মহাকাশে বড় ধরনের সংঘর্ষের ঝুঁকি থেকে অল্পের জন্য রক্ষা পেয়েছে বাংলাদেশের কৃত্রিম উপগ্রহ বাংলাদেশ স্যাটেলাইট-১ (বিএস-১)। ভারতের একটি পুরোনো স্যাটেলাইটের ধ্বংসাবশেষ বিপজ্জনকভাবে কাছাকাছি চলে আসায় সতর্কতামূলক ব্যবস্থা হিসেবে বিএস-১-এর কক্ষপথে সামান্য পরিবর্তন আনেন বাংলাদেশের প্রকৌশলীরা। তাঁদের হিসাব অনুযায়ী, শেষ পর্যন্ত মাত্র ৮৫২ মিটার দূর দিয়ে ধ্বংসাবশেষটি পাশ কাটিয়ে যায়। এতে সম্ভাব্য বড় ধরনের সংঘর্ষের আশঙ্কা […]
ছবি: সংগৃহীত
মহাকাশে বড় ধরনের সংঘর্ষের ঝুঁকি থেকে অল্পের জন্য রক্ষা পেয়েছে বাংলাদেশের কৃত্রিম উপগ্রহ বাংলাদেশ স্যাটেলাইট-১ (বিএস-১)। ভারতের একটি পুরোনো স্যাটেলাইটের ধ্বংসাবশেষ বিপজ্জনকভাবে কাছাকাছি চলে আসায় সতর্কতামূলক ব্যবস্থা হিসেবে বিএস-১-এর কক্ষপথে সামান্য পরিবর্তন আনেন বাংলাদেশের প্রকৌশলীরা। তাঁদের হিসাব অনুযায়ী, শেষ পর্যন্ত মাত্র ৮৫২ মিটার দূর দিয়ে ধ্বংসাবশেষটি পাশ কাটিয়ে যায়। এতে সম্ভাব্য বড় ধরনের সংঘর্ষের আশঙ্কা এড়ানো সম্ভব হয়।
ঘটনার সূত্রপাত গত ৯ আগস্ট সন্ধ্যায়। ওই সময় গাজীপুরের গ্রাউন্ড স্টেশনে জরুরি সতর্কবার্তা আসে। যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক মহাকাশ পর্যবেক্ষণ সংস্থা স্পেস ট্র্যাকার জানায়, বাংলাদেশ স্যাটেলাইট-১-এর কক্ষপথের খুব কাছ দিয়ে একটি মহাকাশ বর্জ্য এগিয়ে আসছে। সম্ভাব্য সংঘর্ষের ঝুঁকি বিবেচনায় নিয়ে সঙ্গে সঙ্গে পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ ও প্রয়োজনীয় হিসাব-নিকাশ শুরু করেন বাংলাদেশের প্রকৌশলীরা।
মহাকাশে স্যাটেলাইটের সঙ্গে অন্য কোনো স্যাটেলাইট বা বড় বস্তুর সংঘর্ষ হলে তা থেকে বিপুল পরিমাণ ধ্বংসাবশেষ তৈরি হতে পারে। এসব টুকরো পরবর্তী সময়ে অন্য সচল উপগ্রহের জন্যও ঝুঁকি তৈরি করে। ফলে বিএস-১-এর দিকে এগিয়ে আসা বস্তুটির গতিপথ ও সম্ভাব্য সংঘর্ষের দূরত্ব নির্ধারণ করা প্রকৌশলীদের জন্য জরুরি হয়ে পড়ে।
২০০৯ সালে মহাকাশে এমন একটি সংঘর্ষের ঘটনা ঘটেছিল। ওই ঘটনায় যুক্তরাষ্ট্রের একটি সচল স্যাটেলাইট ও রাশিয়ার একটি নিষ্ক্রিয় স্যাটেলাইট ধ্বংস হয়ে যায়। সংঘর্ষের ফলে সৃষ্ট অসংখ্য ধ্বংসাবশেষ মহাকাশে অন্য উপগ্রহের জন্যও বিপদের কারণ হয়ে দাঁড়ায়। সেই অভিজ্ঞতা বিবেচনায় বিএস-১-এর সম্ভাব্য ঝুঁকিকে গুরুত্বের সঙ্গে নেয় বাংলাদেশি দলটি।
চার দিন উদ্বেগে, কাজে যুক্ত অর্ধশতাধিক প্রকৌশলী
বাংলাদেশ স্যাটেলাইট কোম্পানি লিমিটেডের ব্যবস্থাপনা পরিচালক মুহাম্মদ ইমাদুর রহমান জানান, সম্ভাব্য সংঘর্ষের আশঙ্কায় টানা চার দিন চরম উদ্বেগের মধ্যে কাটে। পরিস্থিতি মোকাবিলায় ছুটি বাতিল করে ৫০ জনের বেশি প্রকৌশলীকে কাজে যুক্ত করা হয়। তাঁরা ধ্বংসাবশেষটির গতিপথ, বিএস-১-এর অবস্থান এবং সংঘর্ষ এড়াতে কক্ষপথে কী ধরনের পরিবর্তন আনা প্রয়োজন, তা নিয়ে নিবিড়ভাবে কাজ করেন।
এ সময় সংশ্লিষ্ট মন্ত্রী ও উপদেষ্টারাও নিয়মিত পরিস্থিতির খোঁজখবর রাখেন। সম্ভাব্য বিপদ এড়াতে সিদ্ধান্ত নেওয়ার আগে একাধিকবার হিসাব-নিকাশ ও পর্যবেক্ষণ করা হয়। কারণ, কক্ষপথে সামান্য পরিবর্তনও পরিকল্পনা অনুযায়ী না হলে স্যাটেলাইটের অবস্থান ও পরিচালনায় প্রভাব পড়তে পারে।
পরে শনাক্ত করা হয়, বিএস-১-এর দিকে এগিয়ে আসা মহাকাশ বর্জ্যটি ভারতের নিষ্ক্রিয় ইনস্যাট-১এ স্যাটেলাইটের একটি অংশ। ১৯৮২ সালে স্যাটেলাইটটি উৎক্ষেপণ করা হয়েছিল। দীর্ঘদিন ধরে মহাকাশে থাকা এর ধ্বংসাবশেষই বাংলাদেশের উপগ্রহটির জন্য সম্ভাব্য বিপদের কারণ হয়ে দাঁড়ায়।
কক্ষপথে পরিবর্তন, ৮৫২ মিটার দূর দিয়ে অতিক্রম
ঝুঁকি মোকাবিলায় ১৩ আগস্ট প্রকৌশলীরা নিখুঁত হিসাব-নিকাশের পর বাংলাদেশ স্যাটেলাইট-১-এর কক্ষপথে সামান্য পরিবর্তন আনার সিদ্ধান্ত নেন। পরিকল্পনা অনুযায়ী, স্যাটেলাইটটিকে সামান্য বাঁ দিকে সরিয়ে নেওয়া হয়, যাতে এগিয়ে আসা ধ্বংসাবশেষটির সঙ্গে সম্ভাব্য সংঘর্ষ এড়ানো যায়।
এরপর ধ্বংসাবশেষটির গতিপথ ও বিএস-১-এর অবস্থান নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করা হয়। শেষ পর্যন্ত মাত্র ৮৫২ মিটার দূর দিয়ে বস্তুটি বাংলাদেশ স্যাটেলাইট-১-কে অতিক্রম করে। এর মধ্য দিয়ে সম্ভাব্য সংঘর্ষের ঝুঁকি কেটে যায়।
বিপদ কেটে যাওয়ার পর বিএস-১-কে আবার নির্ধারিত কক্ষপথে ফিরিয়ে নেওয়া হয়। পুরো প্রক্রিয়ায় মহাকাশের পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ, সম্ভাব্য সংঘর্ষের ঝুঁকি নিরূপণ এবং প্রয়োজনীয় কৌশল নির্ধারণে প্রকৌশলীদের ভূমিকা ছিল গুরুত্বপূর্ণ।
এর আগেও ঝুঁকিতে পড়েছিল বিএস-১
বাংলাদেশ স্যাটেলাইট-১ এর আগেও একই ধরনের ঝুঁকির মুখে পড়েছিল। ২০২১ ও ২০২৫ সালেও স্যাটেলাইটটিকে ঘিরে মহাকাশের ধ্বংসাবশেষজনিত ঝুঁকির ঘটনা ঘটেছিল বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
মহাকাশে সচল স্যাটেলাইটের সংখ্যা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে পুরোনো উপগ্রহ ও অন্যান্য বস্তুর ধ্বংসাবশেষের কারণে সংঘর্ষের ঝুঁকিও বাড়ছে। এসব বর্জ্যের গতিপথ পর্যবেক্ষণ এবং প্রয়োজন অনুযায়ী কক্ষপথে পরিবর্তন আনা স্যাটেলাইট পরিচালনার গুরুত্বপূর্ণ অংশ।
বাংলাদেশ স্যাটেলাইট-১-এর ক্ষেত্রে সময়মতো সতর্কতা, ধারাবাহিক পর্যবেক্ষণ এবং প্রকৌশলীদের হিসাব-নিকাশের মাধ্যমে সম্ভাব্য বিপদ এড়ানো গেছে। ঘটনাটি মহাকাশে বাংলাদেশের কৃত্রিম উপগ্রহ পরিচালনা এবং ঝুঁকি মোকাবিলায় কারিগরি সক্ষমতার গুরুত্বও তুলে ধরেছে।