যুদ্ধের কূটনৈতিক সমাধানের কথা বলছে যুক্তরাষ্ট্রের ট্রাম্প প্রশাসন ও ইরান—দুই পক্ষই। কিন্তু সমঝোতায় পৌঁছানোর পথ ক্রমেই কঠিন হয়ে উঠছে। আলোচনায় অচলাবস্থার পেছনে রয়েছে সময়সীমা নিয়ে দুই দেশের ভিন্ন দৃষ্টিভঙ্গি, রাজনৈতিক ও সাংস্কৃতিক পার্থক্য এবং দীর্ঘদিনের গভীর অবিশ্বাস। সাম্প্রতিক আলোচনাতেও বড় কোনো অগ্রগতি হয়নি বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো জানিয়েছে। গত ১৮ মাসে দুই দফা আলোচনা ব্যর্থ হওয়ার […]
ছবি: সংগৃহীত
যুদ্ধের কূটনৈতিক সমাধানের কথা বলছে যুক্তরাষ্ট্রের ট্রাম্প প্রশাসন ও ইরান—দুই পক্ষই। কিন্তু সমঝোতায় পৌঁছানোর পথ ক্রমেই কঠিন হয়ে উঠছে। আলোচনায় অচলাবস্থার পেছনে রয়েছে সময়সীমা নিয়ে দুই দেশের ভিন্ন দৃষ্টিভঙ্গি, রাজনৈতিক ও সাংস্কৃতিক পার্থক্য এবং দীর্ঘদিনের গভীর অবিশ্বাস। সাম্প্রতিক আলোচনাতেও বড় কোনো অগ্রগতি হয়নি বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো জানিয়েছে।
গত ১৮ মাসে দুই দফা আলোচনা ব্যর্থ হওয়ার পর তা সংঘাতের দিকে গড়িয়েছে। জুনে হওয়া সমঝোতা স্মারকও কয়েক দিনের মধ্যে ভেঙে পড়ে। বর্তমান কূটনৈতিক প্রচেষ্টা ব্যর্থ হলে কয়েক সপ্তাহের মধ্যেই আবার সংঘাত শুরু হওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে।
যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের আলোচনায় বড় একটি বাধা হলো সময়সীমা নিয়ে দুই পক্ষের ভিন্ন অবস্থান।
কার্নেগি এনডাওমেন্টের জ্যেষ্ঠ বিশ্লেষক করিম সাজাদপুরের মতে, প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প দ্রুত একটি চুক্তিতে পৌঁছাতে চান। আলোচনা দীর্ঘ হলে তিনি অধৈর্য হয়ে পড়েন। অন্যদিকে ইরানের আলোচনার ধরন তুলনামূলক ধীর এবং দেশটি সময়ক্ষেপণকে কৌশল হিসেবে দেখে।
২০২৫ সালের এপ্রিলে ট্রাম্প আলোচনার জন্য ৬০ দিনের সময়সীমা বেঁধে দিয়েছিলেন। ইরান এটিকে অত্যন্ত সংক্ষিপ্ত ও অবাস্তব হিসেবে দেখেছিল। ইরানি কর্মকর্তাদের ধারণা ছিল, ট্রাম্প ওই সময়সীমা নিয়ে বাস্তবে এতটা কঠোর ছিলেন না।
চলতি বছরের ফেব্রুয়ারির আলোচনাও প্রায় তিন সপ্তাহ স্থায়ী হয়েছিল। সংশ্লিষ্ট বিশ্লেষণে বলা হয়, এত অল্প সময়ে একটি পূর্ণাঙ্গ চুক্তিতে পৌঁছানো কঠিন ছিল।
ট্রাম্প বড় ও রাজনৈতিকভাবে আলোচিত একটি চুক্তি চান। তার লক্ষ্য এমন একটি সমঝোতা, যা যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের সম্পর্কের কাঠামো বদলে দেওয়ার পাশাপাশি মধ্যপ্রাচ্যের পরিস্থিতিতেও বড় পরিবর্তন আনবে।
অন্যদিকে ইরান অপেক্ষাকৃত সীমিত ও লেনদেনভিত্তিক চুক্তির দিকে আগ্রহী। সরাসরি আলোচনার পরিবর্তে পরোক্ষ আলোচনা কিংবা কম প্রচারের মাধ্যমে সমঝোতায় পৌঁছানোর বিষয়ে তেহরান বেশি আগ্রহী।
করিম সাজাদপুরের মতে, ট্রাম্প প্রশাসন নিজেদের চুক্তি সম্পাদনকারী হিসেবে দেখে। বিপরীতে ইরানের রাজনৈতিক সংস্কৃতিতে আপসকারীর ধারণাকে নেতিবাচকভাবে দেখা হয়।
তার মতে, ইরানের নেতারা ট্রাম্পের সঙ্গে সরাসরি বৈঠকেও আগ্রহী ছিলেন না। সরাসরি আলোচনা হলে পরিস্থিতির ফল ভিন্ন হতে পারত বলেও তিনি মনে করেন।
দুই দেশের মধ্যে পারস্পরিক অবিশ্বাস আলোচনার অন্যতম মৌলিক বাধা। ইরানের দাবি, আলোচনার মাঝখানে যুক্তরাষ্ট্র দুইবার তাদের সঙ্গে প্রতারণা করেছে। দেশটির অনেক কর্মকর্তা মনে করেন, যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে আলোচনা আকস্মিক হামলার প্রস্তুতি আড়াল করার কৌশলও হতে পারে।
অন্যদিকে যুক্তরাষ্ট্রের দাবি, জুন ২০২৬-এর সমঝোতা স্মারক স্বাক্ষরের কয়েক দিনের মধ্যেই হরমুজ প্রণালিতে জাহাজে হামলা চালিয়ে ইরান চুক্তি লঙ্ঘন করেছে।
মার্কিন কর্মকর্তাদের আশঙ্কা, ইরানের ইসলামি বিপ্লবী গার্ড বাহিনী বা আইআরজিসি এবং সরকারের ভেতরের কট্টরপন্থীরা কোনো চুক্তি মেনে চলবে কি না, তা নিশ্চিত করা কঠিন।
সাম্প্রতিক আলোচনাতেও দুই পক্ষের মূল মতপার্থক্যগুলোর মধ্যে রয়েছে হরমুজ প্রণালি, মার্কিন অবরোধ ও নিষেধাজ্ঞা এবং ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি। ইরান আগে হরমুজ প্রণালি পুনরায় খুলে দেওয়া ও নিষেধাজ্ঞা শিথিল করার বিষয়কে অগ্রাধিকার দিয়েছে। অন্যদিকে ওয়াশিংটন পারমাণবিক কর্মসূচি নিয়ে আরও কঠোর শর্ত চাইছে।
আলোচনাকে ঘিরে দুই দেশেই রয়েছে তীব্র অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক চাপ। ইরানের আলোচনাকারী দল ও সরকারের ভেতরের চুক্তি-সমর্থকেরা নিয়মিত সমালোচনার মুখে পড়ছেন। এতে আলোচনার টেবিলে তাদের অবস্থান আরও কঠোর হয়েছে।
অন্যদিকে ট্রাম্প ও তার আলোচনাকারীরাও ডানপন্থীদের কাছ থেকে চুক্তি না করার চাপ পাচ্ছেন। একই সঙ্গে বামপন্থীদের সমালোচনাও রয়েছে—বিশেষ করে এমন কোনো চুক্তি হলে, যা যুদ্ধের আগের পরিস্থিতি ফিরিয়ে আনে অথবা সাবেক মার্কিন প্রেসিডেন্ট বারাক ওবামার ২০১৫ সালের পরমাণু চুক্তির মতো হয়।
এই রাজনৈতিক চাপের কারণে গত ১৮ মাসে ট্রাম্প কয়েকবার তুলনামূলক নমনীয় অবস্থান থেকে সরে এসেছেন বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
হোয়াইট হাউসের দূত স্টিভ উইটকফ, জ্যারেড কুশনার এবং ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্স এখনো কূটনৈতিক সমাধানের পক্ষে রয়েছেন। তবে ট্রাম্প নিজে আগের তুলনায় কূটনীতির বিষয়ে বেশি সংশয়ী—তার সাম্প্রতিক বক্তব্যে এমন ইঙ্গিত পাওয়া যাচ্ছে। সাম্প্রতিক আলোচনায় মধ্যস্থতাকারীরাও দুই পক্ষের অবস্থান কাছাকাছি আনার চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছেন।
বৃহস্পতিবার প্রকাশিত ‘টাইম’ ম্যাগাজিনকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে ট্রাম্প বলেন, ইরান যে পদক্ষেপ নিতে প্রস্তুত, তা তার কাছে যথেষ্ট নয়। ইরানের সঙ্গে কখনো শান্তি প্রতিষ্ঠা সম্ভব হবে কি না, তা নিয়েও তিনি সংশয় প্রকাশ করেন। মধ্যবর্তী নির্বাচনের পর বড় ধরনের সামরিক অভিযান আবার শুরু করার বিষয়টিও বিবেচনা করছেন বলে জানান তিনি।
অন্যদিকে বৃহস্পতিবার ইরানের প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজেশকিয়ান যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে আলোচনার পক্ষে অবস্থান পুনর্ব্যক্ত করেন। তিনি বলেন, ইরান কখনো সংলাপ থেকে পালায়নি এবং ভবিষ্যতেও পালাবে না। তবে জুনের সমঝোতা স্বাক্ষরের পরও যুক্তরাষ্ট্র তিনবার ইরানে হামলা চালিয়েছে বলে অভিযোগ করেন তিনি। তার ভাষ্য, সন্ত্রাসের মাধ্যমে ইরানকে নতজানু করার ধারণা যুক্তরাষ্ট্রকে বাদ দিতে হবে।
টেক্সাস এ অ্যান্ড এম ইউনিভার্সিটির বুশ স্কুল অব গভর্নমেন্ট অ্যান্ড পাবলিক সার্ভিসের সহযোগী অধ্যাপক মোহাম্মদ আয়াতুল্লাহি তাবার ‘ফরেন অ্যাফেয়ার্স’ সাময়িকীতে লিখেছেন, যুক্তরাষ্ট্রের বিরুদ্ধে ইরান ক্রমাগত উত্তেজনা বৃদ্ধি ও আক্রমণাত্মক কৌশল গ্রহণ করছে।
ফলে দুই পক্ষই কূটনৈতিক সমাধানের কথা বললেও পারস্পরিক অবিশ্বাস, চুক্তির শর্ত নিয়ে মৌলিক মতপার্থক্য এবং দুই দেশের অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক চাপ আলোচনাকে বারবার অচলাবস্থার দিকে ঠেলে দিচ্ছে। সাম্প্রতিক প্রচেষ্টায় অগ্রগতি না হলে সামরিক সংঘাত ফের বাড়তে পারে—এমন আশঙ্কাও এখন আলোচনার কেন্দ্রে রয়েছে।
সূত্র: বাংলা ট্রিবিউন, অ্যাক্সিওস