মরক্কোর সেই জরুরি বৈঠকের বৈধতা ও প্রতিনিধিত্ব নিয়েও প্রশ্ন তুলেছে। তাদের দাবি, সভায় নির্বাচিত কর্মকর্তাদের মধ্যে মাত্র একজন উপস্থিত ছিলেন।
বিশ্বকাপের অংশীদারিত্ব বেসরকারি বিনিয়োগকারীদের হাতে দেওয়ার প্রস্তাব কীভাবে তৈরি এবং অনুমোদনের পথে এগিয়েছিল, তা খতিয়ে দেখতে স্বাধীন তদন্তের আহ্বান জানিয়েছে উয়েফা, এএফসি ও কনকাকাফ।
তাদের দাবি, তদন্তের ক্ষেত্রে ফিফার কোনো ধরনের প্রভাব থাকা উচিত নয়। একই সঙ্গে এত গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত গ্রহণের সময় কীভাবে বিচারবোধের ঘাটতি তৈরি হলো, সেটিও তদন্তের আওতায় আনার কথা বলা হয়েছে।
তিন সংস্থার মতে, ফুটবলের ঐক্য রক্ষাই সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার হওয়া উচিত। তাদের ভাষায়, খেলাটিকে নিয়ন্ত্রণ করার জন্য নয়, বরং ফুটবলের স্বার্থে কাজ করার মতো নেতৃত্বই প্রয়োজন।
ইনফান্তিনোর নেতৃত্ব নিয়ে এই বিরোধের মধ্যেই তার ব্যক্তিগত জীবনসংক্রান্ত পুরোনো একটি অভিযোগও নতুন করে সামনে এসেছে। ব্রিটিশ সংবাদমাধ্যম ‘দ্য ডেইলি টেলিগ্রাফ’-এর দাবি, উয়েফার সাধারণ সম্পাদক থাকাকালে এক নারী কর্মীকে বিশেষ সুবিধা দেওয়ার অভিযোগ উঠেছিল ইনফান্তিনোর বিরুদ্ধে। বিষয়টি নিয়ে উয়েফা তদন্ত শুরু করেছে বলেও প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
তবে এসব অভিযোগ সরাসরি অস্বীকার করেছে ফিফা। সংস্থাটির ভাষ্য, অভিযোগগুলো ভিত্তিহীন এবং ইনফান্তিনোর নেতৃত্বকে দুর্বল করার উদ্দেশ্যেই পরিকল্পিতভাবে এসব দাবি সামনে আনা হচ্ছে। ফিফা আরও বলেছে, সভাপতির নেতৃত্ব নিয়ে কোনো আপত্তি থাকলে তা সংস্থার বিধিবিধান ও গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়েই উত্থাপন করা উচিত।
ইনফান্তিনোর প্রতি সমর্থন নিয়েও বিশ্ব ফুটবলে স্পষ্ট বিভাজন দেখা দিয়েছে। উয়েফা ও ইউরোপের বেশ কয়েকটি দেশ তার বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থান নিলেও আফ্রিকান ফুটবল কনফেডারেশনের ৫৪ সদস্যদেশ, মেক্সিকো এবং দক্ষিণ আমেরিকার আর্জেন্টিনা, প্যারাগুয়ে, ইকুয়েডর ও বলিভিয়া তার প্রতি সমর্থন জানিয়েছে।
ফিফার ২১১ সদস্যের মধ্যে প্রায় ৭০টি অ্যাসোসিয়েশন ইনফান্তিনোকে সমর্থন দিতে পারে বলে ধারণা করা হলেও প্রায় এক ডজন সদস্য ইতোমধ্যে সমর্থন প্রত্যাহার করেছে।
২০২৭ সালের মার্চে ফিফা সভাপতি হিসেবে চতুর্থ ও শেষ মেয়াদের জন্য নির্বাচনে অংশ নেওয়ার কথা রয়েছে ইনফান্তিনোর। কিন্তু একাধিক কনফেডারেশনের প্রকাশ্য বিরোধিতা, টুর্নামেন্ট বর্জনের অবস্থান এবং ক্রমবর্ধমান আস্থার সংকট তার সামনে নতুন রাজনৈতিক ও সাংগঠনিক চ্যালেঞ্জ তৈরি করেছে।
ফলে আগামী নির্বাচনের আগে ফিফার অভ্যন্তরীণ এই বিরোধ কোন দিকে গড়ায় এবং ইনফান্তিনোর নেতৃত্ব নিয়ে কনফেডারেশনগুলোর অবস্থান কতটা কঠোর হয়, সেটিই এখন বিশ্ব ফুটবলের অন্যতম বড় প্রশ্ন।